.
বড় সাহেব বললেন, কি খবর আলতাফ সাহেব?
আলতাফ অস্বস্তির সঙ্গে বলল, খবর ভাল স্যার।
বসুন। করছিলেন কি?
টিফিন খেতে যাচ্ছিলাম স্যার।
খেয়ে ফেলেননি তো?
জ্বি না।
গুড। আমার সঙ্গে খাবেন। খেতে খেতে আপনার কথা শুনি। ঐদিন ঠিকমত শোনা হয়নি।
মনসুর আলী সাহেব নিজেই প্লেট এগিয়ে দিলেন। বড়লোকের খাবার খুব সাধারণ হয়। স্যান্ডউইচ এবং চা। আলতাফের পেটের একটা কোণা শুধু ভরল। সে দুপুরে চা খায় না। চা খাওয়ার জন্যে কেমন জানি লাগছে। পেটে ভুটভট শব্দ হচ্ছে।
আলতাফ সাহেব।
জি স্যার।
ঐ দিন পোকাদের ব্যাপারে কি যেন বলছিলেন, আবার বলুন।
কি বলেছিলাম মনে নেই স্যার।
পোকারা আপনাকে লেখার ব্যাপারে সাহায্য করে–এইসব।
তা স্যার করে।
একটু বুঝিয়ে বলুন। বলতে কোন বাধা নেই তো?
জি না। তবে কাউকে বলি না।
বলেন না কেন?
দুলারী পছন্দ করে না। দুলারীর ধারণা, এই সব শুনলে লোকে আমাকে পাগল ভাববে।
দুলারীটা কে?
আমার মামাতো বোন। লালমাটিয়া কলেজে বি এ, পড়ে।
পোকার ব্যাপারটা শুধু সেই জানে?
আমার মামা-মামীও জানেন। তাঁ
রা কি আপনাকে পাগল ভাবেন?
জি না, ভাবেন না। তাঁরা আমাকে খুব স্নেহ করেন।
এবার বলুন আপনার পোকার কথা।
বলার মত কিছু নাই স্যার। পোকাদের আমরা খুব তুচ্ছ করি। ওদের তুচ্ছ করা ঠিক না। এরকম তুচ্ছ করলে এরা রেগে যেতে পারে। এরা সহজে রাগে না। একবার রেগে গেলে মুশকিল।
ও আচ্ছা।
মানুষের চেয়ে ওদের বুদ্ধি অনেক অনেক বেশি।
ও আচ্ছা। আপনার কি ধারণা ওদের স্কুল-কলেজ আছে?
ওদের ব্যাপারটা ঠিক আমাদের মত না। ওরা সবাই একসঙ্গে চিন্তা করে, একসঙ্গে ভাবে। এইভাবে তারা শেখে। যেমন স্যার, মনে করুন, একটি তেলাপোকা আপনার রান্নাঘরে আছে, আরেকটা আছে আমাদের অফিসে। রান্নাঘরের পোকাটা কি ভাবছে তা আমাদের পোকাটা জানে।
আপনি এইসব থিওরি ভেবে ভেবে বের করেছেন?
ওরা আমাকে বলেছে।
ও আচ্ছা। কি ভাবে বলল? ডেকে বলল?
মাঝে মাঝে ওরা আমাকে স্বপ্ন দেখায়।
সবই তাহলে স্বপ্নে পাওয়া?
স্বপ্ন ছাড়াও ওরা আমাকে বলে।
মনসুর আলী সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন। আলোচনা তিনি চালিয়ে যাবেন কি না বুঝতে পারছেন না। কোন প্রয়োজন অবশ্য নেই। তবে কথা শুনতে মজা লাগছে। পৃথিবীতে বিচিত্র ধরনের মানুষ আছে। সেই বিচিত্র মানুষদের একজন এই মুহূর্তে তাঁর সামনে বসে আছে, যাকে পোকারা অনেক কিছু বলে।
আপনি কি সিগারেট খান আলতাফ সাহেব?
জ্বি না, স্যার।
সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারে কি পোকাদের কোন বিধি-নিষেধ আছে?
জি না, স্যার।
কথাটা বলেই মনসুর আলীর একটু খারাপ লাগল। কারণ তিনি এই মানুষটাকে নিয়ে মজা করছেন। বিচিত্র মানুষদের নিয়ে সবাই মজা করে। এটা এদের স্বাভাবিক পরিণতি। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো দেখা যাবে অফিসের সবাই একে ডাকছে–পোকাবাবু। তিনি আলতাফ সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। নির্বিরোধি লোক। অফিসের কাজে অতিদক্ষ। কাজকর্ম ফেলে রেখেই এই লোকটি যদি পোকা পোকা করতো তাহলে ভিন্ন কথা ছিল। তা তো করছে না। পোকা হল লোকটার পাষ্ট টাইম।
আলতাফ সাহেব।
জ্বি স্যার।
আপনার এই পোকার ব্যাপারটা কতদিনের? অর্থাৎ কতদিন থেকে আপনি পোকাদের ব্যাপারগুলি বুঝতে পারছেন?
অনেক দিনের ব্যাপার স্যার। খুব ছোটবেলার।
বলুন তো শুনি।
আমি স্যার বলতে পারব না।
বলতে কি কোন নিষেধ আছে?
নিষেধ নেই কিন্তু বলতে ইচ্ছা করে না। এটা স্যার আমি দুলারীকেও বলি নাই।
দুলারী নামের আপনার মামাতো বোনকে আপনি সবকিছুই বলেন?
জি স্যার, বলি। হঠাৎ হঠাৎ গভীর রাত্রে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন বলতে ইচ্ছা করে। শেষ পর্যন্ত বলা হয় না। আমার মনে হয় পোকারাই বাধা দেয়। ওরা তো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা বুঝতে পারি না।
পোকারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে?
জ্বি স্যার করে। এই যে আপনি এত ক্যান্ডিডেট থাকতে আমাকে চাকরি দিয়েছেন। পোকাদের কারণে দিয়েছেন। পোকারা আপনাকে বাধ্য করেছে। বোর্ডের মেম্বাররা আমাকে চাকরি দিতে চায়নি। আপনি জোর করে দিয়েছেন।
আপনার তাই ধারণা?
ধারণা না স্যার, এটাই সত্যি। এই যে আপনি কালো চশমা পরে থাকেন, পোকারা সেটা করেছে।
বুঝতে পারছি না।
আপনার ঘরভর্তি ছোট ছোট পোকা। আপনি যাতে এদের দেখতে না পারেন এই জন্যে পোকারা আপনাকে কালো চশমা পরিয়ে রাখে। আপনি মনে করছেন, আপনি নিজের ইচ্ছায় কালো চশমা পরছেন। আসলে তা না।
এইগুলি পোকারা আপনাকে বলেছে?
জ্বি না স্যার, এইগুলি আমার অনুমান।
মনসুর আলী গম্ভীর গলায় বললেন, আচ্ছা যান। কাজ করুন, অনেক গল্প করা হল। আলতাফ নিজের চেয়ারে ফিরে আসামাত্র গনি সাহেব ছুটে এলেন। গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, সমস্যাটা কি?
কোন সমস্যা নেই।
স্যার কি নিয়ে আলাপ করলেন?
পোকা নিয়ে।
গনি সাহেব মনে মনে বললেন, হারামজাদা, আমার সঙ্গে রসিকতা! আমি তোর পাছা দিয়ে পোকা ঢুকায়ে দেব। বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। এমিতে অবশ্যি সহজ গলায় বললেন, আচ্ছা, আচ্ছা। পোকা নিয়ে কথা বলা খুব ভালো। বলুন, কথা বলুন।
মনসুর আলী বেলা তিনটার দিকে চোখ থেকে কালো চশমা খুললেন। তাঁর চোখ জ্বালা করতে লাগল। আলো তাঁর একেবারেই সহ্য হয় না। বেয়ারাকে বললেন জানালার পর্দা সরিয়ে দিতে। পর্দা সরোনোর পরেও ঘরে তেমন আলো হল না। কারণ জানালা বন্ধ এবং জানালার কাঁচে নীল রঙ করা। জানালা খুলতে হলে এয়ারকুলার বন্ধ করতে হয়। মনসুর আলী এয়ারকুলার বন্ধ করে জানালা খুলতে বললেন। জানালা খোলা খুব সহজ ব্যাপার হল না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সব জং ধরে গেছে। মিস্ত্রী ডাকিয়ে জানালা খুলতে হল। মনসুর আলী তার রিভলভিং চেয়ারে বসে দেখলেন, সারি সারি পোকা তাঁর টেবিলের পা বেয়ে উপরের দিকে উঠছে। তার প্রথমে মন হল পিপড়া। এরা বর্ষার সময় ডিম নিয়ে শুকনো আশ্রয়ের খোঁজে যায়। ভাল করে লক্ষ করে দেখলেন, পিপড়া না, অন্য কোন পোকা। লালচে রঙ। দশটা করে পা। শুধু যে টেবিলেই পোকা তা না। মেঝেতে পোকা। দেয়ালে পোকা। দেয়ালের পোকাগুলির রঙ সাদা। দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিশে আছে, খুব ভাল করে লক্ষ না করলে বোঝাই যায় না! মেঝেতেও পোকা। এদের রঙ আবার নীলচে। মেঝের কার্পেটের সঙ্গে সেই রঙের কিছু মিল আছে। তাঁর মাথা ধরে গেল। প্রচণ্ড মাথা ধরল। মাথাধরার অবশি যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। অনেকদিন পর চোখে কড়া আলো এসে লেগেছে। নিয়মের ব্যতিক্রম করে মনসুর আলী আজ অফিস ছুটি হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই বাড়ি চলে গেলেন।
