মনিকা হাসল। কী সুন্দর হাসি।
তুমি আসতে পারছি না?
শরীরটা ভাল নেই। তাছাড়া–
তাছাড়া কী?
কাল ভোরে আমি গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি, কিছু দিন থাকব। সেখানে।
হঠাৎ গ্রামের বাড়িতে কেন?
কোনো কারণ নেই। এমনি।
আচ্ছা ঠিক আছে। পরে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।
মনিকা ফোন রেখে দিল। ওসমান সাহেব ঘুমুতে গেলেন। ঘুম আসবে না। শুয়ে শুয়ে বইটই পড়লে কেমন হয়। কিন্ত বাতি জ্বালাতেও ইচ্ছা করছে না। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন নবীর প্রতি তিনি কোনো ঈর্ষাবোধ করছেন না। কেন করছেন না? সাহিত্যের আসর থেকে তিনি কী নিজেকে নির্বাসিত করেছেন? এ রকম হল কেন?
তার পুরনো বইগুলির এডিসন হচ্ছে না। প্রকাশকরা উৎসাহিত বোধ করছে না। কেউ বোধ হয়। এসব বই আর চায় না। তারা এখন চাইবে নবীর মত লেখকদের লেখা। যেখানে ঝলমল করবে। প্ৰাণ। নবীর শেষ বইটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে একটা আলোড়ন হয়েছে। একজন লেখকের জন্যে এরচে বড় পুরস্কার আর কী?
আচ্ছা তিনি কী আবার কোনো দিন লিখতে পারবেন? পাঠককে আলোড়িত করবার মত না হোক সাধারণ একটি লেখা? মনে হয় না। লেখা হবে না। আর কোনো দিন। এখন তার নির্বাসনের কাল। তিনি ছটফট করতে লাগলেন। শেষ রাতে তন্দ্রার মত হল। সেই তন্দ্রার মধ্যেই স্বপ্নে দেখলেন, কিং কং ফিরে এসেছে। কিন্তু তার চোখ দু’টি নষ্ট। সে গন্ধ ওঁকেণ্ডকে পুরানো বন্ধুকে খুঁজে বের করতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না।
অপলাকে রানুর বাসায়
ওসমান সাহেব অপলাকে রানুর বাসায় দেখে অবাক হলেন। তাঁর ধারণা ছিল সে হোস্টেলে। শেষ পর্যন্ত বোধ হয় হোস্টেলে যায়নি। তিনি ঐ প্রসঙ্গ তুললেন না। গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন, এই খবরটি দিলেন। অপলা বলল সত্যি যাচ্ছেন?
হ্যাঁ, কেন?
এমনি। কিছুদিন থাকব। শরীর ভাল লাগছে না
কতদিন থাকবেন?
সেটা ঠিক করিনি।
যাচ্ছেন কখন?
এইত ঘণ্টাখানেকের মধ্যে।
রানু এই খবরে বিশেষ বিচলিত হল না। তার অফিসে যাবার তাড়া। বেশি সময় দিতে পারছে না। সে বলল, টগর বড় খালার বাসায় আছে। তুমি কী তার সঙ্গে দেখা করতে চাও?
না। ওখানে গিয়েছে কেন?
ওর সমবয়সী কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে। কাল নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর আর আসতে চায় না।
রানু মৃদু স্বরে বলল, আমাকে মনে হয় সে পছন্দ করে না। ওসমান সাহেব কিছু বললেন না। রানু বলল, তুমি যদি চাও তোমার সঙ্গে ওকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবে, তাহলে নিতে পাের। টগর খুশিই হবে।
রানু বেশখানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, নির্বাসনে যাচ্ছ?
নির্বাসনে যাব কেন?
লেখক সুলভ একটা চাল দেবার জন্যে যাওয়া আর কী?
উঠি রানু।
রানু বলল, আকবরের মা আর তার ছেলে, ওরা কোথায় থাকবে?
ওদের বীথির সমিতিতে রেখে এসেছি।
অপলা তাকে এগিয়ে দিতে নেমে এল নীচ পর্যন্ত। মৃদু স্বরে প্রায় ফিসফিস করে সে বলল, দুলাভাই আপনি কী আমাকে চিঠি লিখবেন?
হ্যাঁ লিখব। অপলা বলল, চোখ মুছতে মুছতে, লিখব আমিও।
অবাক হয়ে দৃশ্যটি ওসমান সাহেব দেখলেন।
কুশল জানতে চেয়ে চিঠি
রানু, কেমন আছ তোমরা?
কুশল জানতে চেয়ে চিঠি শুরু করা গেল। বিয়ের আগে যেসব চিঠি লিখেছি তার শুরু কেমন ছিল মনে করতে পারছি না। অনেক কিছুর সঙ্গে স্মৃতি শক্তিও আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। পুরনো কথা সহজে মনে পড়তে চায় না। বুড়ো হয়ে যাচ্ছি বোধ হয়।
চিঠির শুরুটা ভাল হয় না। তোমার নিশ্চয়ই ভ্রূ কুঁচকে উঠেছে। তবে একটা মজার কথা কী জানো? চিঠিতে এলেবেলে যাই লিখি না কেন তুমি মন দিয়ে পড়বে। রাগ দেখানোর জন্যে দুতিন লাইন পড়েই চিঠি ছুড়ে ফেলবে না। কেন পড়বে না। সেই কারণটিও বলি। কারণ, তুমি যে রাগ করে চিঠি ফেলে দিয়েছ এই দৃশ্যটি আমি দেখব না। যার ওপর রাগ করলে সে যদি নাই জানল, ধ্ৰুংলুরু করার যৌক্তিকতাটা কোথায়? কাজেই আমার ধারণা তুমি খুব মন দিয়েই চিঠি পড়বে। ঠিক বলিনি?
এখানে এসে পৌঁছেছি। গত পরশু। বিকেল চারটায় যে ট্রেন পৌছানোর কথা সেটা পৌছোল সন্ধ্যা ছাঁটায়। আমার ধারণা ছিল দেখব সব বদলে গেছে সব অচেনা, শহরতলি শহরতলি ভাব চলে এসেছে গ্রামে। সে রকম কিছুই দেখলাম না। সব কিছু আগের মতই আছে। আগের মতই অনেক অপরিচিত মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করল,
আপনার নাম?
যাইবেন কই?
কোন গেরাম?
কার বাড়ি?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানার তাদের দরকার নেই। তবু এমন ভাবে জিজ্ঞেস করছে যেন উত্তরগুলি জানা না থাকলে এদের খুব মুশকিল হয়ে যাবে। এবং মজার ব্যাপার হাচ্ছে এরা সবাই আগ্রহ করে বলল, আমাকে কী ভাবে যেতে হবে। জুম্মা-ঘরের ডান দিকের রাস্তা নিতে হবে না বা দিকের রাস্তা নিতে হবে। যদিও তাদের কাছে আমি কিছুই জানতে চাইনি।
রানু, নিশ্চয়ই তুমি অবাক হয়ে ভােবছ এসব আমি লিখছি কেন? কারণ একটা আছে। আমি মূল কথা বলবার জন্যে আবহ তৈরি করছি। ভূতের গল্প বলার আগে যেমন বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়। কথক গলার স্বর অনেক খানি নামিয়ে আনেন, যাতে গা ছমছমানো একটা ভাব তৈরি হয়। এ রকম আর কী?
এই পর্যন্ত লিখেই ওসমান সাহেব চেয়াব ছেড়ে উঠে পড়লেন। যা লিখতে চাচ্ছেন তা খিলতে পারছেন না। অবাস্তর কথাবার্তা লেখা হচ্ছে। অবান্তর এবং অসত্য।
স্টেশন থেকে বাড়ি আসবার পথে কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। গ্রাম আগের মত আছে বলে যা লিখছেন তাও সত্যি নয়। অনেকখানি বদলেছে। ইলেকট্রিসিটি এসেছে। কিছু কিছু বাড়িতে লম্বা বাঁশের মাথায় টিভি এন্টেনা। এ গ্রাম ভিন্ন ধবনের গ্রাম। আগের চেনা গ্রাম নয়। তিনি কী জেনে শুনেই সমস্ত অস্বীকার করতে চাইছেন? ভান করছেন সব আগের মতই আছে?
