শুধু চা-ই খেলেন, না আরো কিছু আলাপ-টালাপ হল?
পোকাদের নিয়ে কথা বলেছি।
বুঝতে পারলাম না, কাদের নিয়ে কথা বলেছেন?
তেলাপোকা, ঘুনপোকা, মাকড়সা–এদের নিয়ে।
গনি সাহেব হাসিমুখে বললেন, আচ্ছা, আচ্ছা। মনে মনে বললেন, গভীর জলের মাছ, Deep water fish. পোকাদের নিয়ে কথা বলা হচ্ছিল। আমার সঙ্গে মামদোবাজি, পোকার চাটনি বানিয়ে খাইয়ে দেব। তখন বুঝবে পোকা কি জিনিস।
আলতাফ সাহেব!
জ্বি।
চলুন আপনাকে রিকশায় তুলে দিয়ে আসি।
আমি বাসে করে যাই।
চলুন তাহলে বাসস্টপ পর্যন্ত যাই।
গনি সাহেব ভেবেছিলেন, যেতে যেতে আরো কিছু কথা বের করা যাবে। লাভ হল না। আলতাফ হ্যাঁ হুঁ ছাড়া কিছুই বলল না। ব্যাটা আসলেই গভীর জলের মাছ। তার আগেই টের পাওয়া উচিত ছিল। টের পাননি। এখন থেকে ব্যাটাকে চোখে চোখে রাখতে হবে। খাতির জমাতে হবে। সবচে ভাল হয় বাসা চিনে এলে। ছুটির দিনে বাসায় চলে যেতে হবে।
আলতাফ সাহেব।
জ্বি।
আপনার বাসা কোথায়?
মগবাজারে।
মগবাজারে কোথায়?
রেল ক্রসিং-এর কাছে।
বলেন কি! আমার এক রিলেটিভ থাকে, আমি আসি প্রায়ই। দেখি একবার যাব আপনার বাসায়। ঠিকানাটা কি?
আলতাফ ঠিকানা বলল। গনি সাহেব নোটবই বের করে ঠিকানা লিখে রাখলেন। মনে মনে ভাবলেন, কাল ছুটির দিন আছে, সন্ধ্যাবেলার দিকে চলে যাবেন। ব্যাটা ভুল ঠিকানা দিয়েছে কিনা কে জানে। গভীর জলের মাছ! ভুল ঠিকানা দিতেও পারে।
গায়ে জ্বর নেই
০৬.
রাতে বজলুর রহমান কিছু খেলেন না। তাঁর গায়ে জ্বর নেই। কিন্তু শরীর খারাপ লাগছে। মাথা ঘুরছে। প্রেসারটা একবার দেখানো উচিৎ, মনে হচ্ছে সমস্যটি প্রেসার-ঘটিত। গত রাতে ঘুম হয়নি। প্রেসার রোগিদের একরাত ঘুম না হলে অনেক সমস্যা হয়। বজলুর রহমান রাত নটা বাজার আগেই হিপনল নামের একটা ঘুমের অষুধ এবং আধকাপ দুধ খেয়ে বিছানায় চলে গেলেন। বাতি নিভিয়ে দিলেন। মনোয়ারাকে বলে দিলেন–কেউ যেন হৈ-চৈ না করে। হৈ চৈ করলে কারবালা হয়ে যাবে।
বজলুর রহমানের আশংকা ছিল আজও ঘুম আসতে চাইবে না। আয়োজন করে ঘুমুতে গেলে ঘুম আসে না–এটাই নিয়ম। ঘুমের অষুধ আরো সমস্যা করে। তিনি যে কবার ঘুমের অষুধ খেয়েছেন, সে কবারই সারারাত জেগে কাটিয়েছেন। এক ফোঁটা ঘুম হয়নি।
আজ রাতে সে রকম হল না। দেখতে দেখতে ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এল। তৃপ্তির ঘুম। এমন আরাম করে তিনি বহুকাল ঘুমাননি। তাঁর ঘুম ভাঙল গভীর রাতে। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল। তিনি দেখলেন–মেঝে ছেয়ে গেছে তেলাপোকায়। তারা এগুচ্ছে তাঁর খাটের দিকে। কুড়ি-পঁচিশটা না, হাজারে হাজারে পোকা। সবাই একসঙ্গে শুঁড় নাড়ছে। পা ফেলছে তালে তালে। অনেকটা সৈন্যদের মার্চের ভঙ্গিতে। তিনি ঘুমের মধ্যেই বললেন, এই, স্টপ, স্টপ।
পোকাদের বাহিনী থমকে গেল। তারপর আবার এগুতে শুরু করল। তিনি ঘুম ভেঙে বিছনায় উঠে বসলেন। কাঁপা গলায় ডাকলেন, মনোয়ারা! মনোয়ারা!
মনোয়ারা উঠে বসলেন।
বাতি জ্বাল।
মনোয়ারা বাতি জ্বাললেন। বজলুর রহমান ভীত গলায় বললেন, দেখ তো মেঝেতে কিছু আছে না কি।
কিছু নেই।
না দেখে কথা বলবে না। কষ্ট করে বিছানা থেকে নাম। তারপর বল। তোমার কোমরে তো বাত হয়নি যে বিছানা থেকে নামা যাবে না।
মনোয়ারা বিছানা থেকে নামলেন।
কিছু দেখছি না তো।
খাটের নিচটা দেখ।
খাটের নিচেও কিছু দেখা গেল না। বজলুর রহমান বললেন, ঠাণ্ডা পানি দাও। পানি খাব।
মনোয়ারা চিন্তিতমুখে পানি আনতে গেলেন। লোকটার হয়েছে কি? স্বপ্ন দেখেছে এটা বোঝা যাচ্ছে। এই বয়সে স্বপ্ন দেখে কেউ এমন বিকট চিৎকার দেয়?
বজলুর রহমান শান্তমুখে পানি খেলেন। মনোয়ারা বললেন, খিদে হয়েছে? কিছু খাবে?
না।
কি স্বপ্ন দেখেছ?
বজলুর রহমান কিছু বললেন না। স্ত্রীর সব প্রশ্নের জবাব তিনি দেন না। খামাখা সময় নষ্ট। মনোয়ারা জবাবের জন্য খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বাথরুমে গেলেন অজু করতে। রাত শেষ হয়ে আসছে। ফজরের নামাজের অজু করে রাখা যায়। মনোয়ারা বাথরুমের বাতি জ্বালিয়ে বিকট চিৎকার করলেন।
বজলুর রহমান বললেন, কি হয়েছে?
কিছু না।
কিছু না, তাহলে চিৎকার করছ কেন?
পোকা।
কি বললে?
হাজারে বিজারে তেলাপোকা। ওয়াক থু। কি ঘেন্না!
মনোয়ারা ধড়াম করে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিলেন। তাঁর গা গুলাচ্ছে। তিনি তাঁর বাহান্ন বছর জীবনে একসঙ্গে এত তেলাপোকা দেখেননি। বজলুর রহমান বললেন, গাধাটাকে ডাক।
কাকে ডাকব?
আলতাফকে ডাক।
ওকে ডাকব কেন?
যা করতে বলছি কর।
মনোয়ারা আলতাফকে ডাকতে গেলেন।
আলতাফ মরার মত ঘূমায়। ঘুম ভাঙানো দুঃসাধ্য ব্যাপার। সঙ্গদোষে মানুষ নষ্ট। দুলারীর ঘুমও এখন ভাঙে না। মনোয়ারা প্রাণপণে দুজা ধাক্কাচ্ছেন। কারো কোন সাড়া নেই। অনেকক্ষণ পর দুলারী জড়ানো গলায় বলল, কে?
আমি।
কি হয়েছে মা?
আলতাফকে তোর বাবা ডাকছে।
কেন?
বাথরুম ভর্তি তেলাপোকা।
তেলাপোকা তো বাথরুমেই থাকবে। এর জন্যে শুধু শুধু বেচারার ঘুম ভাঙাব? সারাদিন অফিস করে আসে।
ডেকে তোল না মা। তোর বাবা রাগ করবে।
করুক রাগ। আমি ডাকতে পারব না। আর ডাকলেও লাভ হবে না। ওর ঘুম ভাঙবে না।
মনোয়ারা ফিরে এসে দেখেন, বজলুর রহমান বাথরুমে কিল দেম স্প্রে করছেন। তাঁর চোখে-মুখে হিংস্র আনন্দ। তিন হৃষ্ট গলায় বললেন, মেরে সাফ করে দিয়েছি। গুষ্টি নাশ করে দিয়েছি। সান অব এ বিচ। ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি।
