খাওয়ার পর জয়গুন বাশের চোঙাটা নামায়। পয়সা রাখবার একমাত্র আঁধার এ চোঙাটা। মাটির ওপর ঢালে সমস্ত পয়সা। আনি, দুয়ানি, সিকি আলাদা আলাদা সাজিয়ে হিসেব করে। হাসুর আজকের আট আনাসহ মোট তিন টাকা দশ আনা। চাল কিনতে হবে। তেল, মরিচ, আরো অনেক কিছুই নেই। অনেক কিছুর মধ্যে লবণটা না কিনলেই চলে না। লবণ একটু বেশীই লাগে তার সংসারে। পান্তা ভাত খেতেই বেশী খরচ হয় লবণ।
হাসু বলে—একটা টুপি কিনার পয়সা দিবা, মা? কাইল ঈদের ময়দানে কি মাথায় দিয়া যাইমু?
—তোর টুপি কিনন লাগত না। টুপি একটা দিমু তোরে, তয় কাসুর লাইগ্যা একটা
হাসু সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলে—ওর একটা টুপি কিনতে আর কত লাগব? এই বড় জোর পাঁচ আনা, ছয় আনা।
মায়মুন একটু এগিয়ে মার দিকে চেয়ে ডাকে—মা।
—কি? থাইম্যা গেলি ক্যান? ক’।
পরিহিত কাপড়ের একটা ছেঁড়া জায়গা দেখিয়ে মায়মুন বলে—দ্যাহ মা, কেমুন ছিঁড়্যা গ্যাছে। ঈদের দিনে বেড়াইতে যাইমু না?
মেয়ের আবদার বুঝে রাগ হয় জয়গুনের। সে বলে—কি? কাপোড়?
—হ!
—হ! কাপোড়! কাপোড় দিয়া কবর দিমু তোরে শয়তান। ধাক্কা দিয়ে মায়মুনকে সরিয়ে ভেঙচিয়ে ওঠে জয়গুন।
হাসু মায়মুনের দিকে তাকায়। ব্যথায় তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
মায়মুন তাড়া খেয়ে শুয়ে পড়েছে। জয়গুন ডাকে—হাসুর গামছাটা পিন্দা কাপোড় খুইল্যা দে মায়মুন, সিলাইয়া দেই। কাইল রাইত গোয়াইলে সোডা দিয়া ধুইয়া দিমুহনে।
জয়গুন সুঁই-সুতা নিয়ে বসে। নিজের ও মায়মুনের কাপড়ে জোড়াতালি লাগায়। হাসু ও মায়মুন ঘুমিয়ে পড়েছে। মশার যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে। জয়গুন ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে মশা তাড়ায়।
সেলাই সারতে অনেক রাত হয়। রাত্রির নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ডাহুক ‘কোয়াক—কোয়াক’ করে ওঠে। চারদিকে পশুপাখীর ঘুম-কাতর সারা পাওয়া যায়। ঘরের হাঁস দু’টোও প্যাঁক প্যাঁক করে আবার ঠোঁট লুকায় পালকের মধ্যে। জয়গুন ভাবে—পইখ-পাখলার এক ঘুম হয়ে গেল।
জয়গুন কুপিটা নিবিয়ে মায়মুনের পাশ দিয়ে শুয়ে তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। অভ্যাসবশ মায়মুনও মা-র গলার ওপর একখানা হাত লতিয়ে দেয় ঘুমের ঘোষ। জয়গুনের বুক স্নেহে ভিজে ওঠে। সে ভাবে এ মেয়েটি কোন দিন তার কাছে আদর পায় না। আবদার করলে কিলথাপ্পড় খায়। কাপড় তার একখানা। তাও তালি দিয়ে দিয়ে এতদিন চলেছে। কিন্তু কাল ঈদ—বছরের সেরা দিন। এ কাপড়ে লজ্জা নিবারণ করা চলে, কিন্তু কুটুম্ব-বাড়ী যাওয়া চলে না। আর কুটুম্ব আছেই বা কে?
হাসুর চাচা আছে দু’জন। কিন্তু তারা হাসুর মৃত্যুই কামনা করে। জব্বর মুনশীর মৃত্যুর পর তার ভাগের তিন বিঘা জমি আর ঘরখানা পর্যন্ত হাসুর চাচা দু’জন জোর করে ভোগ-দখল করছে। এগুলোর আশা জয়গুন ছেড়েই দিয়েছে। হাসু বড় হয়ে যদি কোনদিন আদায় করতে পারে।
জয়গুন আবার ভাবে—হাসু ও মায়মুনের কপালে কুটুম্ব-বাড়ীর এক মুঠো ভাত লেখা নেই।
জয়গুন মায়মুনের চুলের মাঝে হাত দেয়। আঙুলের সাথে জড়িয়ে আসে এক গোছা চুল।
মায়মুন কোন কিছুর আবদার করলে বা কোন অন্যায় করলে সে চুল ধরে টান মারত। টানতে টানতে সে-ই আলগা করে দিয়েছে চুলগুলো। চুলগুলোর জন্যে তার মায়া হয়। চুলের মুঠি ধরে টানাটানি না করলে তার চুল এতদিন হয়ত কোমর অবধি লম্বা হত।
জয়গুন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, মায়মুনকে আর সে মারধর করবে না। অন্ততঃ তার চুল ধরে আর সে টানাটানি করবে না। মেয়ে বলে মায়মুনকে এতদিন সে অনাদর করেই আসছে। কিন্তু আর না। হাসু কোলের আর মায়মুন পিঠের—তাতো নয়! দু’জনকেই সে পেটে ধরেছে। আর মেয়ে হলেও মায়মুন লক্ষ্মী। সে বাইরে গেলে মায়মুনই সব কাজ করে। গায়ে এতটুকু জোর না থাকলেও কোন কাজ সে বড় ফেলে রাখে না।
মায়মুনের জন্যে আর কোন দিন জয়গুন এমন করে ভাবেনি। আজ হাসু ও মায়মুন তার চোখে সমান হয়ে গেছে।
অল্প কয়েকটা মাত্র চুল মায়মুনের মাথায়। বাদরের লোমের মত লালচে। যত্ন ও তেলের অভাবে জট পাকিয়ে গেছে। জয়গুন অন্ধকারে মাথা হাতড়ে উকুন মারে। উকুনে গিজগিজ করছে মাথা। রাত্রে রাত্রে এমনি করে মেরে সে কমিয়ে রেখেছে। নয় তো উকুনের আণ্ডা-বাচ্চায় এতদিন মাথা ছেয়ে যেত। তার নিজের মাথায় উকুন টিকতে পারে না। নানা চিন্তা-ভাবনায় মাথা গরম থাকে বলেই বোধ হয়।
অনেক রাত হয়েছে। উকুন বাছতে বাছতে মায়মুনের মাথায় হাত রেখেই জয়গুন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
০৮. ফুড কমিটির সেক্রেটারী
খুরশীদ মোল্লা গ্রামের ফুড কমিটির সেক্রেটারী। ঈদের দিন ভোর হওয়ার সাথে সাথে তার বৈঠকখানার বাইরে জড় হয় অনেক লোক। কেউ কেউ ভেতরেও আসে।
খুরশীদ মোল্লা একটু দেরীতেই ঘুম ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে চৌকির উপর এসে বসে। তার মুখে বিরক্তির স্পষ্ট আভাস সবার চোখেই ধরা পড়ে। গ্রামের মোড়ল কাজী খলিল বক্শ ও গদু প্রধান চৌকির ওপর সেক্রেটারীর পাশে বসে পড়ে।
খুরশীদ বলে—দেখুন তো কি ঝঞঝাট। ভোর না হতেই বাড়ী মাথায় করে তুলেছে। সব। ঈদের দিন এই উৎপাত কার ভাল লাগে? চিনি এসেছে মাত্র কমণ, আর গ্রামে লোক হচ্ছে দু’হাজার! এক তোলা করেও পড়বে না মাথা পিছু।
কাজী খলিল বক্শ উপস্থিত একজনকে উদ্দেশ করে বলে—কিরে লেদু, চিনি দিয়া কি করবি? তারপর নিজে নিজেই বলে—ভাত জোটে না, চিনি খায়। বাহার ব্যাটা! হেই-যে মাইনষে কইছিল—ঘর নাই, দুয়ার দিয়া হোয়।
