ইতি
ইসাবেলা
পুনশ্চ তোমার গৃহশিক্ষকের আঁকা যে পোট্রেটে তুমি অভিভূত তা আমাকে পাঠাও।
ইসাবেলার চিঠি হাতে অনেক রাত পর্যন্ত সরফরাজ বসে রইলেন। তার ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পর শরীর কেঁপে উঠতে লাগল। বিছানায় শুতে গেলেন শেষরাতের দিকে। আধো ঘুম আধো জাগরণে মনে হলো, বাড়িভর্তি বিড়াল। মিউ মিউ শব্দ করে অস্থির করে তুলছে।
হাফেজ জাহাঙ্গীর
হাফেজ জাহাঙ্গীর ফজরের নামাজ শেষ করে দিঘির ঘাটে বসে আছেন। তার হাতে নীল রঙের ঘুটির তসবি। তিনি একমনে তসবি টানছেন। তার বসার জন্যে উলের আসন দেওয়া হয়েছে। তিনি যেখানে বসেছেন তার এক ধাপ নিচে আগরদানে আগরবাতি জ্বলছে। হাফেজ জাহাঙ্গীর আগরবাতির গন্ধ কখনো পছন্দ করেন না। তার নাক জ্বালা করে। তারপরেও তাকে বাস করতে হয় আগরবাতি চারপাশে নিয়ে।
আজ ভালো কুয়াশা হয়েছে। কুয়াশার কারণে সূর্য দেখা যাচ্ছে না। ভাদ্র মাসের ভোরে আবহাওয়া এমনিতেই কিছুটা শীতল থাকে। কুয়াশার কারণে আজ অন্যদিনের চেয়েও আবহাওয়া শীতল। হাফেজ জাহাঙ্গীরের শীত লাগছে। গায়ে একটা সুজনি দিতে পারলে হতো। সমস্যা হচ্ছে সুজনি আনার কথাটা কাউকে বলতে ইচ্ছা করছে না।
হাফেজ জাহাঙ্গীরের সার্বক্ষণিক সঙ্গী নুরু তার পাশেই আছে। মাথা নিচু করে খেলাল দিয়ে দাঁত খোচাচ্ছে। তাকে বললেই সে আগরদান নিয়ে যাবে, সুজনি এনে গায়ে জড়িয়ে দেবে। এক বাটি খেজুর গুড়ের চা এনে সামনে রাখবে। হাফেজ জাহাঙ্গীর ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। এই মুহূর্তে তার কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না।
নুরু বলল, ছছাট হুজুর, খবর পাইছেন আইজ পুসকুনিত জাল ফেলব?
জাহাঙ্গীর হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। আজ দিঘিতে জাল ফেলা হবে, এই খবর তিনি পেয়েছেন। মাছ ধরা দেখার জন্যেই তিনি ফজরের ওয়াক্ত থেকে দিঘির ঘাটে বসে আছেন।
নুরু উৎসাহের সঙ্গে বলল, আমার মন বলতাছে আইজ গুতুম ধরা পড়ব।
জাহাঙ্গীর বললেন, সবই আল্লাহর হুকুম। উনার হুকুম হইলে ধরা পড়ব। উনার হুকুম বিনা কিছু হবে না।
‘গুতুম’ হলো এই দিঘির সবচেয়ে বড় মাছের আদরের নাম। এই মাছের সাড়াশব্দ অনেকবার পাওয়া গেছে, এখনো কেউ তাকে দেখে নি। সবার ধারণা, গুতুম গজার মাছ। একমাত্র গজার মাছই দৈত্যাকৃতির হয়।
নুরু বলল, চা খাবেন? চা এনে দিব?
জাহাঙ্গীর বললেন, না। বলেই খুব অবাক হলেন। তাঁর চা খেতে ইচ্ছা করছে অথচ তিনি বলেছেন, না। এর মানে কী?
নুরু বলল, উরস-বিষয়ে আপনার হুকুম কী জানলে সেইমতো ব্যবস্থা নিতাম।
জাহাঙ্গীর হাতের তসবি নামিয়ে রেখে বললেন, কোনো হুকুম নাই।
বড় খানা কয়বার হবে?
একবারই হবে। আসরের নামাজের পরে বড় খানা।
গরু কয়টা জবেহ হবে?
উরস উপলক্ষে যে কয়টা এসেছে সবই জবেহ হবে।
চৌদ্দটা গরু এখন পর্যন্ত আছে, আরও আসবে ইনশাল্লাহ। সব একদিনে জবেহ করলে বিরাট বিপদ হবে।
কী বিপদ?
একসঙ্গে এত রান্না করা যাবে না।
জাহাঙ্গীর বললেন, উরস নিয়া তোমার সঙ্গে আলাপের কিছু নাই। আল্লাহপাক একেকজনকে একেক দায়িত্ব দিয়া পৃথিবীতে পাঠান। তোমাকে ফুটফরমাসের দায়িত্ব দিয়ে পাঠায়েছেন। বুঝেছ?
জি।
ফজরের নামাজে তোমাকে সামিল হতে দেখি নাই। এর কারণ কী?
ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছিল। কাজা পড়েছি।
জাহাঙ্গীর বললেন, গত রাতে এশার নামাজেও তুমি শামিল হও নাই। কে কী করে বা করে না তা আমি জানি। এখন আমার সামনে থেকে বিদায় হও। আজ সারা দিন যেন তোমার চেহারা না দেখি।
নুরু মুখ শুকনা করে উঠে গেল।
জাল ফেলা হলো সকাল ন’টায়। হুলস্থুল ব্যাপার। সবাই এসে দিঘির ঘাটে ভিড় করেছে। জাহাঙ্গীর দেখলেন নিষেধ অমান্য করে নুরুও ঘাটে এসেছে। প্রতি তিন মাসে একবার জাল বাওয়া হয়। জাল বাওয়ার দৃশ্য সে কারণেই আনন্দময়। বাড়তি আকর্ষণ ‘শুতুম’। গত এক বছর ধরে গুতুম ধরা পড়বে এমন অপেক্ষা।
জাল টানা শেষ হলো বারোটার দিকে। জাল এখনো পানির নিচে। প্রধান জেলে এসে হাফেজ জাহাঙ্গীরকে ফিসফিস করে বলল, গুতুম আটক হয়েছে।
হাফেজ জাহাঙ্গীর বললেন, গুতুম ধরা পড়েছে এ তো ভালো সংবাদ। কানাকানি করছ কেন? মাছ তোলো, দেখি কী সমাচার।
মাছ ধরার সময় মহিলা মাদ্রাসার কেউ বা জেনানামহলের কেউ থাকে না। আজ সবাই ছুটে এসেছে। কঠিন পর্দার কথা মনে হয় সাময়িকভাবে ভুলে গেছে। কিছু কিছু অনিয়ম উপেক্ষা করতে হয়। হাফেজ জাহাঙ্গীর তা-ই করছেন।
গুতুমকে ডাঙায় তোলা হয়েছে। বিস্ময়কর এক দৃশ্য! দানবাকৃতির এক কাতল মাছ। কাতল মাছের মাথা শরীরের তুলনায় বড় হয়। এর মাথা ছোট। ঘাড়ের কাছের খানিকটা অংশ সোনালি। হাফেজ জাহাঙ্গীর পর পর তিনবার বললেন, সোবাহানআল্লাহ! আল্লাহপাকের তরফ থেকে এমন চমৎকার নিয়ামত পাঠানোর জন্যে দুই রাকাত নফল নামাজ পাঠ করা হলো।
হাফেজ জাহাঙ্গীরের নির্দেশে মাছ ওজন করে হুজরাখানার গেটে দুই ঘণ্টার জন্যে রাখা হলো। অনেকেই এই মাছ দেখতে চাইবে। তারা দেখবে।
মাছের ওজন মাপা হয়েছে। এক মণ তিন সের। এই মাছ বিষয়ে সাপ্তাহিক ময়মনসিংহ বার্তায় ছবিসহ খবর প্রকাশিত হয়।
খতিবনগর হুজরাখানায়
অদ্ভুত কাতল
(বিশেষ সংবাদদাতা প্রেরিত)
খতিবনগর হুজরাখানায় এক মণ তিন সের ওজনের এক দৈত্যাকৃতি কাতল মাছ ধরা পড়েছে। এমন বৃহৎ কাতল স্মরণাতীতকালে কেউ দেখেছে এমন নজির নাই। খতিবনগরের আশি বয়স বর্ষীয়ান বৃদ্ধ হেকমত আলি বলেন তার কৈশোরে তিনি হাওর থেকে ধৃত এমন কাতল দেখেছেন। হুজরাখানায় ধৃত কাতলের মতো সেই কাতলেরও নাকি গলা ছিল হরিদ্রা বর্ণের এবং মাথা ছিল শরীরের তুলনায় অপুষ্ট।
