তা হলে আসে না কেন?
আইব আইব। একটু দেরি হইতেছে আর কি?
বার বছর বয়সে তার প্রথম রচনাটি কিং কং-কে নিয়ে লেখা। আমার পোষা প্ৰাণী এই পর্যায়ে ক্লাস সেভেনে তিনি রচনা লিখলেন, বাংলা স্যার মনমোহন বাবু সেই লেখাটি স্কুলের প্রায় সব কটি ক্লাসে পড়ে শোনালেন। তিনিই ওসমান সাহেবের লেখার প্রথম মুগ্ধ পাঠক। মনমোহন বাবু তার বরিশালের উচ্চারণে লেখাটা পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গিয়ে চোখ মুছতেন এবং ধরা গলায় বলতেন, পশু হয়ে জন্মানো বড় কষ্ট। অবলা প্ৰাণী, মুখে ভাষা নাই। মনের কথা কাউকে বলতে পারে না।
ওসমান সাহেব বারান্দায় হাঁটতে লাগলেন। আকবরের মা তার ছেলেকে নিয়ে এখনো ফিসফিস করছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে বোধ হয়। আকাশে বিশাল একটা চাঁদ উঠেছে। শহরে জ্যোৎস্না হয় না কথাটা ঠিক নয়। শহরের জ্যোৎস্নায় অন্য এক ধরনের বিষন্নতা আছে। শহরের জ্যোৎস্না পুরনো দুঃখের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
তিনি হাঁটতে হাঁটতে কিংকংয়ের কথা ভাবতে লাগলেন। সমগ্র সৃষ্টির মূল কথা কী? বিষাদ? হয়তবা। কিন্তু গাঢ় বিষাদ! তীব্র বেদনা তিনি কী কখনো বোধ করছেন? মোটা দাগের দুঃখ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। মার মৃত্যু, বাবার মৃত্যু। অথচ কিং কংয়ের কথা মনে হলে এখনো তীব্র বেদনা বোধ হয়। কেন হয়?
ভাইজান আপনেরে ডাকে?
কে ডাকে?
তিনি বিস্মিত হয়ে তাকালেন। এই দুপুর রাতে তাকে কে ডাকবে?
টেলিফোন।
তিনি বিরক্ত মুখে বসার ঘরের দিকে এগিয় গেলেন। বারান্দায় হাঁটতে তাঁর ভালই লাগছিল।
সুর কেটে গেছে। আবার ফিরে আসা যাবে না।
টেলিফোন করেছে নবী। দুপুর রাতে অকারণে মানুষকে বিরক্ত করা একমাত্র তার পক্ষেই।
হ্যাঁলো ওসমান সাহেব, কেমন আছেন?
ভাল।
গৰ্জিয়াস একটা চাঁদ উঠেছে বাইরে। আপনার লক্ষ্য করার কথা নয়। আপনার কাজ হচ্ছে মানুষ নিয়ে। প্রকৃতি নিয়ে নয়। হ্যাঁলো, শুনতে পারছেন। আমার কথা?
পারছি।
কিছুক্ষণ আগে একটা প্ল্যান করা হল, আমরা কয়েকজন মিলে লঞ্চে করে বুড়িগঙ্গায় ঘুরব। সঙ্গে থাকবে হাজির মোরগ পোলাও এবং বুঝতেই পারছেন কী? জলযাত্রার ব্যবস্থা। ওসমান সাহেব।
বলুন।
আপনি তৈরি হয়ে থাকুন। আমি আপনাকে নিতে আসছি। আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন নিতীশ বাবু। চিনতে পারছেন তো?
না।
আপনি তো ভাই অবাক করলেন। নিতীশ শৰ্মা, কবি ও নাট্যকার। কলকাতা থেকে এসেছেন। নিতীশ বাবু আমার পাশেই আছেন। কথা বলবেন তার সাথে?
জি না। অপরিচিত কারোর সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি না।
অপরিচিত হবে কেন। নিতীশ বাবুর লেখা তো পড়েছেন? স্বরবৃত্তে আসিনি কখনো, পড়েননি?
কবিতা পড়ি না। নবী সাহেব শুনুন, আমি যাচ্ছি না। আপনাদের সঙ্গে।
কেন?
আমি এ জাতীয় ব্যাপারগুলি ঠিক এনজয় করি না।
মনিকাও যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। ওর ইচ্ছা আপনাকে সঙ্গে নেবার। আমি নিজে আপনার কোম্পানির জন্যে তেমন উতলা নাই। কী যাবেন?
আমার শরীরটা ভাল নেই।
আপনি তো এখানে ব্যায়াম করবার জন্যে আসছেন না। লঞ্চের রেলিং ধরে জ্যোৎস্না দেখবেন। আমরা চাঁদপুর যাব। তারপর ফিরে আসব। নদী বক্ষে রাত কাটাব। নিতীশ বাবুর স্ত্রীও যাচ্ছেন। কীর্তনের একজন নামী শিল্পী। তিনি সারা রাতই গানটান গাইবেন।
কিছু মনে করবেন না। নবী সাহেব, আমি যাব না।
নবী সাহেব খানিকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। ওসমান সাহেব ভেবে পেলেন না, হঠাৎ তাকে নেবার জন্যে নবী এত ব্যস্ত কেন? তারা তাঁর স্বভাব জানে। দল বেঁধে প্রকৃতি দেখা, সাহিত্য সভা করা, গানের আসর করা এসবে তাঁর কোনোকালেই কোন আগ্রহ ছিল না। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, নবী সাহেব, রেখে দেই।
এখনি রাখবেন না–মনিকার সঙ্গে কথা বলুন।
ওসমান সাহেবের বিস্ময়ের সীমা রইল না। মনিকা কী তাকে সঙ্গে যাবার জন্যে বলবে? সেই অনুরোধ না রাখার মত মনের জোর কী তাঁর আছে। বহুদিন পর মনিকার সঙ্গে তাঁর কথা হচ্ছে। তাঁর ধারণা ছিল মনিকার প্রতি তিনি এখন আর তেমন কোনো আকর্ষণ অনুভব করছেন না। কিন্তু ধারণা ঠিক নয়। ওসমান সাহেব টেলিফোন হাতে নিয়ে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করলেন। তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। কেউ কখনো হারায় না। মানুষের মনের মত বিচিত্র আর কী আছে। কাউকে সে হারাতে দেয় না। বিশাল এক অন্ধকার ঘরে সমস্তই সাজানো। যে কোন মুহূর্তে আলো ফেলে সে তুচ্ছতম বস্তুকেও আলোকিত করে।
মনিকা শান্ত স্বরে বলল, শরীর কী বেশি খারাপ?
না খুব বেশি না।
অনেক দিন দেখা হয় না তোমার সাথে। লেখাটেখাও কিছু চোখে পড়ে না।
লিখতে পারছি না।
কেন?
জানি না। ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে বোধ হয়। কিংবা ক্ষমতা হয়ত কোনকালে ছিলইনা।
দুঃখবাদী কথাবার্তা বলছি কেন?
ওসমান সাহেব হাসলেন। নিঃশব্দ হাসি। মনিকা টের পেল না।
এই গভীর রাতে তোমাকে টেলিফোন করার কারণটি জান?
জানি। জ্যোৎস্না দেখা।
না সেটা তেমন কোনো কারণ নয়। জ্যোৎস্না দেখার জন্যে লঞ্চ ভাড়া করার দরকার নেই। ব্যবস্থা করা হল নবীর জন্যে। নবীর খবর জান নিশ্চয়ই।
কী খবর?
আজ রাত আটটায় খবরে তো বলেছে।
খবর আমি শুনিনি।
নবী স্বাধীনতা পদক পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্যে।
খুব ভাল খবর। নবী নিশ্চয়ই উল্লসিত।
না। সে গম্ভীর। বলছে, পদক-ফদকের জন্যে আমি লিখি না। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। খবর শুনেই সে ছুটে এসেছে আমার কাছে। সেলিব্রেট করার জন্যে কী করা যায়। সেই নিয়ে চিন্তাভাবনা। শেষে নদী বক্ষে ভ্রমণ ঠিক করা হয়।
