ভদ্রলোক অনবরত কথা বলতে লাগলেন। নিজেই প্রশ্ন করছেন নিজেই জবাব দিচ্ছেন। আবার প্রশ্ন করছেন আবার জবাব দিচ্ছেন। অত্যন্ত বিরক্তিকর অবস্থা। আইনুদ্দিন কী মনে করে তাকে নিয়ে এসেছে কে জানে। ভদ্রলোকের সঙ্গে ডাক্তারি ব্যাগ। প্রেসার মাপার যন্ত্র। কাজেই দেখা সাক্ষাতের জন্য আসেননি চিকিৎসার জন্যই এসেছেন।
ভাই এখন বলেন, আপনার কী অসুবিধা?
আমার কোনো অসুবিধা নেই।
সে কী আইনুদ্দিন যে বলল.
ও ঠিক বলেনি।
ঘুম হচ্ছে না নাকি। সারারাত হাঁটাহাঁটি, করেন?
আমি এমনিতেই রাত জাগি।
তা তো জাগতেই হয়। লেখক মানুষ। আপনারা নাক ডাকিয়ে ঘুমুলে চলে না কী?
ওসমান সাহেব ঠাণ্ডা, গলায় বললেন, আপনি অন্য একদিন আসুন। আজ আমি একটু ব্যস্ত।
ডাক্তার অবাক হয়ে বললেন, প্রেসার মাপবেন না?
জি না।
টেবিলের উপর হারিকেন জ্বলছে। সুন্দর করে সাজানো টেবিল। কাগজ, কলম, পিরিচে ঢাকা পানির গ্লাস। ওসমান সাহেব লক্ষ্য করলেন দু’টি পেনসিলও রাখা আছে। পেনসিল দু’টি কাল ছিল না। আজই আনা হয়েছে এবং আইনুদিনের স্ত্রী এক ফাঁকে রেখে গেছে। তার মনে হল এই টেবিলে কোথাও যেন মিলির ছোঁয়া আছে। ওসমান সাহেব বুঝতে পারলেন না হঠাৎ করে মিলির কথা কেন মনে হল। এ রকম মনে হবার কারণ কী পেনসিল দু’টি? মিলিও লেখার টেবিল গোছাবার সময় কলমের পাশাপাশি দু’টি পেনসিল রাখত। পেনসিল তিনি ব্যবহার করেন না। মিলিকে বলেছেন অনেকবার। লিখতে বসে প্রতিবারই তিনি পেনসিল দু’টি ড্রয়ারে রাখতেন। এবং প্রতিবারই মিলি তা বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখত। মজার ব্যাপার হচ্ছে মিলির আগ্রহ এই টেবিলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কী লেখা হল না হল তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বিয়ের পরও রোজ রানুকে টেলিফোন।
হ্যাঁলো ভাবী, ভাইয়ার টেবিল গোছানো হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে।
টেবিল ক্লথ বদলে দিয়েছ তো? রোজ নতুন টেবিল ক্লথ না দিলে সে লিখতে পারে না। সাতটা টেবিল ক্লথ আছে তার জন্যে। কোণায় শনি, রবি লিখে দিয়েছি।
আমি জানি তুমি আমাকে বলেছ অনেকবার।
ভাবী দেখ তো আজ কী সোমবার লেখা টেবিল ক্লথ আছে কিনা। না থাকলে ভাইয়া কিন্তু লিখতে পারবে না।
শোন মিলি, লেখাটা তৈরি হয় মাথায়। টেবিল ক্লথের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
তুমি কাইন্ডলি একটু দেখে আস না ভাবী এক মিনিটের ব্যাপার।
ঠিক আছে যাচ্ছি।
আরেকটা কথা ভাবী, উপন্যাসটা শুরু করেছিল সেটা ক’ পৃষ্ঠা লিখেছে সেটাও আমাকে বলবে।
ঠিক আছে বলব। এখন টেলিফোন নামিয়ে রাখি?
না ভাবী এখনই রাখবে না। আরেকটু কথা বলি।
ওসমান সাহেব টেবিলের সামনে বসলেন। হারিকেনের আলো কমিয়ে দিলেন। এক চুমুক পানি খেলেন।
গ্রাসের নিচে রাখা রানুর চিঠিটি আবার পড়লেন। পাঁচ-ছলাইনে লিখেছে মিলিকে রাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাজটা ভাল হয়নি। সম্ভব হলে তুমি ওকে দেশে নিয়ে আসার চেষ্টা কর।
কী চেষ্টা তিনি করবেন? কার কাছে যাবেন। এবং ওরাই বা তার কথা কেন শুনবে।
বাতাসী এসে দাঁড়িয়েছে পর্দা ধরে। সে ভেতরে ঢোকে না। এ ঘরে ঢোকা বোধ হয় নিষেধ আছে। ওসমান সাহেব বললেন,
কী খবর বাতাসী?
বাতাসী হাসি মুখে বলল,
ইরল বিরল চিরল পাতা
হাত্তীর মাথাত কলাপাতা।
বলেই সে ছুটে নেমে গেল নিচে। মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গি-ছুটে পালাবার ভঙ্গির মাঝে কী মিলির কোন ছাপ আছে? সে কী ছেলেবেলায় এ রকম ছড়া বলত? কিছুই মনে পড়ছে না। কোন প্রিয়জন হঠাৎ করে অনেক দূরে চলে গেলে তার কথা বারবার মনে পড়ে। পুরনো সব স্মৃতি ভেসে ওঠে কথাটা কী ঠিক? বোধ হয় না। অনেক চেষ্টা করেও তিনি মিলি প্রসঙ্গে পুরোনো কিছু মনে করতে পারলেন না।
ওসমান সাহেব কাগজের ওপর ঝুকে পড়লেন এবং অত্যন্ত দ্রুত লিখতে শুরু করলেন,
কল্যাণীয়াষু, মিলি, আজ আমাদের গ্রামের বাড়িতে অদ্ভুত একটা কাণ্ড হয়েছে। প্রচণ্ড জোছনা হয়েছে। অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ জেগে দেখি ঘরে আলোর বন্যা। বন্যার জলের মতই থৈ থৈ করছে জোছনা। একবার ভাবলাম দুটো চাঁদ উঠল নাকি আকাশে। বারান্দায় গিয়ে দেখি আইনুদ্দিন তার স্ত্রীকে নিয়ে দড়ি পাকাচ্ছে। তাদের ছোট্ট মেয়েটি কঞ্চি হাতে ছোটাছুটি করছে। কী অপূর্ব একটি ছবি, এ ছবি এ ভুবনের নয় অন্য কোনো ভুবনের। আনন্দে আমার চোখ ভিজে উঠল।
মিলি, সমগ্র জীবনে আমি এমন একজন মানুষ হতে চেয়েছিলাম, যার ভেতর কোন রকম ক্ষুদ্রতা থাকবে না। যে এ পৃথিবীর সুন্দর যা কিছু আছে তাকে স্পর্শ করবে…
বাতাসী আবার এসে দাঁড়িয়েছে। আবার কী একটা ছড়া বলল। ওসমান সাহেব তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আবার লিখতে শুরু করলেন। বাতাসী তাকিয়ে আছে। সে ভেতরে এসে ঢুকাল। এই অদ্ভুত মানুষটিকে তার বড় ভাল লাগে। আজ কেন জানি অন্য দিনের চেয়েও ভাল লাগছে।
রানুর ইনসমনিয়ার মত হচ্ছে
ইদানীং রানুর ইনসমনিয়ার মত হচ্ছে।
গত রাত্রে তিনটা পর্যন্ত জেগে ছিল। আজও ঘুম আসছে না। মাথার দু পাশে দীপ দপ করছে। একটু আগেই এক গ্লাস পানি খেয়েছে কিন্তু এখন আবার তৃষ্ণা হচ্ছে। রানু মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।
অপলা পড়ছে। এত পড়ার কোনো মানে হয়? তার পড়ার ধরনও অদ্ভুত। কোলের কাছে বই নিয়ে হেঁটে হেঁটে পড়া। এরকম না করলে তার নাকি কিছু মনে থাকে না। রানু বারান্দায় যাবার জন্যে দরজা খুলতেই অপলা চেঁচিয়ে উঠল, কে কে? রানু জবাব দিল না। বারান্দায় এসে দাঁড়াল। চারদিক অন্ধকার। কোনো সারাশব্দ নেই। যাদের ঘুমিয়ে পড়ার তারা ঘুমিয়ে পড়েছে।
