হুজরাখানার বর্তমানে গদিনসীন পীর হাফেজ জাহাঙ্গীর খতিবি এই মাছ হুজরাখানার ভক্তদের খাওয়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। হুজরাখানা সূত্রে জানা যায়, ভৈরবের বিখ্যাত মনা বাবুর্চির উপর এই মাছ রান্ধনের দায়িত্ব পড়েছে। অদ্য বৃহস্পতিবার নৈশভোজে হুজরাখানার তরফ থেকে ভক্তদের জন্যে মাছ ভাত এবং মাষকলাইয়ের ডালের আয়োজন করা হয়েছে।
এশার নামাজের পর রাতের খানা। হাফেজ জাহাঙ্গীর ফরজ নামাজ শেষ করে সুন্নত নামাজে যাবেন, এইসময় তার কাছে খবর গেল ঢাকা থেকে তাঁর স্ত্রী মায়মুনা এসেছেন। তিনি একা। তার সঙ্গে কেউ নেই। হাফেজ জাহাঙ্গীর বললেন, সোবাহানাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ। তিনি অনেক কষ্টে সুন্নত নামাজ শেষ করলেন। তার ছুটে যেতে ইচ্ছা করছে। ইচ্ছা করলেই তা সম্ভব না। আল্লাহপাক মায়মুনাকে উপস্থিত করেছেন। তাঁর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। শুকরানা নামাজ পড়তে হবে। কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়া করা যাবে না। আল্লাহপাক মানবসমাজের তাড়াহুড়া পছন্দ করেন না বলেই পবিত্র কোরান শরিফে বিরক্ত হয়ে বলেছেন, ‘হে মানব সমাজ! তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া।’
অবন্তির কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা অবশ্যই আছে যা কখনো বদলাবে না। খতিবনগর হুজরাখানা তার একটি। সব আগের মতো। এমনকি গন্ধও আগের মতো। মনে হচ্ছে কারও বয়সও বাড়ে নি।
সালমা তাকে দেখে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে অবন্তির গোসল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হুজরাখানার নিয়ম হলো বাইরে থেকে আসা কোনো মহিলা হুজরাখানার জেনানামহলে ঢোকার আগে সিনান করবে। পাকপবিত্র হয়ে আল্লাহপাকের নিরানব্বই নাম জপ করে জেনানামহলে ঢুকবে। এতে মহিলাদের সঙ্গে আসা দুষ্ট জ্বিন জেনানামহলে ঢুকতে পারবে না।
অতি অল্পসময়ে সালমা হুজুরাখানার যাবতীয় খবর দিয়ে ফেলল। তার গল্পের বড় অংশ জুড়েই রইল দৈত্যাকৃতির কাতল মাছ।
সালমা বলল, মাছ মনে হয় না স্বাদ হবে। বেশি বড় মাছ স্বাদ হয় না। তা ছাড়া মানুষের নজর লাগে।
অবন্তি বলল, মাছ স্বাদ হোক বা না-হোক, আমি মাছ খাব না। আমি মাছ খাই না। গন্ধ লাগে।
সালমা বলল, ছছাট হুজুর হাফেজ জাহাঙ্গীরও আপনার মতো মাছ খান না। উনি মাছ খান না অন্য কারণে।
কী কারণে?
আমাদের নবিজি মাছ খেতেন না। এইজন্যে হাফেজ সাহেবও মাছ খান না। তবে আজ মনে হয় খাবেন।
বড় মাছ, এইজন্যে খাবেন?
উনি সবাইরে মাছ খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত দিলে মেহমানদের সঙ্গে খানা খেতে বসতে হয়।
জুলেখা বিবি অবন্তিকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনিও আগের মতোই আছেন। একটা টকটকে লাল রঙের শাড়িতে তাঁকে কোনোরকমে ঢেকে রাখা হয়েছে। তাঁর তিনজন দাসীর একজন পায়ের আঙুল টানছে।
জুলেখা বিবি বললেন, চেহারা দেখাইতে আসছ, না জনের মতো আসছ?
অবন্তি বলল, চেহারা দেখানোর জন্যে এসেছি।
চেহারা দেখলাম। এখন বিদায় হও।
আচ্ছা চলে যাব।
জুলেখা বিবি হঠাৎ গা থেকে শাড়ি ফেলে নগ্ন হয়ে গেলেন। দাসী দু’জন শাড়ি দিয়ে গা ঢাকার জন্যে ব্যস্ত হয়ে গেল। জুলেখা বিবি বললেন, গরমে শইল পুইড়া যাইতেছে। শাড়ি শইল্যে দিবা না। আর যে মেয়ে নিজের স্বামী ছাইড়া অন্যত্র বাস করে সে পশুর সমান। পশুর সামনে কোনো লজ্জা নাই। এখন বুঝেছ?
মেহমানরা সবাই দস্তরখান বিছিয়ে বসেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই খানা দেওয়া হবে। হাফেজ জাহাঙ্গীরের জন্যে অপেক্ষা। তিনি হুজরাখানায় একা বসে আছেন। বিশেষ কোনো নামাজে বসেছেন। বিশেষ নামাজের সময় বাতি নেভানো থাকে। এবং তিনি থাকেন একা। আজ হুজরাখানার বাতি নেভানো। তিনি ছাড়া আর কেউ হুজরাখানায় উপস্থিত নেই।
অতিথিরা যখন খাবারের জন্যে অস্থির তখন হাফেজ জাহাঙ্গীর দর্শন দিলেন। অতিথিদের দিকে তাকিয়ে লজ্জিত গলায় বললেন, আমি বিশেষ শরমিন্দা। যে মাছ খাওয়ার জন্যে আমি আপনাদের দাওয়াত দিয়েছি, সেই মাছ খাওয়াতে পারছি না। কারণ কিছুক্ষণ আগে আমি বাতেনি খবর পেয়েছি যে, মাছ রান্নার সময় মাছে বিষ দেওয়া হয়েছে। ভৈরবের মনা বাবুর্চি এই কাজ করেছে। সে পলাতক আছে। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি মাছের সব সালুন গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলার নির্দেশ দিয়েছি। আপনারা এতক্ষণ অপেক্ষা করেছেন, আর এক ঘণ্টা যদি অপেক্ষা করেন তাহলে খাসি জবেহ করে খাসির সালুন দিয়ে আপনাদের খানা দিব। এখন আপনাদের বিবেচনা।
অতিথিরা কেউ কোনো শব্দ করলেন না।
হাফেজ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে অবন্তির দেখা হলো অনেক রাতে। অতিথিরা খাওয়াদাওয়া শেষ করে চলে যাওয়ার পর। অতিথিরা খাসির সালুনের জন্যে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মাছের অভাবে তাদের তেমন কষ্ট হলো না। কারণ খাসির সালুন অসাধারণ স্বাদ হয়েছিল।
হাফেজ জাহাঙ্গীর বললেন, তোমাকে দেখে অবাক হয়েছি। তুমি একা চলে এসেছ।
অবন্তি বলল, আমি একা তো আসি নাই। আমার সঙ্গে দুইজন চড়নদার ছিল।
জাহাঙ্গীর অবাক হয়ে বললেন, বলো কী? তারা পুরুষ?
অবন্তি হাই তুলতে তুলতে বলল, তারা পুরুষও না, রমণীও না। তাঁরা দুজন ফেরেশতা। সব মানুষের কাঁধে বসে থাকে।
ও আচ্ছা বুঝেছি। কেরামন কাতেবিন। তোমার সাহস দেখে চমকায়েছি। হুজরাখানার দিকে তোমার টান দেখেও ভালো লেগেছে।
অবন্তি বলল, হুজরাখানার প্রতি বা আপনার প্রতি আমার কোনো টান নাই। আমার এখানে চলে আসার একটাই কারণ—দাদাজানকে শিক্ষা দেওয়া। তিনি সারাক্ষণ আমার ওপর নজরদারি করেন, এটা আমার ভালো লাগে না। আমার জন্যে আমিই যথেষ্ট, এটা উনাকে বুঝাতে চাই। এখন কি আপনার কাছে পরিষ্কার হয়েছে আমি কেন খতিবনগরে এসেছি?
