.
০৮.
আলতাফ বাড়ি ফিরে দেখে দুলারী শুকনো মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আলতাফ বলল, কি হয়েছে? দুলারী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কিছু হয়নি। আলতাফ বলল, তুমি আজ কলেজে যাও নাই?
কলেজে কি করে যাব? বাসায় কত কাণ্ড হচ্ছে।
কি কাণ্ড?
বাবার মাখা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে।
ও আচ্ছা।
আলতাফ এমনভাবে ও আচ্ছা বলল যেন মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। রোজই হয়। দুলারী বলল, তুমি তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তারের কাছে যাও।
আচ্ছা।
আমিও যাব, বাবার কি হয়েছে ডাক্তারকে বুঝিয়ে বলব। তুমি বলতে পারবে না। বাবাকে সঙ্গে নেয়া যাবে না।
আচ্ছা।
কোন্ ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায় বল জে?
বিধুবাবু পাড়ার হোমিওপ্যাথি। ভাল ডাক্তার। রোগির ভিড় লেগেই আছে। আগে তাঁর ফী ছিল পাঁচ টাকা। সম্প্রতি দশ টাকা করেছেন। তবে পুরানো রোগিদের বেলায় এখনো পাঁচ টাকা।
.
বিধুবাবু দুলারীকে দেখেই বললেন, তোর বাবার গলার কাটা দূর হয়েছে তো? গলার কাটার একটাই অষুধ। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাশাস্ত্রে গলার কাটার আর কোন অষুধ নেই।
বিধুবাবুর এই এক সমস্যা–একবার কোন অষুধ দিলে বছরের পর বছর মনে থাকে। চার-পাঁচ বছর পরেও বিধুবাবুর সঙ্গে যদি দুলারীর দেখা হয় তিনি হাসিমুখে বলবেন, তোর বাবার গলার কাঁটাটার অবস্থা কি?
তাঁর অষুধে কাঁটা দূর হয়নি এটা বললে ঘণ্টাখানিক বক্তৃতা শুনতে হবে। দুলারী সে কারণেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল। করুণ গলায় বলল, চাচা, বাবাকে একটা অষুধ দিন।
হয়েছে কি?
মাথা গরম হয়েছে। বাবা চারদিকে শুধু তেলাপোকা দেখতে পাচ্ছেন।
ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।
দুপুরবেলা ঘুমুতে গিয়েছেন, চাদর গায়ে দিয়েই চিৎকার শুরু করলেন, পোকা! পোকা। আমরা ছুটে গেলাম। দেখি, বাবা থরথর করে কাঁপছেন। অথচ একটা পোকাও নেই। কিন্তু বাবা চারদিকে পোকা দেখছেন।
ও আচ্ছা।
বাথরুমে যখন যান তখন সেখানেও পোকা দেখেন। বেসিনে পোকা, মেঝেতে পোকা, কমোডে পোকা, কিন্তু আমরা দেখি না।
হুঁ।
ঘুমের মধ্যেও তেলাপোকা দেখেন। বিকেলে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছি, হঠাৎ জেগে উঠে বললেন, আমার সারা শরীরে পোকা উঠে গেছে। দেখতে পাচ্ছিস না?
বিধুবাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ও কিছু না, বিকার হয়েছে। পেট গরমের জন্যে হয়েছে। হজমের গণ্ডগোল হলে হয়। পিত্ত নষ্ট হয়ে যায়। সেখান থেকেই বিকার। আর্নিকা টু হানড্রেড একফোঁটা খাইয়ে দে, আর দেখতে হবে না। আর্নিকা হল বিকারের বাবা।
এক ফোঁটাতেই কাজ হবে?
আধা ফোঁটাতেও হবে। আধা ফোঁটা করা যায় না বলেই এক ফোঁটা। হোমিওপ্যাথির মজা এইখানেই। তাহলে এক গল্প শোন। নাইনটিন ফিফটি থ্রি-র ঘটনা …
গল্পটা আরেক দিন শুনব চাচা।
আরে শুনে যা, পরে মনে থাকবে না। আমার কাছে একবার এক রোগি এসেছেন। আমি অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাঁকে দিলাম কেলিফস ফোর হানড্রেড। আমি তাকে বললাম, অষুধ নিয়ে যান, খেতে হবে না। দৈনিক একবার শুকবেন। এতেই রোগ আরোগ্য হবে।
হয়েছিল?
হবে না মানে? কি বলিস তুই? এটা কি এলোপ্যাথি পেয়েছিস যে ইনজেকশন দিয়ে দিয়ে শরীর মোরব্বা বানিয়ে ফেলব, তারপরেও রোগ সারবে না? তোর বাবাকে যে অষুধ দিলাম নিয়ে যা, দুটা ডোজ পড়ুক, তারপর দেখবি হানিম্যানের মাহাত্ম।
.
বিধুবাবুর অষুধ বজলুর রহমান খেতে রাজি হলেন না। রাগী গলায় বললেন, আমার কি হয়েছে? অষুধ দিচ্ছিস কেন?
দূলারী ক্ষীণ গলায় বলল, তুমি চারদিকে পোকা দেখছ এইজন্যে অষুধ।
আমাকে অষুধ দিচ্ছিস কোন বিবেচনায়? পোকাদের অষুধ দে যেন ওরা আমার সামনে না আসে।
বাবা, তুমি চোখে ভুল দেখছ।
আমি চোখে ভুল দেখছি। আর তোরা সব শুদ্ধ দেখছিস? ফাজলামির একটা সীমা থাকা দরকার। যা আমার সামনে থেকে।
দুলারী পালিয়ে গেল। বজলুর রহমান সন্ধ্যাবেলা পোকা মারার আরো সব অষুধ কিনে আনলেন। বিষাক্ত সব অষুধ। খালি হাতে স্প্রে করা যায় না। গ্লাভস পরে নিতে হয়। তিনি গ্লাভসও কিনে আনলেন। রাতে খেতে বসে ভাতের নলা মুখের কাছে নিয়ে নামিয়ে রাখলেন, মনোয়ারা বললেন, কি হয়েছে?
ভাতে তেলাপোকার গন্ধ। মুখে নেয়া যাচ্ছে না।
নতুন চালের ভাত গন্ধ হবে কেন?
সেটা আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? ভাতকে জিজ্ঞেস কর।
ঘরে পোলাওয়ের চাল আছে। দেই তোমাকে চারটা ফুটিয়ে?
দাও।
বজলুর রহমান সেই চালের ভাতও খেতে পারলেন না। মুখের কাছে নিয়ে ফেলে দিলেন। ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, এখন তো আরো বেশি গন্ধ। মনে হচ্ছে তেলাপোকা সিদ্ধ করে নিয়ে এসেছ।
রাতে কিছু না খেয়েই তিনি বিছানায় গেলেন। বালিশে মাথা রেখেই লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বলেন। মনোয়ার ভয়ে ভয়ে বললেন, কি হয়েছে?
বজলুর রহমান থমথমে গলায় বললেন, বিছানা-বালিশ ধুতে মনে থাকে না? কর কি সারাদিন? পোকার গন্ধে ঘরে থাকা যায় না।
ধোয়া একটা চাদর দেই?
কিছু দিতে হবে না।
দুলারী ভয়ে ভয়ে বলল, বাবা, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার শরীর খারাপ করেছে। বিধু চাচার অষুধটা খেয়ে নাও। তোমার পায়ে পড়ি বাবা।
বজলুর রহমান বললেন, নিয়ে আয় তোর অষুধ!
বর্জলুর রহমান বাকি রাতটা বারান্দার চেয়ারে বসে কাটালেন। তাঁর সঙ্গে জেগে রইলেন মনোয়ারা এবং দুলারী। শুধু আলতাফ যথাসময়ে ঘুমুতে গেল। দুলারী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বাবার এতবড় অসুখ, তুমি দিব্যি ঘুমুতে যাচ্ছ! তোমার কি মায়া দয়া নেই?
