লোকজন বাড়িতে অনেক কম। বেশির ভাগ আত্মীয়-স্বজনই চলে গেছেন। যারা আছেন তাদের একটা বড় অংশ বসার ঘরে ঝিমুচ্ছে। কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে। আগের জমজমাট ভাব এখন আর নেই। চারদিকে মোটামুটিভাবে নিঃশব্দ। শুধু মওলানা সাহেব এখনো ক্লান্তিহীন। তিনি আগের মতই সুরেলা গলায় কোরান শরীফ পড়ছেন। সারা রােতই হয় তো পড়বেন।
ওসমান সাহেবের মনে হল এই মওলানা সাহেব এর আগেও নিশ্চয়ই অনেক মৃত মানুষের পাশে বসে কোরান শরীফ পড়েছেন। সমস্ত ব্যাপারটিতেই এখন তিনি অভ্যস্ত। এটা তার একটা রুটিন কাজ। অথচ মনে হচ্ছে কী গভীর আবেগ নিয়েই না। তিনি কোরান শরীফের আয়াত পড়ে যাচ্ছেন, একটির পর একটি। লেখকরাও তো অনেকটা সে রকম। রুটিন মত লিখতে বসেন। পাঠকরা সে লেখা পড়ে মনে করে কী গভীর আবেগ ও মমতা নিয়েই না লেখাগুলি লেখা হয়েছে। পাঠকরা হাসে ও কাঁদে।
ওদের ঢুকতে দেখে বীথি এগিয়ে এল। টগরকে বলল, বাবু তুমি আমার কোলে আসবে? টগর দুহাত বাড়িয়ে দিল; যেন এর জন্যেই অপেক্ষা করছিল। অথচ বীথির সঙ্গে তার পরিচয়
নেই। বীথি রানুকে বলল, আপনি আসুন আমার সঙ্গে, বাবুকে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। রাতটা নিশ্চয়ই থাকবেন?
হ্যাঁ থাকব।
আপনার জন্য একটা ঘর গুছিয়ে রেখেছি।
রানু বীথির সঙ্গে দোতলায় উঠে গেল। অপলা বলল, এই মেয়েটি কে দুলাভাই?
আমার বাবার সেক্রেটারি। বীথি।
আশ্চর্য এমন সুন্দর মানুষ হয়?
খুব সুন্দর নাকি?
হ্যাঁ।
অপলা খুব অবাক হয়েছে। ওসমান সাহেবের মনে হল সৌন্দর্য ব্যাপারটা পরিবেশ নির্ভর। গভীর রাতে অপলা একটি অপরিচিত বাড়িতে এসেছে। সে বাড়িতে একটি মৃতদেহ আছে। স্বভাবতই আপলার মনে ভয় এবং সংশয় ছিল। সে নিশ্চয়ই ভেবে রেখেছিল এ বাড়িতে এসে সে দেখবে চারদিকে সবাই কাঁদছে। এ রকম কিছু সে দেখেনি। সে দেখেছে বীথিকে। যার মুখে অন্য ধরনের একটি স্নিগ্ধতা আছে। যার কাধে হালকা নীল রঙের চাদর; পরনের শাড়ি সাদা রঙের। ছবিটি সুন্দর। কাজেই অপলার মনে হয়েছে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রমণীটিকে দেখেছে। দিনের আলোয় এ রকম মনে হবে না। কিংবা হয়ত হবে। মনের ওপর প্রথম যে ছাপটি পড়ে তা দীর্ঘদিন থেকে যায়।
আপলা হাঁটতে লাগল ওসমান সাহেবের পিছু পিছ। একবার স্বাক্ষীণ স্বরে বলল, বিরাট বাড়ি আপনাদেরই দুলাভাই। রাজপ্রাসাদের মত। এটাও একটা আপেক্ষিক কথা। রাতের জন্যে বাড়িটি প্রকাণ্ড মনে হচ্ছে। দিনের আলোয় আর সে রকম মনে হবে না।
অপলা।
বলুন।
কাল আমি ডেডবডি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাব। ঐ বাড়িটিও খুব সুন্দর। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?
আপলা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বলল, হ্যাঁ দুলাভাই আমি যাব। তিনি ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। মওলানা সাহেব এক মনে কোরান পাঠ করছেন। সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন এ বাড়িতে একটি মৃত্যু ঘটেছে।
টগরকে ঘুম পাড়িয়ে রানু নিচে আসছিল। সিঁড়ির গোড়ায় এসে থমকে দাঁড়াল। বারান্দার রেলিং ধরে অপলা দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই ওসমান। দুজনের দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে অন্যরকম কিছু একটা আছে। রানুর বুকে ছোট্ট একটা ধাক্কা লাগল।
দিন কী খুব দ্রুত কাটে
দিন কী খুব দ্রুত কাটে?
কারোর কারো হয়ত কাটে। কিন্তু ওসমান সাহেবের ধারণা তার দিন চলছে শামুকের মত।
এবং কখনো একেবারে চলছেই না, থেমে আছে।
কিন্তু আজ বীথির কথা শুনে তিনি চমকে উঠলেন। দ্বিতীয় বারের মত বললেন, বাবা মারা গেছেন এক বছর হয়েছে? বলেন কী?
বীথি হালকা স্বরে বলল, সময় খুব দ্রুত যায়। বলেই সে হাসল। সেই হাসি সে ধরে রাখল অনেকক্ষণ। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় হাসি ধরে রাখে। কেউ কেউ ধরে রাখে বিষাদ। দু’টিই কঠিন কাজ। বীথি বলল, আপনি আসবেন আজ সন্ধ্যায়?
কী হবে সন্ধ্যায়?
তেমন কিছু না। একটা মিলাদ পড়বার ব্যবস্থা করেছি। অল্প কিছু লোকজনকে আসতে বলেছি।
আমি যাব। আপনার সমিতি কেমন চলছে?
ভালই, আপনি তো কোনোদিন দেখতে এলেন না।
আজই তো যাচ্ছি। আজ দেখব। সমিতির মেয়েরা সব ওখানেই থাকে তো?
সবাই থাকে না। কেউ কেউ থাকে। আমার মত যাদের কোথাও যাবার জায়গা নেই তারা থাকে।
বীথি আবার হাসল। ওসমান সাহেবের মনে হল এই মেয়েটিকে তিনি মোটেই জানেন না। কখনো ভাল ভাবে লক্ষ্য করেননি, কখনো ভাবেননি। এক ধরনের মানুষ থাকে যাদের দেখে মনে হয় এদের ভেতর তেমন কোনো রহস্য নেই। এদের লক্ষ্য করার কিছু নেই। বীথিকে কখনো সে দলে ফেলা যাবে না। একজন রূপবতী তরুণীকে কখনো সে দলে ফেলা যায় না। তবু তিনি বীথির প্রতি অনাগ্রহ বোধ করেছেন কেন? বাবার কারণে কী? বাবা যে জিনিসটা পছন্দ করবেন তাকে সেটি অপছন্দ করতে হবে এমন কিছু কী তাঁর মানসিকতায় ঢুকে গেছে?
বীথি বলল, কী ভাবছেন?
কিছু ভাবছি না।
বীথি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনার কাছে আমার একটি ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপার আছে। অনেকবার ভেবেছি ক্ষমা চাইতে আসব। কখনো ঠিক সাহস হয়নি।
ওসমান সাহেব বিস্মিত চোখে তাকালেন। বীথি বলল, স্যার আমাকে বাড়িটা লিখে দিয়েছিলেন কিন্তু আমার ধারণা ছিল এটা আমি কখনো পাব না। আপনার আপত্তি তুলবেন। কোর্টে গেলে আপনাদের আপত্তি টিকে যাবে। কিন্তু আপনি উল্টোটা করলেন। বাড়িটি পেতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেটা দেখলেন।
উল্টোটা করলাম বলেই কী আপনি ক্ষমা চাইতে এসেছেন?
না, সে জন্যে না। স্যার আমাকে বেশ কিছু নগদ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। এটা আপনাদের কাছে গোপন করেছিলাম। ক্ষমা চাচ্ছি সে কারণেই।
