ওকে এনে কী হবে?
বাবার মৃত্যু সংবাদ তো অন্তত তাকে দিন। দেয়া উচিত। টগরকেও আনুন। ওসমান সাহেব রানুকে খবর দিতে গেলেন অনেক রাতে।
রানু ঘুমিয়ে পড়েছিল। এত রাতে তাঁকে আসতে দেখে সে খুব অবাক হল। চিন্তিত মুখে বলল, কী হয়েছে? বাবার মৃত্যু সংবাদ দেবার বদলে ওসমান সাহেব ক্লান্ত স্বরে বললেন, রানু আমি কিছু লিখতে পারছি না।
রানু অবাক হয়ে বলল
রানু অবাক হয়ে বলল, রাত এগারটার সময় তুমি আমাকে এই খবরটা দিতে এলে?
ওসমান সাহেব চুপ করে রইলেন। রানুর পেছনে পেছনে অপলাও এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে মুখে কৌতূহল। সে বলল, কী ব্যাপার দুলাভাই? রানু কাটাকাটা গলায় বলল, তোর দুলাভাই ইদানীং লিখতে পারছে না। এই খবরটা দিতে এসেছে।
দুলাভাই ভেতরে এসে বসেন।
ওসমান সাহেব বসবার ঘরে এসে ঢুকলেন। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বসলেন সোফায়। চাপা। গলায় বললেন, টগর কী ঘুমুচ্ছে? রানু বলল, হ্যাঁ।
ওর শরীর ভাল আছে?
ভালই আছে।
এক কাপ চা খাওয়াতে পার রানু? প্রচণ্ড শীত বাইরে।
রানু কিছুই বলল না। অপলা বলল, আপনি আরাম করে বসুন। আমি চা নিয়ে আসছি। আপা তুমি খাবে?
कां।
খাও না একটু। তিনি কাপ নিয়ে আসি; গল্প করতে করতে খাব।
রানু কড়া চোখে তাকাল অপলার দিকে। অপলা সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। দুলাভাইয়ের হঠাৎ করে এই রাতের বেলা উপস্থিত হওয়াটা তার খুব ভাল লাগছে। কেমন যেন উৎসব মনে হচ্ছে তার কাছে। সে হালকা পায়ে চা আনতে গেল।
ওসমান সাহেব বললেন, রানু এক গ্লাস পানি খাব। রানু বলল, তোমার কী হয়েছে?
আমার কিছু হয়নি।
তোমাকে আমি খুব ভালভাবে চিনি। অকারণে তুমি এত রাতে এখানে আসবে না। তোমার অহঙ্কারে লাগবে। কী হয়েছে, বল।
বাবা মারা গেছেন।
কখন?
রাতে। ঠিক টাইমটা বলতে পারব না। খেয়াল করিনি।
রানু দীর্ঘ সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ওসমান সাহেব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সিগারেট টানতে লাগলেন। এক সময় বললেন,
হঠাৎ করে বেশ শীত পড়ে গেল, তাই না বানু? নাকি শুধু আমার একারই শীত লাগছে?
শীত পড়েছে।
রানু উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। খোলা দরজায় ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। ওসমান সাহেব বললেন, তুমি কী যাবে আমার সঙ্গে? বাবা, তোমাকে খুব পছন্দ করতেন। রানু ঠাণ্ডা গলায় বলল, একটা মৃত্যু সংবাদ দিতে এসে তুমি নিজের লিখতে না পারার খবরটা আগে দিলে। লেখাটা কী এতই
রুরি?
তিনি কিছু বললেন না। রানু তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, লেখকরা অন্য মানুষদের চেয়ে আলাদা এটা আর যেই বিশ্বাস করুক আমি করি না।
আমি আলাদা এটা কখনো দাবি করিনি।
দাবি করতে হবে কেন? আচার-আচারণ দিয়ে তুমি বুঝিয়ে দিতে চাও তুমি আলাদা।
তাই কী?
হ্যাঁ তাই। তোমার বাবা মারা গেলেন। এটা একটা ভয়াবহ ব্যাপার। অথচ তুমি নিতান্ত স্বাভাবিকভাবে এসে বললে, রানু, আমি লিখতে পারছি না। এর মানে কী?
মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
একজন লেখক লিখতে না পারলে বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো ক্ষতি হবে না।
বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি নিয়ে আমি ভাবি না। আমি আমার নিজের কথাই ভাবি।
এটা ঠিকই বলেছ। নিজেকে ছাড়া তুমি আর কিছুই ভাবতে পার না।
রানু উঠে দাঁড়াল। ওসমান সাহেব বললেন, চলে যাচ্ছ নাকি?
কাপড় বদলে আসি। যেতে হবে না? তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে?
আছে। মিলির গাড়ি নিয়ে এসেছি।
ওরা গাড়ি কিনেছে নাকি?
জানি না কিনেছে কী না।
তা জানবে কেন?
অপলা চায়ের কাপ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল, দুলাভাই আমার খারাপ লাগছে। আমি বুঝতেই পারিনি। আপনি একটা মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এসেছেন।
তিনি দ্বিতীয় সিগারেট ধরিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, তোমাকে অন্য রকম লাগছে কেন আপলা?
কী রকম?
একটু যেন অচেনা লাগছে!
শাল গায়ে দিয়েছি তো সেই জন্যে। আপনি আমাকে শাল গায়ে দেয়া অবস্থায় কখনো দেখেননি।
তোমরা কখন কোন পোশাক পরে কার সামনে গিয়েছ এটা কী মনে রাখ নাকি?
অপলা লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল, হাসতে হাসতেই বলল, চা-টা ভাল হয়েছে দুলাভাই?
খুব ভাল হয়েছে। চমৎকার। বাস অপলা।
অপলা বসল। তার সামনে। তার মুখ হাসি হাসি। চোখ চিকমিক করছে। এর মানে হচ্ছে ওসমান সাহেবের চেহারায় কোনো দুঃখের ছাপ নেই। ছাপ থাকলে আপলা এমন খুশি খুশিভাবে তার সামনে এসে বসত না। একজনের দুঃখ অন্য জনের ওপর ছায়া ফেলে। ওসমান সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেল।
অপলা তুমিও চল আমাদের সঙ্গে?
কোথায়?
আমাদের বাড়িতে। টগরকেও নিয়ে চল।
আপনি রানু আপাকে বলুন। আপা রাজি না হলে তো যাওয়া হবে না।
রানুকে কিছু বলতে হল না। সে এসে অপলাকে তৈরি হতে বলল। টগরের ঘুম ভাঙিয়ে কাপড়-জামা পরাতে বসল। টগর কিছুই বলল না। যেন রাত দুপুরে ঘুম ভাঙিয়ে কাপড়-জামা পরানোটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। শিশু সুলভ কোন কিছুই তার মধ্যে নেই। এ রকম হচ্ছে কেন ছেলেটা?
রানু বলল, টগর আমরা তোমার দাদার বাড়িতে যাচ্ছি।
আচ্ছা।
তোমার দাদা মারা গেছেন।
টগরকে এবার কৌতূহলী হতে দেখা গেল। সে চোখ বড় বড় করে তোকাল। রানু বলল, মানুষ যখন খুব বুড়ো হয় তখন তারা মারা যায়।
বাচ্চারা মারা যায় না?
টগর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাচ্চারাও মারা যায়। আমি দেখেছি।
কোথায় দেখলে তুমি?
টগর কোন উত্তর দিল না। রানু তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, কোথায় দেখলে তুমি বল শুনি।
বলব না।
বলবে না কেন?
বলতে ইচ্ছে করছে না।
তারা বাড়িতে পৌঁছল একটার দিকে। টগরের চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে অপলার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে দেখছে চারদিকে। মাঝে মাঝে ফিসফিস করে আপলার কানে কানে কি যেন বলছে এবং অপলা বিরক্ত হচ্ছে।
