ডাক্তার সাহেব সিগারেটের একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে ঢুকলেন। মৃদু স্বরে বললেন, ওরা এখন বেরুচ্ছেন একটা এমুলেন্সে ডেডবডি নেয়া হচ্ছে। আসুন স্যার। ওরা অপেক্ষা করছেন আপনার জন্যে।
ওসমান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
সিগারেট নিন স্যার।
তিনি সিগারেট নিলেন। ধন্যবাদ জাতীয় কিছু বলা উচিত, বলতে পারলেন না। বলার বোধ হয় প্রয়োজনও নেই।
নাজমুল সাহেব, যাই।
স্যার আবার দেখা হবে।
অন্য দিনের কথাটা মনে করিয়ে দিয়ে ভাল করেছিন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ডাক্তার সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না। ওসমান সাহেব থেমে থেমে বললেন, অনেক দিন পর আপনি আমার বড় বোনের কথা মনে করিয়ে দিলেন। থ্যাংকস।
নটার মধ্যে ফয়সল সাহেবের বাড়ি মানুষজনে ভরে গেল। ঢাকা শহরের পরিচিত অর্ধ পরিচিত সব আত্মীয় স্বজন চলে এসেছে। গেট দিয়ে ঢুকেছে অত্যন্ত চিন্তিত ও বিষন্ন মুখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। একদল ঘুরে বেড়াচ্ছে অলস ভঙ্গিতে, অন্য একদল দারুণ ব্যস্ত। যদিও এতটা ব্যস্ততার কোনোই কারণ নেই। সবাইকে খরব দেয়া। পত্রিকার অফিসে নিউজ পাঠানো। ফটোগ্রাফার এনে ছবি তোলানো। অসংখ্য কাজ।
ওসমান সাহেব দোতলার বারান্দায় চাদর গায়ে দিয়ে বসেছিলেন। তার একটু শীত শীত করছে। বীথি এসে বলল, আপনি ভেতরে গিযে বসুন না। শীত লাগছে তো।
না ঠিক আছে। মিলি কী করছে?
ও শুয়ে আছে।
জ্ঞান ফিরেছে?
হ্যাঁ ডাক্তার সিডেটিভ দিয়েছে। ঘুমিযে পড়বে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আপনি কিছু খাবেন? দুপিস কেক এনে দেই?
দিন।
বলেই তার লজ্জা লাগল। দুভাই বোনের একজন ঘন ঘন ফিট হচ্ছে। অন্যজন দিব্যি বসে আছে। কেক বিসকিট খাচ্ছে।
আপনি একটু মিলিকে ডেকে দিন।
ওকে এখন আর ডাকাডাকি করবেন না। ঘুমুতে দিন।
মিলির হ্যাসবেন্ড কোথায়?
উনি মিলির সঙ্গে আছেন। উনাকে ডেকে দেব?
না থাক।
বীথি। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, ডেডবডি তো গ্রামের বাড়িতে যাবে। আপনি যাচ্ছেন তো সঙ্গে?
গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে নাকি?
হ্যাঁ। স্যার সেরকম বলে গেছেন। আপনি কী যাচ্ছেন সঙ্গে।
কখন যাবে?
কাল ভোরে। ট্রাক ভাড়া করতে গেছে। আপনি একটু কিছু মুখে দিয়ে নিচে গিয়ে বসুন। এভাবে বসে থাকা ভাল দেখায় না।
নিচে গিয়ে আমি করবটা কী?
কিছু করতে হবে না। বসে থাকবেন।
ওসমান সাহেব নিচে নেমে আসতেই নতুন একটা উদ্দীপনা দেখা দিল। খাটের চারপাশে কয়েকজন দোয়া-দরুদ পড়ছিলেন, তাদের গলার স্বর হঠাৎ অনেকখানি উঁচুতে উঠে গেল। ওসমান
সাহেব লক্ষ্য করলেন অনেকেই রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন। সম্পূর্ণই লোক দেখানো ব্যাপার। তাঁর বাবা এমন কোনো মানুষ ছিলেন না। যার মৃত্যুতে পরিচিত মানুষজন চোখের জল ফেলবে।
তিনি কঠিন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কাউকে কখনো নরম স্বরে কিছু বলেননি। আশপাশের প্রতিটি মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে এত লোকজন রুমালে চোখ মুছছে ব্যাপারটা शjदश्।
ধূপকাঠি এবং আতরের গন্ধে ওসমান সাহেবের মাথা ধরে গেল। তবু তিনি বসেই রইলেন। লম্বা এবং রোগা ধরনের একজন মওলানা সাহেব কোরান শরীফ পড়ছেন। তার কল্পনাতেও ছিল না। পড়ার ভঙ্গিতে, গলার স্বাবে কোথাও যেন একটা অপার্থিব কিছু আছে যা মন ছুঁয়ে যায়। তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
ওসমান একটু শুনে যাও তো।
তিনি চোখ মেললেন। মগবাজারের সিদ্দিক সাহেব। তবে দূব সম্পর্কের চাচা।
একটু বাইরে আস আমার সাথে।
তিনি বারান্দায় এলেন। সিদ্দিক সাহেব নিচু স্বরে বললেন, ঘবেব আলমাবির সব চাবি নিজের কাছে নিয়ে যাও, নয়ত হরির লুট হয়ে যাবে।
হরির লুট হওয়ার মত কিছু নেই।
তুমি বললেই হল, নাই। কিছুই জানো না তুমি। ক্যাশ টাকাই আছে দশ-বাবা হাজার।
দেখি।
না, দেখাদেখির কিছু নাই। আর শোন, এই বাড়ি ভর্তি ফালতু লোকজন। এদেব সবাবার ব্যবস্থা কর।
কেন?
পরে আর সরাতে পারবে না। গ্যাট হয়ে বসবে। দান করে গেছেন। হেন তেন সতেরো কথা
বলবে।
ওসমান সাহেব কিছু বললেন না।
তোমার বলতে লজা লাগে তো আমি বলে দেখা।
আপনার বলার দরকার নেই।
খুব দরকার আছে। তুমি ব্যাপারটার গুরুত্বই বুঝতে পাৰ্লছ না। তা ছাড়া শুনলাম বাড়ি ঘর সব নাকি ঐ মেয়েকে দিযে গেছেন?
হ্যাঁ, দিয়ে গেছেন।
একদম চেপে যাও। আমি দেখব। ব্যাপারটা। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
ওসমান সাহেব। আবার দোতলায় চলে এলেন। মিলি ঘুমাযনি, খুন খুন কবে কাঁদছে। সে কী বাবার মৃত্যুর জন্যেই এমন কাঁদছে না। পুরনো কোনো দুঃখের কথা ভেবে ভেবে কাঁদছে? জানার কোনো উপায় নেই। নিজের মনকেই কখনো জানা যায় না। অন্যের মন জানার তো প্রশ্নই ওঠে না।
ওসমান সাহেব সিগারেট ধরিয়ে হাটতে লাগলেন। ক্ষিধে লেগেছে। কটা বেজেছে কে জানে? বীথি এগিয়ে আসছে। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কেন জানি ওসমান সাহেবের ইচ্ছা হল বীথির মুখ ভাল করে লক্ষ্য করতে। গালে চোখের জলের কোনো চিহ্ন আছে কী না। চোখ লাল হয়ে আছে কিনা। তিনি হোত ইশারা করে বীথিকে ডাকলেন।
বীথি এগিয়ে এল।
কিছু বলবেন?
ওসমান সাহেব নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললেন, অনেকদিন ধরে আমি কিছু লিখতে পারছি না। বীথি তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। ওসমান সাহেব বললেন, মৃত্যু আমার কাছে খুব ছোট ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে। আমার কষ্ট অনেক বেশি।
বীথি কোমল স্বরে বলল, আপনি রানু ভাবীকে নিয়ে আসুন। একটা গাড়ি নিয়ে চলে যান।
