আচ্ছা তিনি কী তাঁর কোনো উপন্যাসে মৃত্যু বর্ণনা করেছেন? তিনি মনে করতে পারলেন না। তবে দীর্ঘ বর্ণনা কোথাও নেই এটা প্রায় একশ ভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। মৃত্যু ব্যাপারটি তিনি সব সময় এক দুই লাইনে সারতে চেষ্টা করেছেন। তার ধারণা তিনি একা নন মৃত্যুর বর্ণনা খুব কম লেখকই দিয়েছে। সবার মধ্যে একটা পাশ কাটানোর ভাব। প্ৰায় সবাই ফিলসফি করার চেষ্টা করছেন। মূল বর্ণনা তেমন নেই।
শরৎচন্দ্রের দেবদাসেরও একই ব্যাপার। শরৎচন্দ্র পাঠককে বললেন, মরণে ক্ষতি নাই। কিন্তু সেই সময় একটি সুখকর স্পর্শ কপালে আসিয়া পৌঁছে যেন একটি দয়ার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে জীবনের ইতি হয়।
ওসমান সাহেব।
তিনি চমকে তাকালেন। বেঁটে মত লোকটিকে চিনতে পারলেন না। কিছু কিছু মুখ সব সময় অচেনা থাকে। দীর্ঘ পরিচয়েও তাদের কখনো চেনা মনে হয় না।
আপনি এখানে কী করছেন?
কিছু করছি না।
সবাই আপনাকে খুঁজছে।
কেন?
ডেডবডি বের করতে হবে না?
বের করুন। আমাকে দরকার কেন?
বেঁটে লোকটি অবাক হয়ে বলল, সেকি আপনি ধরবেন না?
কী ধরব?
লাশ বের করার সময় ধরতে হবে না?
না।
আরে আপনি বলেন কী?
বেঁটে লোকটির বিস্ময়ের সীমা রইল না। তার বিস্ময় দেখে ওসমান সাহেব অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। লাশ বের করবার সময় তার বোধহয় ধরা উচিত। এটা নিশ্চয় কোনো একটা সামাজিক নিয়ম। কুৎসিত সব নিয়মকানুন চালু আছে। এ সমাজে।
ওসমান সাহেব শীতল স্বরে বললেন, যা করতে হয় আপনার করুন। আমাকে টানবেন না। প্লিজ।
লোকটি চলে গেল। শেষ মাথা পর্যন্ত গিয়ে পেছন ফিরে তাকাল, তার মানে সে বড়ই অবাক হয়েছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না বলেই দ্বিতীয়বার তাকিয়েছে।
তিনি ঘড়ি দেখলেন। ঘড়ি কী বন্ধ হয়ে আছে? মাত্র আটটা বাজে। হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলে কেমন হয়? একটা রিকশায় উঠে চলে যাওয়া যায়। বাড়িতে গিয়ে অপেক্ষা করলেই হবে।
ওসমান সাহেব, স্নামালিকুম।
ওয়াল্যাইকুম সালাম।
দ্বিতীয় এই লোকটিকেও তিনি চিনতে পারলেন না। এও কী এসেছে তাকে নিয়ে যেতে?
আমি এখানকার একজন ডাক্তার। আমার নাম নাজমুল।
কেমন আছেন?
স্যার ভাল আছি। আপনাকে প্রথম দেখে আমি চিনতে পারিনি। চেনা চেনা লাগছিল। এখানে কী করছেন? কোনো পেসেন্ট আছে নাকি?
হ্যাঁ একজন ছিলেন। আমার বাবা। মারা গেছেন।
ডাক্তার সাহেব একটু হকচকিয়ে গেলেন। সান্তুনা দেয়ার ব্যাপারটা ডাক্তারেরা একেবারেই পারে না। রোগীর মৃত্যু মানেই ডাক্তারদের পরাজয়। পরাজিত মানুষেরা কখনো গুছিয়ে কিছু বলতে পারে না। ওসমান সাহেব। বললেন, আপনি কী আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারেন?
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। আসুন স্যার আমার সঙ্গে?
আমাকে স্যার বলছেন কেন?
ডাক্তার সাহেব হেসে ফেললেন। হাসি মুখেই বললেন, আপনি আমার কাছে অনেক বড় ব্যক্তি। আপনার প্রায় লেখাই আমি দুতিনবার পড়েছি।
ওসমান সাহেব কিছু বললেন না। ডাক্তার সাহেব বললেন, আমার সৌভাগ্য আপনার সঙ্গে দেখা হল। আমার অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার আছে আপনাকে।
জিজ্ঞেস করুন।
আজ না অন্য একদিন।
ডাক্তারের ঘরটি ছোটখাটো কিন্তু বেশ সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে সূর্যাস্তের একটা জল রঙ ছবি পর্যন্ত আছে। ফুলদানীতে কিছু প্লাস্টিকের ফুল। এটা চোখে লাগে। প্লাস্টিক দিয়ে ফুল বানানোর বুদ্ধি মানুষকে কে দিল কে জানে।
চায়ের কথা বলে এসেছি আপনি স্যার আরাম করে বসুন।
আরাম করেই বসেছি।
তিনি ঘড়ি দেখলেন। ঘড়ি বোধ হয় বন্ধই হয়ে আছে, এখনো আটটা বাজে।
কটা বাজে বলতে পারবেন ডাক্তার সাহেব?
আটটা।
তাই নাকি?
জি। আটটা বাজে দুমিনিট হবে। আমার ঘড়ি একটু স্লো।
ওসমান সাহেব হঠাৎ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী একটা জিনিস লক্ষ্য করছেন, মৃত্যু প্রসঙ্গ আমি মোটামুটি এড়িয়ে গেছি। আমার উপন্যাসগুলির কোনোটিতে মৃত্যু বিষয়ক কোন বর্ণনা নেই।
এটা তো স্যার ঠিক বললেন না। আপনার অন্য দিন উপন্যাসের মৃত্যুর দীর্ঘ বর্ণনা আছে। চমৎকার বর্ণনা। মা মারা যাচ্ছে। তার ছোট ছেলে ও বড় মেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ছেলেটির বয়স পাঁচ বছর, বড় মেয়েটির বয়স দশ বছর। শীতের রাত।
তিনি চমকে উঠলেন। তাঁর মনে ছিল না। এই দৃশ্যটি তিনি ব্যবহার করেছেন। ডাক্তার সাহেব বললেন, স্যার বর্ণনা এত আন্তরিক যেন মনে হয় লেখকের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটেছে।
ওসমান সাহেব ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, চোখের সামনেই ঘটেছে। ছোট ছেলেটি হচ্ছি। আমি আর বড় মেয়েটি আমার বোন। ওর নাম ছিল নীলাঞ্জনা। খুব কাব্যিক নাম। আমার মায়ের রাখা; ও মারা যায় এগারো বছর বয়সে।
বলতে বলতে তার গলা ধরে এল। দীর্ঘদিন পর তার চোখ ভিজে উঠল। মানুষের দুঃখগুলি কোথায় লুকানো থাকে?
চা নিন স্যার। চিনি হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে।
আপনার বোধ হয় সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। সিগারেট আনিয়ে দেই?
দিন। আপনার নামটা ভুলে গেছি। কী নাম বলেছিলেন যেন?
নাজমুল। নাজমুল হক।
নাজমুল সাহেব, চায়ের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি কী এখন কাইন্ডলি দেখবেন আমার বাবার ডেডবডি নেবার ব্যাপারে ওরা কত দূর কী করেছে। উনি একুশ নম্বর বেডে ছিলেন।
ডাক্তার সাহেব বের হয়ে গেলেন। ওসমান সাহেব। ঘড়ি দেখলেন। সাড়ে আট। সময় সত্যিচ সত্যি থেমে গেছে। আইনস্টাইন সাহেবের থিওরি অব রিলেটিভিটি। কোথায় যেন পড়েছিলেন। ফাসির আসামির কাছে সময় শ্লথ হয়ে যায়। এক এক মিনিট ও তাদের কাছে মনে হয অনন্তকাল। সেই হিসেবে এরাই সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মানুষ।
