আলতাফ হাই তুলতে তুলতে বলল, পোকাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ওরা মামার উপর রাগ করেছিল। আমি বুঝিয়ে বলেছি! সকালবেলা ঠিক হয়ে যাবে।
দুলারী রাগ চাপতে চাপতে বলল, পোক বিষয়ে তুমি আর কোন কথা আমাকে বলবে না।
আচ্ছা।
একজন মানুষ পোকার ভয়ে মারা যেতে বসেছে আর তুমি আরাম করে ঘুমুতে যাচ্ছ।
পোকাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওরা মানুষের ক্ষতি করে না।
কে বলল তোমাকে?
ওরাই বলেছে। ওরা জানে মানুষ খুব অসহায়, এই জন্যেই ওরা মানুষকে রক্ষা করে চলে। পোকারা যদি ঠিক করে তাহলে তারা একদিনে পৃথিবীর সব মানুষ শেষ করে দিতে পরে?
আজেবাজে কথা বলবে না তো। তোমার ঘুম দরকার, তুমি ঘুমাও।
আলতাফ ঘুমিয়ে পড়ল।
.
বিধুবাবুর আর্নিকা টু হানড্রেড অষুধের জন্যেই হোক কিংবা আলতাফের কারণেই হোক ভোরবেলায় বজলুর রহমান নিতান্তই সাধারণ মানুষ। আগ্রহ করে সকালের নাশতা খেলেন। মনোয়ার ভয়ে ভয়ে বললেন, রুটিতে তেলাপোকার গন্ধ পাচ্ছ না তো?
বজলুর রহমান ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, সব সময় উদ্ভট কথা। রুটিতে তেলাপোকার গন্ধ হবে কেন? রুটি কি তেলাপোকার পাউডার দিয়ে বানায়?
মনোয়ারা তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
.
০৯.
বেলা এগারোটা।
মনসুর সাহেব আলতাফকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গেছেন। তাদের দুজনের সামনেই কফির মগ। আলতাফ কফিতে একটা চুমুক দিয়েই মগ নামিয়ে রেখেছে। সে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না এমন কুৎসিত জিনিস মানুষ কি করে খায়।
মনসুর সাহেবের ঘর অন্ধকার। চোখে কালো চশমা। গতকাল কিছু সময় চশমা ছাড়া ছিলেন। এতেই মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। এখনো তার রেশ আছে। অফিসের কাজে মন বসছে না বলেই আলতাফকে ডেকে এনেছেন। লোকটিকে তার যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। কথা বলে আরাম পাওয়া যায়। লোকটি এতে প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছে কি না কে জানে! এদের প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না। প্রশ্রয় পেলেই মানুষ ঘাড়ে উঠে যেতে চেষ্টা করে। মনসুর সাহেব ঠিক করে রেখেছেন, আজই শেষ দিন। আর কোন গল্পগুজব হবে না।
আলতাফ সাহেব!
জি স্যার।
কফি খাচ্ছেন না যে?
ভাল লাগছে না স্যার।
অভ্যাস না থাকলে ভাল না লাগারই কথা। আপনি কি ধূমপান করেন?
জি না।
ধূমপানও অভ্যাসের ব্যাপার। অভ্যাস না থাকলে সিগারেটের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসবে। আবার যারা অভ্যস্ত তারা পাগল হয়ে থাকে এই ধোয়াটার জন্য।
জি-স্যার।
মনসুর সাহেব সিগারেট ধরিয়ে তার রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিলেন। খানিকটা ইতস্তত করে বললেন–পোকাদের ভাষায় যে কাগজে কিছু লেখা লিখেছিলেন সেটার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলুন।
মনসুর সাহেব ড্রয়ার থেকে কাগজটা বের করলেন। আলতাফ কাগজটা হাতে নিল। নিচু গলায় বলল, স্যার, আমি তো ওদের সাহায্য ছাড়া পারব না।
ওদের সাহায্য নিয়েই করুন।
তাহলে আমার নিজের টেবিলে চলে যাই?
যান। লাঞ্চ টাইমে আসবেন। তখন দেখব।
আলতাফ উঠে দাঁড়াল। মনসুর সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, পোকা প্রসঙ্গে এটাই হবে আপনার সঙ্গে আমার শেষ বৈঠক।
জি আচ্ছা, স্যার।
আপনার টেবিলে একটা ফাইল পাঠিয়েছি সকালবেলায়। পেয়েছেন?
পেয়েছি স্যার।
ফাইলটা খুব জরুরি। আপনি কাজকর্ম সাবধানে করেন বলে আপনাকে পাঠানো হল। ফাইলে নোট দেয়া আছে। সেই নোট দেখে কাজ শেষ করবেন। আজ বাসায় যাওয়ার সময় ফাইলটা নিয়ে যাব।
জ্বি আচ্ছা।
মনসুর সাহেব বিরক্ত বোধ করছেন। বিরক্তিটা নিজের উপর। সামান্য বিষয় নিয়ে তিনি মাথা ঘামাচ্ছেন। সামান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। তিনি চোখ থেকে কালো চশমা খুললেন। চোখ জ্বালা করতে লাগল। টেবিলের পায়ে সারি সারি পোকা দেখা যাচ্ছে। অথচ কাল বেয়ারাকে বলে দিয়েছেন সারা ঘরে যেন খুব ভাল করে এরোসল স্প্রে করে দেয়। এরোসল কিনে আনার টাকাও দিয়েছেন।
আসলে এই ঘরটাই স্যাঁতস্যাঁতে। ট্রপিকেল দেশের একটা ভেজা ঘরে পোকা থাকবেই। ঘরের কার্পেট রোদে দেয়া দরকার। আজ দেয়া যেত। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে, বৃষ্টি নামতে পারে। তাকে অপেক্ষা করতে হবে রোদের জন্যে। কড়া রোদের জন্যে। কড়া রোদ উঠলেই এই ঘরের যাবতীয় আসবাব তিনি ছাদে নিয়ে যাবেন। শুধু অফিসের আসবাব না–নিজের বাড়ির আসবাবও। বাড়িতেও একই অবস্থা। গতকালই প্রথম লক্ষ করলেন।
তিনি আলো সহ্য করতে পারেন না। কাজেই বাড়িও অন্ধকার করে রাখেন। চোখের সমস্যাটা দীর্ঘদিন ধরে বিব্রত করছে। দেশের এবং বিদেশের অনেক ডাক্তারই দেখিয়েছেন। সর্বশেষ যিনি দেখেছেন তার নাম প্রফেসর জেনিংস। আমেরিকান ডাক্তার। তিনি এক পর্যায়ে বললেন, তোমার চোখে কোন ত্রুটি নেই। সমস্যাটা মানসিক। তুমি একজন মানসিক রোগের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বল। মনসুর সাহেব ডাক্তারের কথায় রেগে গিয়েছিলেন। আমেরিকান ডাক্তারদের এই সমস্যা। যখন কিছু ধরতে পারে না তখন বলে বসে–সমস্যাটা মানসিক।
সেই মানসিক রোগের ডাক্তার তিনি দেখিয়েছিলেন। তিনিও কিছু ধরতে পারেননি। ধরতে পারার কথা নয়। তার জীবনে বড় কোন দুর্ঘটনা কিংবা বড় কোন আঘাতের ঘটনা ঘটেনি। প্রথম যৌবনে স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। সে তো অনেকেরই হয়। তিনি আর বিয়ে করেননি। চোখের সমস্যা তখনি দেখা দিতে শুরু করে।
মনসুর সাহেবের চোখ জ্বালা করছে। অনেকক্ষণ হল তার চোখে চশমা নেই। চোখ জ্বালা করারই কথা। তিনি চশমা চোখে দিয়ে ডাকলেন–মকবুল।
