কেন কর?
যাতে ও আমাকে ভালবাসে।
মিলি আবার হেসে ফেলল। আদুরে গলায় বলল, আমার শুধু ভালবাসা পেতে ইচ্ছা করে।
রানু বলল, সে তো সবারই করে। মিলি শান্ত স্বরে বলল, না। সবার করে না। যেমন তুমি, তোমার কী করে?
রানু জবাব দিল না।
ভাবী, এখন বিদেয় হচ্ছি। বক বক করে সবার মাথা ধরিয়ে দিয়েছি। পাগল মানুষ, কী করব বল?
একটা দুঃস্বপ্ন
রাত তিনটায় ফয়সল সাহেব একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেন। তার ইদানীং কালের স্বপ্নগুলি অস্পষ্ট কিন্তু আজ রাতের স্বপ্ন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি দেখলেন একটা প্রকাণ্ড নেকড়ের মতো জন্তু তাকে কামড়াচ্ছে। বা পায়ে কামড় দিয়ে একটুকরা মাংস সে ছিঁড়ে নিল। তিনি জেগে উঠলেন বা পায়ে তীব্র ব্যথা নিয়ে। জেগে উঠে ও তার মনে হল সত্যি সত্যি তার পা থেকে নেকড়েটা বোধ হয় ংস ছিঁড়ে নিয়েছে। মাঝে মাঝে স্বপ্ন ও সত্যের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি ভয় পাওয়া
গলায় বীথিকে ডাকতে লাগলেন। বীথি এল প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই। নরম স্বরে বলল, কী হয়েছে স্যার?
স্বপ্ন দেখেছি।
কী স্বপ্ন?
কী স্বপ্ন মনে নেই। তুমি ওসমানকে টেলিফোনে ধর দেখি।
এখন অনেক রাত স্যার।
সেটা কী আমি জানি না? তোমাকে যা করতে বলেছি কর।
বীথি টেলিফোন সেট শোবার ঘরে নিয়ে এল। ওসমান সাহেবকে পেতে দেরি হল না। বীথি অস্পষ্ট স্বরে বলল, আপনি স্যারের সঙ্গে কথা বলুন।
হ্যাঁলো ওসমান?
জি। কী ব্যাপার বাবা?
ব্যাপার কিছু না। তুই কী করছিলি?
ঘুমাচ্ছিলাম। রাত তিনটা বাজে।
রাত তিনটা বাজিলেই ঘুমাতে হবে এমন কোনো কথা নেই। রাত তিনটার সময়ও অনেকে জেগে থাকে।
তা থাকে। আপনি কিছু বলবেন?
হ্যাঁ বলব। আমি এই বাড়িটা বীথির নামে দানপত্র করতে চাই।
করতে চান করুন।
তা তো করবই। তোর অনুমতি লাগবে নাকি? আমি করেই রেখেছি। আলমারীতে দলিল আছে। তোকে টেলিফোন করলাম। এই জন্য যাতে পরে কোনো ঝামেলা না হয়।
কী ঝামেলা হবে?
তোর যদি মনে করে বসিস যে আমার মাথার ঠিক ছিল না। কোট-কাছারি করা শুরু করিাস।
এ সব কিছুই করব না। আপনার শরীর কী ঠিক আছে?
ফয়সল সাহেব কিছু না বলে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। বীথিকে বললেন, আমার মধ্যে যে সব খারাপ জিনিস আছে তার কোনোটাই আমার ছেলের মধ্যে নেই। ও ছোট বেলা থেকে আমাকে দেখে দেখে নিজেকে ঠিক করেছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। মানুষ উল্টোটা করে। খারাপটাই শেখে।
বীথি বলল, আপনার কী শরীর খারাপ লাগছে?
হুঁ লাগছে। তুমি একটা টেলিফোন কর এম্বুলেন্সের জন্যে। হাসপাতালে নিয়ে যাও। চেষ্টা করে দেখ আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে পার কী না।
ফয়সল সাহেব চোখ বন্ধ করে আধশোয়া হয়ে বসলেন। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধ ভিখারীর ছবিটি তার সামনে ভেসে উঠল। ভিখিরীটির সঙ্গে এবার একটি নেকড়ে আছে। নেকড়েটির মুখ হাসি হাসি। পশুরা হাসতে পারে না কথাটা ঠিক না। ছেলেবেলোয় ভালুকের খেলা দেখাতে একটি লোক এসেছিল। তার স্পষ্ট মনে আছে ভালুকটা তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। ভয়ঙ্কর একটি দৃশ্য। তিনি প্রায় রাতেই এই ভালুকটাকে স্বপ্নে দেখতেন।
ফয়সল সাহেব চোখ মেললেন। বীথি টেলিফোন করছে। কী সুন্দর লাগছে! কী চমৎকার একটি দৃশ্য।
বীথি।
জি স্যার।
পাওয়া গেছে কাউকে?
এম্বুলেন্স আসছে স্যার।
কাউকে খবর দেয়ার দরকার নেই। তুমি একাই আমাকে নিয়ে যাও।
বীথি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
ফয়সল সাহেব মারা গেলেন এম্বুলেন্সে। নিঃশব্দ মৃত্যু। বীথি তার হাত ধরে বসেছিল। সে পর্যন্ত বুঝতে পারল না। যেমন হাত ধরে ছিল তেমনি ধরে থাকল।
মিলি একাই কাঁদছে
মিলি একাই কাঁদছে।
ওসমান সাহেব লক্ষ্য করলেন বাবার মৃত্যু তাকে তেমন অভিভূত করতে পারছে না। অস্বস্তি লাগছে এই পর্যন্তই। তার মনে হল, এখন যদি কেউ বলে আপনার এখানে থাকার দরকার নেই আপনি চলে যান, তাহলে তিনি খুশিই হবেন। তার প্রচণ্ড চায়ের পিপাসা হচ্ছে।
ফয়সল সাহেবের শরীর সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। সাদা চাদর এখানে একটা রহস্যের সৃষ্টি করেছে। আড়াল মানেই রহস্যময়তা। গোল্ড রিমের চশমা পরা একজন ডাক্তার এসে বলল, আপনারা সবাই এখানে ভিড় করছেন কেন? বাইরে অপেক্ষা করেন। ডেডবডি নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেন।
মিলি চেঁচিয়ে কাঁদছে। গ্রাম্য ধরনের কান্না। বিরক্তিকর। ওসমান সাহেব মৃদু স্বরে বললেন, চুপ কর মিলি। মিলি চোখ বড় বড় করে বলল, কেন চুপ করব, কেন?
সবাইকে বিরক্ত করছিস।
বেশ করছি।
ওসমান সাহেব ডাক্তারের কাছে এগিয়ে গেলেন। যেন ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন, আমরা এক্ষুণি ডেডবডি নেবার ব্যবস্থা করব। আপনি কিছু মনে করবেন না। ডাক্তার তাকাল অবাক হয়ে।
আপনি কে?
যে মানুষটি মারা গেছেন আমি তাঁর বড় ছেলে।
ডাক্তার তাকিয়ে আছে। তার চোখে বিস্ময়। ওসমান সাহেবের মনে হল শুধু বিস্ময় নয় অভিযোগও আছে। যেন সে বলছে তুমি মৃত ব্যক্তিটির ছেলে অথচ তোমার চোখ শুকনো, তুমি দিব্যি নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছ। তোমার বোনকে বলছি… . কান্না বন্ধ করতে। এটা ঠিক না।
তিনি বারান্দায় চলে গেলেন। লম্বা বারান্দায় বহু লোকজন অপেক্ষা করছে। প্রতীক্ষা। প্রতীক্ষার মত খারাপ আর কিছুই নেই। এরা সবাই প্রতীক্ষা করছে। তিনি সিগারেট ধরালেন। ডেডবিডি নেবার ব্যবস্থা তিনি না থাকলেও হবে। এবং ভালভাবেই হবে। এর মধ্যে তার আর থাকতে ইচ্ছা! করছে না। থাকার প্রয়োজনও নেই। এ সমস্ত কাজের জন্যে প্রচুর উৎসাহী লোকজন আছে। এরা খুব আগ্রহ নিয়ে ছোটাছুটি করবে।
