রানু আপা?
হুঁ।
আজ ঘুম আসছে না?
না।
ঠাণ্ডা পানিতে মাথা ধুয়ে এক গ্লাস গরম দুধ খেয়ে শুয়ে থাক। চিৎ হয়ে শুবে এবং বড় বড় নিঃশ্বাস নেবে, যাতে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণটা বেশি থাকে।
রানু জবাব দিল না। অপলা কী আজকাল বেশি কথা বলছে? বোধ হয় বলছে। এত কথা আগে বলত না।
আপা।
বল।
আনব দুধ গরম করে? তুমি খেলে আমিও খাব। আমারও ঘুমের ট্রাবল হচ্ছে। অবশ্যি আমার ঘুম হচ্ছে না পরীক্ষার টেনশনে।
অপলা বারান্দায় চলে এল। তার হাতে ডিকশনারি সাইজের একটা বই। অপলা হাসতে হাসতে বলল, আজকাল যেসব স্বপ্ন দেখছি সেগুলিও পরীক্ষা সংক্রান্ত। যেমন গতকাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম আমাদের এনাটমির কোশ্চেন আউট হয়ে গেছে। সবাই সে কোশ্চেন পেয়েছে। বহু ছোটাছুটি করে আমিও কোশ্চেন জোগাড় করলাম। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি এনাটমির বদলে সেদিন হচ্ছে বাংলা পরীক্ষা। কঠিন সব ব্যাকরণের প্রশ্ন হল, উপপদ তৎপুরুষ সমাস কাহাকে বলে? বলতে বলতে আপলা হাসতে শুরু করল। রানু লক্ষ্য করল, হাসির দমকে ডিকশনারির মত মোটা বইটি মেঝেতে ছিটকে পড়েছে। অপলার সেদিকে লক্ষ্য ও নেই।
অপলা!
বল।
রাত দুপুরে এরকম চেঁচিয়ে হাসা ঠিক না। সরি আপা।
দুধ আনিব তোমার জন্যে?
তুই বোস। তোর সঙ্গে কথা আছে।
অপলা বারান্দার মেঝেতেই শিশুদের মত পা ছড়িয়ে বসল অথচ রানুর পাশেই একটা খালি চেয়ার আছে। রানু দেখল অপলা শাড়ির আঁচল মুখে গুজে হাসির বেগ সামলাবার চেষ্টা করছে।
অপলা, গত কয়েক দিন ধরে একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করছি। অকারণেই তুই খুব হাসছিস। বেশ কথা বলছিস।
পরীক্ষার টেনশনে এরকম হচ্ছে আপা। মেডিক্যাল টার্মে একে বলে…
মেডিক্যাল টার্মে যাই বলুক, আমার মনে হয় আমি কারণটা জানি। ভালই জানি।
জানলে বল। অবশ্যি যদি বলতে চাও।
তোর মত বয়েসী মেয়েরা যখন নিষিদ্ধ কিছু করে, তখন এরকম আচরণ করে। হঠাৎ খুব প্রগলভ হয়ে যায়। নিজেকে আড়াল করে রাখবার জন্যে কৃত্রিম কিছু আচরণ করে। যেমন তুই করছিস।
অপলা গম্ভীর হয়ে বলল, নিষিদ্ধ কাজটা কী করলাম সেটাও বল শুনি। পরীক্ষা হয়ে যাক তুমি কত বড় ডিটেকটিভ।
সেটা আমি জানি না। তবে অনুমান করতে পারি। আমার ধারণা তুই তোর দুলাভাইকে খুব একটা আবেগের চিঠি লিখেছিস। চিঠিটা পোস্ট ক্লাববার পর তোর মনে হয়েছে কাজটা ঠিক হয। নি, খুব অন্যায় হয়েছে। অপলা তীক্ষা গলায় বলল, তুমি কী আমার চিঠি পড়েছে?
না পড়িনি। লুকিয়ে অন্যের চিঠি পড়বার অভ্যেস আমার নেই।
না পড়লে চিঠির কথা তুমি জানতে পারতে না। এত বড় ডিটেকটিভ তুমি এখনো হওনি।
অনুমান করে বলেছি। অনুমানটা ঠিক হয়েছে। সব অনুমান তো সব সময। ঠিক হয় না। অনেকবার ভুলও করেছি।
সারা জীবনই তুমি ভুল করেছ। কেউ কেউ ভুল করবার জন্যে জন্মায়।
অপলা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। রানু কিছু বলবার আগেই ছুটে চলে গেলে ভেতরে। রানু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল, কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে? প্রেমের চিঠি না তো?
অনেক দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বর্ষা এসে গেল বোধ হয়। রানু, ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। শীত শীত করছে। বেশ বাতাস বারান্দায়। ভেতর থেকে একটা চাদর নিয়ে আসবে নাকি? আলসী লাগছে। একবার ভেতরে গেলে আর বারান্দায় আসা হবে না।
অপলা আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। কেঁদে-টেদে এসেছে বোধ হয়। কিংবা এক্ষুণি হয়ত কাঁদবে। রানু তাকিয়ে রইল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। রাত কত হয়েছে কে জানে। নিশ্চয়ই অনেক রাত।
রানু আপা।
বল।
অপলা থেমে থেমে বলল, আমি তাকে আবেগের চিঠি লিখলেও তো তোমার কিছু যায় আসে না।
তা ঠিক কিছুই যায় আসে না।
কোনো মেয়ে তাকে কী লিখছে, না লিখছে তাতে তোমার কী?
বললাম তো একবার আমার কিছুই না।
এটা তুমি মুখে বলছি, কিন্তু মনে তো স্বীকার কর না। যদি স্বীকার করতে তা হলে আমার সামান্য চিঠি লেখা নিয়ে এতগুলি কথা বলতে না।
রানু হেসে ফেলল। কেমন পাগলের মত কথা বলছে অপলা। হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলা। যেন ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছে। রানু শান্ত স্বরে বলল, আমি তোকে তেমন কিছুই বলিনি। তোর যদি ইচ্ছে হয় রোজ তাকে দুটো করে চিঠি লিখিস।
হ্যাঁ আমি লিখব।
বেশ তা লিখবি। ঢাকায় এলে হাত ধরাধরি করে বলধা গার্ডেনে যাবি। আমি কিছুই বলব না।
অপলা কাঁদতে শুরু করল। ব্যাপারটা ঘটল হঠাৎ। অপলা যে কেঁদে ফেলতে পারে এটা সে ভাবেনি। রানু এগিয়ে এসে তার হাত রাখল অপলার পিঠে। শান্ত গলায় বলল, আবেগ খুব মূল্যবান জিনিস এই কথাটা খেয়াল রাখবি। তোর দুলাভাইয়ের মধ্যে অন্য কিছু আছে কিনা আমি জানি না। কিন্তু আবেগ যে নেই এটা আমি বলতে পারি। দীর্ঘদিন তার পাশে থেকে আমাকে শিখতে হয়েছে। চল ভেতরে চল। ঠাণ্ডা লাগছে।
তুমি যাও।
দরজা দিয়ে শুযে পড়ব। আয়। আর শোন, কাঁদছিস কেন?
আমি কাঁদলে তোমার কী অসুবিধা?
আমার কোনোই অসুবিধা নেই। যত ইচ্ছা কাদ। তবে কথায্য কথায্য কান্না একমাত্র শরৎচন্দ্রের নায়িকাদেরই মানায়, তোকে মানায না।
তারা ঘুমুতে গোল রাত দুটোর দিকে। বানু দেখল, টগাব তব খাটে নেই। এক ফাকে উঠে চলে গেছে অপলার ঘরে। টগর কী তাকে পছন্দ করে না? কেন কবে না? টগবেব পরিস্থিতি অন্য কোনো ছেলেব হলে সে তার মাকেই আঁকড়ে ধরত। সেটাই স্বাভাবিক। রানু অপলার ঘরে উঁকি দিল। টগর অপলার গলা দুহাতে জড়িয়ে ধরে আছে। দৃশ্যটি সুন্দব। কিন্তু মন খারাপ করে দেবার মত।
