ওসমান সাহেব থমকে গিয়েছিলেন। কারণ ঐ বউটির সত্যি সিত্য মায়া কাড়া চেহারা ছিল রানুর কথা উড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। আজ যে আইনুদিনের ঘর সংসার তার ভাল লাগছে এর পেছনেও কী ফ্রয়েডিয়া কিছু কাজ করছে? সম্ভবত নয়। আইনুদিনের স্ত্রীকে তিনি দেখেননি। সে কাজ করছে নতুন বেঁয়ের মত লম্বা একা ঘোমটা টেনে। তবে অনুমান করা যাচ্ছে বৌটি দেখতে ভাল, কারণ বাতাসী মেয়েটি সুন্দর দেখতে। মার মত হয়েছে নিশ্চয়ই।
তিনি সিগারেট ধরিয়ে বাতাসীকে লক্ষ্য করতে লাগলেন। মেয়েটি এখন নিজের মনে কথা বলছে। ছড়া টড়া কিংবা গ্ৰাম্য কোনো বিয়ের গান। কারণ তার মাথা দুলছে। ছন্দের কোনো ব্যাপার ছাড়া মাথা দুলবে না। কাছে দাঁড়িয়ে শুনতে পারলে হত। কিন্তু কাছে যাওয়া মাত্র এই মেয়ে চুপ করে যাবে। তাছাড়া মেয়েটির ব্যক্তিগত সংলাপে হঠাৎ উপস্থিত হওয়া কী ঠিক?
ওসমান সাহেব অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলেন। মেয়েটি মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গানের মত क्राच्नेछ।
ভাত খাইছে ধান খাইছে
কলাই খাইছে কে?
গানের কলি এই একটিই। ঘুরে ফিরে তাই সে গাইছে। সুরও সম্ভবত তার নিজের। ওসমান সাহেব এক ধরনের বিষন্নতা অনুভব করলেন। যে গান একা একা গাওয়া হয়, সেই গান নৈসঙ্গের গান। তার সুর নিসঙ্গতা এনে দেবেই।
মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু গান বন্ধ করল না। সম্ভবত সে বুঝতে পারছে শহর থেকে আসা এই মানুষটি তার গান পছন্দ করছে। শিশুরা অনেক কিছু বুঝতে পারে।
মিলির চিঠি এসছে
মিলির চিঠি এসছে।
দু’টি চিঠি। দু’টি চিঠিতে একই কথা লেখা। একই বক্তব্য। একটি শব্দও এদিক ওদিক নয়। দু’টি চিঠি পাঠানোর কারণ ওসমান সাহেব ধরতে পারলেন। একটি হারিয়ে গেলেও অন্যটি যাতে পৌঁছে সেই ব্যবস্থা। অদ্ভুত সব চিন্তা মিলির মাথাতেই খেলে।
চিঠির ভাষা গুরু গম্ভীর। এবং আপনি আপনি করে লেখা। যেন পরীক্ষার খাতায় চিঠি লেখা হচ্ছে। একটু এদিক ওদিক হলে নম্বর কাটা যাবে।
শ্রদ্ধেয় ভাইয়া, আমার সালাম জানবেন। আপনি বিগত এক সপ্তাহ যাবত বাইরে আছেন। আমরা সবাই অত্যন্ত চিন্তগ্রস্ত। এদিকে কয়েকদিন আগে আমি একটি পত্রিকায় পড়লাম। এই মাস বৃশ্চিক রাশির জাতকের জন্যে খুব খারাপ মাস। আমি পত্রিকার লেখাটি আপনার জন্যে লিখে দিচ্ছি।
বৃশ্চিক রাশির জাতকের ওপর শনি এ মাসে পূর্ণ প্রভাব ফেলবে। দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্যহানী, আত্মীয় বিয়োগ প্রভৃতি ঘটার সম্ভাবনা। নতুন বন্ধু তৈরিতে বিরত থাকুন। নিতান্ত প্রয়ােজন না হলে ভ্রমণে না যাওয়াই ভাল।
ভাইয়া। আপনি তো এসব বিশ্বাস করেন না। কিন্তু এগুলি সত্যি। প্রথম প্রথম আমিও বিশ্বাস করতাম না। একদিন পত্রিকায় দেখলাম ধনু রাশির জন্যে আজকের দিনটি অশুভ। দুর্ঘটনা যোগ আছে।
তবু আমি গেলাম। পরে কী হল তা তো আপনি জানেন। রিকশা একসিডেন্ট করে পা ভেঙে এক মাস হাসপাতালে।
যাই হোক চিঠি পাওয়া মাত্র আপনি চলে আসবেন। টগর, আপনার জন্যে খুব কান্নাকাটি করছে। সেদিন গিয়েছিলাম ভাবীর কাছে নিউ পল্টন লাইনে। আপনার কথা উঠতেই টগর এমন কাঁদতে লাগল যে আমি নিজেও কাদলাম। তাছাড়া টগরের শরীরও খুব খারাপ। কয়েকদিন ধরে একশ তিন জ্বর চলছে। ডাক্তাররা আশংকা করছে হয়তবা টাইফয়েড।
পুনশ্চ দিয়ে লেখা, ভাইয়া, ও আমাকে একটুও ঘর থেকে বের হতে দেয় না। গেটে তালা বন্ধ করে রাখে।
ও ভাল কথা, আমি ইন্ডিয়া যাচ্ছি চিকিৎসার জন্যে। আপনার জন্যে কিছু আনতে হলে জানাবেন। ওসমান সাহেব চিঠিটি বেশ কয়েকবার পড়লেন। মিলি, তার স্বভাবমত মিথ্যায় চিঠি ভরিয়ে দিয়েছে। পা ভাঙার কোনো ব্যাপার তার জীবনে ঘটেনি।
টগর, তার জন্যে কাঁদছিল এটা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। টগরের মধ্যে এ জাতীয় আবেগ নেই। থাকলেও তা গোপনে, অন্য কেউ তাঁর খোঁজ জানবে না। আর জুরের ব্যাপারটি তো শেষ মুহূর্তে বানানো হয়েছে। গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য লেখা হয়েছে–ডাক্তাররা আশঙ্কা করছে হয়তবা টাইফয়েড। ডাক্তাররা অর্থাৎ একজন ডাক্তার নয়। কয়েকজন ডাক্তার। খবরগুলি যে মিথ্যা তার সবচে বড় প্রমাণ হচ্ছে রানুরা এখন নিউ পল্টন লাইনে থাকে না।
তিনি নিজের মনেই খুব হাসলেন। মন ভাল করে দেবার মত চমৎকার একটি চিঠি। একজন কেউ বলছে–ফিরে এসো। সেই বলার আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে প্রতিটি অক্ষরে। মানুষ বাধা পড়বার জীবন নয়। কিন্তু তাকে বধিবার আয়োজনই বোধ হয় সবচে প্রবল।
তিনি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে রইলেন। চমৎকার একটি চিঠি লিখলেন, মিলিকে। সেখানে কিং-কংয়ের কথা লেখা হল। ওসমান সাহেব লিখলেন, আমার কেন জানি মনে হয়। আমি সারা জীবন একেই খুঁজে বেড়াচ্ছি। তার ছায়া দেখতে চেয়েছি প্রিয়জনদের মধ্যে। একটা অলৌকিক বিশ্বাস লালন করেছি নিজের মধ্যে যে একদিন না একদিন কিং-কং ফিরে আসবে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া কেউ বোধ হয়। কখনো ফেরে না।
চিঠিটি পাঠানো হল না। তার মনে হল মিলি এই চিঠির অর্থ বুঝতে পারবে না মনগড়া মানে দাঁড়া করিয়ে নিজের মনে কাদৰে। মিলি বড় ভাল মেয়ে। তাকে কাদাতে ইচ্ছা করে না।
দোতালার ঘর, বারান্দা, বাড়ির পেছনের পুকুরঘাট এর মধ্যেই ওসমান সাহেবের জীবনযাত্রা চলতে লাগল। খারাপ লাগল না মোটেই। বরং ভালই লাগতে লাগল। কাক তাড়ানোর ব্যাপারে বাতাসীকে সাহায্য করবার জন্যেও তিনি বসতে শুরু করলেন। আইনুদ্দিন এবং তার স্ত্রী কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। এই মানুষটিকে তারা ঠিক বুঝতে পারছে না। গ্রামের মানুষেরা রহস্যময়তা পছন্দ করে না।
