মনোয়ার বাথরুমে উঁকি দিয়ে চমকে উঠলেন। সত্যি সত্যি সব পোকা মরে পড়ে আছে। বাথরুমের মেঝেটাকে মনে হচ্ছে মেরুন কার্পেটে ঢাকা। বজলুর রহমান বললেন, দেয়াশলাই নিয়ে আসি, আগুন জ্বালিয়ে দেব। বোন ফায়ার হবে।
মরেই তো গেছে, আগুন জ্বালানোর দরকার কি?
দরকার আছে, তুমি বুঝবে না। তোমাকে যা করতে বলছি কর। কেরোসিন আর আগুন নিয়ে আস। কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দেব।
শেষে ঘরে আগুন-টাঙ্গুন লেগে একটা কাণ্ড হবে।
তোমাকে যা করতে বলেছি কর। ফালতু তর্ক যথেষ্ট করেছ। Enough is enough.
মনোয়ারা কেরোসিন আর দেয়াশলাই আনতে গেলেন। আগুন লাগানোর উত্তেজনায় বজলুর রহমান আলতাফের কথা ভুলে গেছেন এটা একটা বড় ব্যাপার। নয়তো আরো যন্ত্রণা হত। ঘরে এখন কেরোসিন আছে কিনা কে জানে। বোতলের ভেতর খানিকটা থাকার কথা, না থাকলে ভয়াবহ কাণ্ড হবে।
কেরোসিন ছিল। মনোয়ারা কেরেসিনের বোতল এবং দেয়াশলাই নিয়ে বাথরুমে ঢুকে দেখেন, সব তেলাপোকা একত্র করে বেসিনে রাখা হয়েছে। বেসিন প্রায় আধাআধি ভরা। বজলুর রহমান আনন্দিত গলায় বললেন, ক’টা পোকা আছে বল তো?
মনোয়ারা বললেন, ছয় হাজার।
তোমার আন্দাজ বলে কিছু নেই। এখানে পোকা আছে মোট ২১৩টা।
তুমি বসে বসে গুনেছ?
না গুনলে জানব কি করে?
বজলুর রহমান কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলেন। পট পট শব্দ হতে থাকল। উৎকট গন্ধে ঘর ভরে গেল। মনোয়ারা বললেন, শব্দ হচ্ছে কিসের?
পেট ফেটে যাচ্ছে তার শব্দ। পেট ফেটে সাদা সাদা কি যেন বের হচ্ছে।
মনোয়ারা বললেন, ওয়াক থু!
তাঁর নাড়িভুড়ি উল্টে বমি আসছে। ঘরময় উৎকট গন্ধ। মনোয়ারা অনেক কষ্টে বমি আটকে রাখছেন। বমি করলে বজলুর রহমান রেগে যেতে পারেন।
ফরিদা।
হুঁ।
আগুন হল পোকার একমাত্র অষুধ। Only Medicine.
হুঁ।
বজলুর রহমান হাসিমুখে বললেন, সব পোকা মেরে ফেলা ঠিক হয়নি। দু একটা রেখে দেয়া উচিত ছিল। মিসটেক হয়ে গেছে। বিগ মিসটেক।
দু-একটা রেখে দিলে কি হত?
ওরা গিয়ে অন্যদের খবর দিত। অন্যদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত। হা হা হা।
বজলুর রহমান বেসিনে আরো কেরোসিন ঢেলে দিলেন। গন্ধ আরো বিকট হল। ফরিদা বললেন, ওয়াক থু! বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, কথায় কথায় ওয়াক থু বলবে না। ওয়াক থু র কি আছে?
গন্ধে টিকতে পারছি না।
টিকতে না পারলে চলে যাও। দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে কে?
ফরিদা মেয়ের ঘরে চলে গেলেন। মেয়েকে সব জানানো দরকার। তাঁর কিছুই ভাল লাগছে না। মানুষটা এরকম করছে কেন? দুলারী জেগেই ছিল। ফরিদা একবার ডাকতেই উঠে এল। বিরক্ত গলায় বলল, কি হয়েছে?
তোর বাবার কাণ্ডকারখানা আমার ভাল লাগছে না।
কি করছে বাবা?
পোকা পুড়াচ্ছে।
সেটা আবার কি?
তুই নিজের চোখে না দেখলে বুঝবি না।
দুলারী নিচে নেমে এল। বজলুর রহমান মেয়েকে দেখে হাসিমুখে বললেন, একটা কলম আর ফুলস্কেপ কাগজ অন তো।
পোকা মারার পাকা হিসাব থাকা দরকার। মোট ২১৪টা খতম। দিনের বেলা মারলাম একটা, রাতে মেরেছি দুইশ তের। সব মিলিয়ে টু হানড্রেড এন্ড ফর্টিন।
আচ্ছা।
মেরে সব সাফ করে দেব। রোজ রাতে বোন-ফায়ার হবে। জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো।
দুলারী বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আনন্দে বজলুর রহমানের চোখ ঝলমল করছে? দুলারী বলল, তোমার কি হয়েছে বাবা?
কি হবে আবার?
কেমন যেন অদ্ভুত করে তাকাচ্ছ!
তোকে খাতা-কলম আনতে বলছি, আন।
দুলারী কাগজ কলম আনতে গেল। যাবার সময় শুনল–তার বাবা গুনগুন করে গানের সুর ভাজছেন। হিন্দি গানের সুর–লালা লা লালা লা। হচ্ছেটা কি? বাবা কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন?
.
০৭.
দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের সময় মনসুর আলী তাঁর বেয়ারাকে বললেন, আলতাফ সাহেবকে আসতে বল। বেয়ারা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল। আলতাফের কাছে গিয়ে অন্যদিনের মত তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করল না। চোখ বড় বড় করে বলল, বড় সাব আপনেরে ডাকে। এক্ষণ চলেন। এক্ষণ।
আলতাফ টিফিন বক্স খুলেছে। দুটা আটার রুটি, একটা ডিম, একটা কলা। এক কোণায় সামান্য আচার। সে কখনো আচার খায় না। তারপরও দুলারী প্রতিদিন টিফিন বক্সের এক কোণায় খানিকটা আচার দিয়ে দেয়। আলতাফ কলাটি বের করল। ফল সবার শেষে খাওয়া উচিত। সে সবার আগে খায়। ধীরে ধীরে কলার খোসা ছাড়াতে তার ভাল লাগে।
আলতাফ কলার খোসা ছাড়াচ্ছে, বেয়ারা বিরক্ত হয়ে বলল, বড় সাহেব ডাকছেন তো। আলতাফ সহজ গলায় বলল, এখন যেতে পারব না। খাচ্ছি।
বেয়ারা এমন চোখে তাকাচ্ছে যেন তার জীবনের সবচে আশ্চর্যজনক ঘটনাটি সে এই মুহূর্তে ঘটতে দেখছে। গনি সাহেব উঠে এসে বললেন, কি হয়েছে?
বড় সাহেব খবর দিলেন, উনি যাবে না।
যাবেন না কেন আলতাফ সাহেব?
খাচ্ছি তো।
আপনার মাথাটা খারাপ কিনা সেটাই তো বুঝতে পারছি না। পরে খাবেন। খাওয়া পালিয়ে যাবে না। যান শুনে আসুন।
আলতাফ অনিচ্ছার সঙ্গে ওঠে দাঁড়াল। গনি সাহেব কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, ভয় পাবেন না, আমরা পেছনে আছি। We are behind you আলতাফ বিস্মিত হয়ে বলল, ভয় পাব কেন? গনি সাহেব গলা আরো নামিয়ে দিয়ে বললেন, বড় সাহেবরা কেরানীদের সঙ্গে প্রেমালাপ করার জন্যে ডাকে না। এটা শুধু খেয়াল রাখবেন, তাহলেই বুঝবেন ভয় পাবার কিছু আছে কি না।
