আইনুদিনের ধারণা ছোট সাহেবের মাথায় ছিট আছে। তার স্ত্রী তাকে ঠিক সমর্থন করেনি। কিন্তু গত রাতে তার মনেও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ আইনুদ্দিনকে ডেকে ওসমান সাহেব বলেছেন, একটা কাল রঙের কুকুরের বাচ্চ জোগাড় করে দিতে পারো? আইনুদ্দিন অবাক হয়ে তাকিয়েছে। তিনি বলেছেন, আমি একটি কুকুর পুষতে চাই। তবে কাল রঙে হতে হবে।
ক্যান?
কিং-কংয়ের রঙ ছিল কাল।
আইনুদ্দিন এবার বলতে চাইল. কিং-কং কে? সে বলল না। কুকুর-ছানা খুঁজে আনল একটি। তাকে দেখা মাত্র ওসমান সাহেব রেগে গেলেন।
এক্ষুণি একে ফেলে দিয়ে এসো।
আইনুদ্দিন ফেলে দিয়ে এল। সে রাতে ওসমান সাহেব কিছু খেলেন না। অনবরত বারান্দায় পায়চারি করলেন। আইনুদ্দিন ও তার স্ত্রী দূর থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তিনি অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। খিলখিল হাসির শব্দে ঘুম ভাঙিল। বাতাসী হাসছে। তার মানে রাত হয়নি। রাত বেশি হলে বাতাসী জেগে থাকত না। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে অনেক রাত; আইনুদ্দিন ঘরে কোনো আলো দিয়ে যায়নি। অবশ্যি তার দরকার ও নেই। ঘরে প্রচুর আলো। আকাশ ভেঙে জোছনা নেমেছে। কিংবা কে জানে আজ হয়ত হঠাৎ কোনো কারণে দু’টি চাঁদ উঠেছে।
ওসমান সাহেব উঠে বসলেন। বিছানার এক অংশ, পড়ার টেবিল এবং আলনায় চাঁদের আলো এসে পড়েছে। সে আলো নদীর জলের মত কাঁপিছে। এ রকম মনে হচ্ছে কেন? চোখের ভুল নাকি? তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বিস্তীর্ণ মাঠে সত্যি সত্যি জোছনার ঢেউ। মাঝে মাঝেই ফুলেফোঁপে উঠছে। তার কেমন যেন ভয় করতে লাগল। তিনি কাঁপা গলায় ডাকলেন, আইনুদ্দিন, আইনুদ্দিন।
আইনুদ্দিন তার ডাক শুনতে পেল না। সে উঠোনে বসে চাদের আলোয় দড়ি পাকাচ্ছে। লম্বা ঘোমটা দিয়ে তার বেী বসে আছে তার পাশে। বাতাসী একটি কঞ্চি হাতে নিয়ে উঠোনের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ছুটে ছুটে যাচ্ছে এবং অনবরত হাসছে। চমৎকার একটি ছবি। এত চমৎকার যে মনে হয়।এ রকম কিছু সত্যি সত্যি ঘটছে না। এ ছবিটি বিশুদ্ধ কল্পনা। ওসমান সাহেব দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন মাঠে আবার তাঁর ভয় ভয় করতে লাগল। তিনি আবার ডাকলেন, আইনুদ্দিন, আইনুদ্দিন। আইনুদ্দিন দড়ি ফেলে উঠে এল। তার বৌ মাথার ঘোমটা অনেকখানি টেনে দিল। বাতাসী হাতের কঞ্চি ফেলে তার দিকে হাত নাড়তে নাড়তে বিজ বিজ করে কী সব বলতে লাগল। কোনো গ্রাম্য ছড়া বোধ হয়। এই মেয়েটি প্রচুর ছড়া জানে। এক মুহূর্তের জন্যে না থেমেও সে অনবরত নতুন ছড়া বলতে পারে। তার মার কাছে থেকেই শিখেছে নিশ্চয়ই কারণ বাতাসীকে তিনি কখনো বাড়ির বাইরে যেতে দেখেননি। আইনুদ্দিন হাতে একটি হারিকেন নিয়ে বারান্দায় উঁকি দিল। নিচু গলায় বলল, ভাই জানের শইলটা এখন কেমুন?
শরীর ভালই। কটা বাজে আইনুদ্দিন?
আইনুদ্দিন বিব্রত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। এ বাড়িতে কোনো ঘড়ি নেই। আইনুদ্দিন কার কাছ থেকে ঘড়ি একটা নিয়ে এসেছিল। তিনি ফেরত পাঠিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছিল, বন্ধনহীন অবস্থায় সময়কে দেখতে ভালই লাগবে। গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে জানা যাবে না। কটা বাজে, রাত কাটতে কত দেরি। সময়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই সময় জানতে ইচ্ছা হচ্ছে।
আইনুদ্দিন।
জি।
কটা বাজে জেনে আসতে পারবে?
পারমু।
যাও জেনে আস।
চা খাইবেন ভাইজান?
না। চা-টা কিছু খাব না। আইনুদ্দিন আজ কী পূর্ণিমা?
জে না। কাইল। কাইল লক্ষ্মীপূজা।
ওসমান সাহেব খানিক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মাঠের উপর চাদের আলো এমন উঠানামা করছে কেন? দেখতে পাচ্ছি। আইনুদ্দিন? আইনুদ্দিন অবাক হয়ে তাকাল মাঠের দিকে। সে তেমন কিছু দেখতে পেল না।
দেখতে পাচ্ছে না? বাতাসে ঘাস কঁপতাছে হেই জনো এমুন মনে হয়। ভাইজান, আপনে ভিতরে গিয়া বসেন। কেন?
আপনের শইলডা ভাল না।
আজি কী বার?
বুধবার।
তিনি ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। বুধবার টগরকে দেখতে যাবার দিন। অনেক দিন তাকে দেখতে যাওয়া হয় না। টগর প্রতি বুধবার তার জন্য অপেক্ষা করে? কিছু দিন করবে তারপর আর করবে না। কোনো একটি বিশেষ কিছুর জন্যে মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে পারে না। মানুষ প্রতিবারই নতুন কিছুর জন্যে প্রতীক্ষা করতে ভালবাসে।
ভাইজান।
বল।
ডাক্তার সাবরে খবর দেই?
কেন?
আপনার শইলড়া ভাল না।
আমার শরীর ভালই আছে। আর শোন, ঘড়ি আনার দরকার নেই।
রাইতে কী খাইবেন?
কিছুই খাব না। হারিকেন রেখে তুমি নিচে চলে যাও।
আইনুদ্দিন চিন্তিত মুখে নেমে গেল। ওসমান সাহেব নিশ্চিত সে উঠোনে বসা তার স্ত্রীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গুজ গুজ করে কথা বলবে, তারপর রওনা হবে ডাক্তারের কাছে। সময় জেনে আসবে, এবং খুব সম্ভবত ডাক্তারকেও সঙ্গে নিয়ে আসবে। ডাক্তার ভদ্রলোক এসে আর উঠতে চাইবেন না। অনবরত কথা বলবেন। এখানে তার কথা বলার মত লোক নেই হয়ত।
গতকাল ভদ্রলোক প্রথম এসেছিলেন। বুড়ো ধরনের একজন মানুষ। এই গরমেও সু্যট পরা। সুটটি পুরনো এবং ময়লা কিন্তু গলায় টাইটি ঝক ঝক করছে। সম্ভবত আজই ট্রাংক খুলে বের করা হয়েছে।
আপনি যে এখানে আছেন জানতামই না। আইনুদিনের কাছে শুনে অবাকই হলাম। আমার স্ত্রীকে বললাম সেও আসতে চাচিছিল। আমার ছেলে মেয়েরা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসত। ওরা আবার খুব সাহিত্য পাগল; একজন কবিতা লিখে ছদ্মনামে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখা বের হয়। আপনার চোখে পড়েছে বোধ হয়, সানজা করিম। একটা কবিতার বই বের করতে চায়। বহু খরচান্ত ব্যাপার। কী বলেন? এদিকে আবার বই না হলে কবি বলে কেউ স্বীকার করতে চায় না। ভাল লিখছে না খারাপ লিখছে এটা কেউ দেখতে চায় না। দেখতে চায় বই কটা আছে। কোয়ালিটি নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই, সবাই চায় কোয়ান্টিটি। ঠিক বলছি কি না বলেন?
