ওসমান সাহেব নিচু স্বরে বললেন, হ্যাঁ, যদি তোমার আপত্তি না থাকে। মতিয়ুর থমথমে গলায় বলল,
আপত্তি অবশ্যই আছে। সে দারুণ অসুস্থ মেয়ে। আপনি কাছাকাছি থাকলে সে কিছুটা সংযত আচরণ করে। এমনিতে তার আচারণ আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। তা ছাড়া…
তা ছাড়া কী?
বোনের বিয়ে দিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন পাগল পুষতে হবে না।
তুমি এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছি কেন?
মতিয়ুর চুপ করে গেল। ওসমান সাহেব বললেন,
তুমি ওকে আমার সঙ্গে দিতে রাজি না?
জি না। আমি ওকে ইন্ডিয়া পাঠাব। রাচি মেন্টাল হসপিটেলে আমার বন্ধুর একজন পরিচিত ডাক্তার আছেন। প্রফেসর দেবশৰ্মা। উনার সঙ্গে যোগাযোগ করছি।
কবে নাগাদ পাঠাবে?
এখনও কিছু জানি না। পাসপোর্ট ভিসা এইসব হাঙ্গামা আছে। আপনি দেশে কবে যাবেন?
শিগগিরই যাব।
এমনি যাচ্ছেন, না কোনো কারণ আছে?
এমনি যাচ্ছি।
মিলি ঘুমুচ্ছিল। ওসমান সাহেব অপেক্ষা করলেন না। দেখা না করেই চলে এলেন। মাঝে মাঝে কারো জন্যেই অপেক্ষা করতে ইচ্ছা করে না।
কোথাও যাবার আগে তিনি এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করেন।
ঢাকা শহরে তার শিকড় গজিয়ে গেছে। কোথাও যাওয়া মানেই শিকড় ছিঁড়ে যাওয়া। মানুষ কী আসলে এক ধরনের বৃক্ষ? এই কথা ভাবতে ভাবতে তিনি বারান্দায় হাঁটতে লাগলেন। রাত প্রায় এগারোটা। আকবরের মা তার ছেলের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছে। ওসমান সাহেবের মনে হল তার মনের উত্তেজনা ওদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। অন্য সময় এগারোটার অনেক আগেই রফিক ঘুমিয়ে পড়ত। আকবরের মা ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে থাকত টিভির দিকে। টিভির শেষ অনুষ্ঠানটি না হওয়া পর্যন্ত সে উঠত না। আজ টিভি চলছে না।
আকবরের মা বারান্দায় এসে বলল, চা দিমু?
না, চা লাগবে না।
গরম দুধ দিমু এক কাপ?
তিনি চমকালেন। দুধ দেবার কথা বলে সে কী একটু বাড়তি যত্নের চেষ্টা করছে? রানু এখানে থাকার সময় শোবার আগে তাকে এক কাপ বিস্বাদ গরম দুধ খেতে হত। আজ হঠাৎ আকবরের মারা হয়ত পুরানো কথা মনে পড়েছে। তিনি বললেন, দাও এক কাপ।
আকবরের মা আগুন-গরম দুধ নিয়ে এল। এতটা গরম তিনি আন্দাজ করেননি। মুখে নিতেই মুখ পুড়ে গেল।
চিনি দিমু?
চিনি লাগবে না। তুমি ঘুমোতে চাও।
আপনি কবে আইবেন?
ঠিক নেই। তুমি ঘুমোতে যাও, আকবরের মা!
সে গেল না। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। রফিক এসে ভয়ে ভয়ে দাঁড়াল তার মার পাশে। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, কিছু বলবে আমাকে?
জি না।
তোমাদের আমি রানুর বাসায় রেখে আসব। ও নতুন বাসা করেছে। বড় বাসা। অসুবিধা হবে না। এখানে যে বেতন পেতে ওখানেও তাই পাবে।
বলেই ওসমান সাহেবের মনে হল আকবরের মা কোনো বেতন নেয় না। তার বেতন সব জমা থাকে। একদিন সবটা একসঙ্গে নেবে। প্রায় আট বছর সে আছে খানে এই দীর্ঘ আট বছরে সে কোনো টাকা পয়সা নেয়নি। রানুকে বলেছে–নিলেই তো খরচ কইরা ফেলামু আফা। আফনের কাছে থাউক। বেতন কত কী তা নিয়েও তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। একশ টাকা করে হলেও প্রায় দশ হাজার টাকা। অনেকগুলি টাকা। এত টাকা নিয়ে সে কী করবে?
ওসমান সাহেব বললেন, আকবরের মা, তুমি কী বেতনের টাকাটা চাও? অনেক টাকা জমেছে তোমার।
টাকা নিয়ে আমি করমুটা কী? কারে দিমু?
নিজের টাকা অন্যকে দিবে, নাহয় নিজে খরচ করবে।
আকবরের মা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমরা আপনাদের সাথে যাইতে চাই ভাইজান।
আমার সাথে কোথায় যাবে?
দেশের বাড়িত। পাক-সাক কিরনের দরকার না? পাক-স্যাক কে করবে?
না, তার দরকার নেই।
আকবরের মা ক্ষীণ স্বরে বলল, আমরা কাপড়-চোপড় ঠিক কইরা রাখছি। তিনি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষ মায়াবদ্ধ জীব। তারা মায়ায় পড়ে গেছে। শুধু মানুষই মায়াবদ্ধ? সমস্ত জীব জগৎই কী মায়াবদ্ধ নয়? খুব ছোট বেলায় তিনি একটি কুকুর পুষেছিলেন। অত্যন্ত গোপনে বাড়ির গ্যারেজের পেছনে তার আহার এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়েছিল। কালে এটা কিং কংয়ের মত মহাবলশালী একটা কিছু হবে এই আশাতেই সম্ভবত তার নাম দেয়া হয়েছিল কিং কং। এক মাসের মাথায় কুকুর সংবাদ প্রকাশ হয়ে পড়ল। ফয়সল সাহেবের নির্দেশে একটা চটের বস্তায় তাকে মুড়ে পাঠিয়ে দেয়া হল সাত মাইল দূরে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কিং কং তৃতীয় দিনের মাথায় বাড়ি এসে উপস্থিত। গেটের ভেতর ঢুকেই সে খুব হৈচৈ করে সে তার আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। তাকে আবার বস্তাবন্দি করে ফেলে দিয়ে আসা হল আরো দূরে। বস্তায় ভরে দেয়া হল কপুর! যাতে কপুরের গন্ধে অন্য সব গন্ধ এলোমেলো হয়ে যায়। ঘাণ নিয়ে নিয়ে সে আর ফিরে আসতে না পারে। কিন্তু সে ফিরে এল। দশ দিনের মাথায় কাহিল অবস্থায় সে উপস্থিত। এবার আর আগের মতো হৈচৈ নেই, আনন্দ উল্লাস নেই। তার চোখে ভয়।
ফয়সল সাহেব রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বাগানের মালি কাশেম মিয়াকে বললেন, এবার এমন একটা কিছু কর যাতে সে ফিরে আসতে না পারে। যদি সে ফিরে আসে, তোমার চাকরি থাকবে না। কাশেম মিয়া ভয়ে ভয়ে বলল, বস্তাতে ভইরা পানিতে ডুবাইয়া দিমু?
যা ইচ্ছা কর, শুধু মনে রাখবে সে এলে তোমার চাকরি নট।
কিং কং আর ফিরে আসেনি। তিনি দিনের পর দিন প্রতীক্ষা করছেন কিং কং আবার আসবে। কত বার কাশেম মিয়াকে গোপনে জিজ্ঞেস করেছেন, সত্যি সত্যি পানিতে ফেলে দিয়েছেন কাশেম ভাই? কাশেম মিয়া চোখ কপালে তুলে বলেছে, তা কেমনে করি ছোড় মিয়া? আমি মানুষ না? আমার নিজের পুলাপান আছে না?
