না, ঝগড়া না। এমনি। ভাইয়াকে বল অন্য ঘরে ঘুমুতে। আজ সারা রাত গল্প করব আমরা দু’জন। কেমন ভাবী?
হ্যাঁ করব।
গল্প অবশ্যি করা হত না। শোয়া মাত্রই মিলি ঘুমিয়ে পড়ত। নিশ্চিন্ত ঘুম। আজ অনেক দিন পর মিলির আবার হয়ত পুরানো সখ জেগে উঠেছে। সারারাত গল্প করার কথা বলবে কিন্তু বিছানায় যাওয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়বে।
মতিয়ুর মিলিকে রেখে যেতে রাজি হল না। নিচু গলায় বলল, ওর শরীর খুবই খারাপ। ও যে কি পরিমাণ বিরক্ত করে ধারণাও করতে পারবেন না। রাতে একজন ডাক্তার এসে থাকেন। আজ সে অনেক ভাল। কতক্ষণ এরকম ভাল থাকবে বলা মুশকিল।
হঠাৎ করে এ রকম হল কেন?
হঠাৎ করে হয়নি। ধীরে ধীরে হয়েছে। আপনি অনেক দিন পর দেখছেন বলে আপনার কাছে এ রকম লাগছে।
ডাক্তার কী বলছেন?
তেমন কিছু বলছেন না। বলার মত হয়ত কিছু নেই। আমি গাড়ি রেখে যাচ্ছি, ঘণ্টাখানিক বা ঘণ্টা দু’এক পর পাঠিয়ে দেবেন।
মিলি বিছানায় শুয়ে ছিল। অপলা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। টগর অনেক দূরে বসে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। মিলি টগরের প্রতি কোনো রকম উৎসাহ দেখাল না। যেন সে টগরকে চিনতে পারছে না।
রানু বলল, তুমি কিছু খাবে মিলি?
আমি কিছুই খাব না। তুমি আমার পাশে বস।
তোমার শরীর এত খারাপ হয়েছে আমাকে কিছু বলনি কেন।
বললে তুমি কী কবতে?
মিলি ছোট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। থেমে থেমে বলল, আমার জন্যে কেউ কখনো কিছু করে না। আমার মা করেনি, আমার বাবা করেনি, তুমি কেন করবে? তুমি তো বাইরের মেয়ে। রানু কিছু বলল না। চেযার টেনে মিলির পাশে এসে বসল।
আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি। তখন একদিন বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। কারণ খুব সামান্য। মার একটা শাড়ি পরে ছাদে হাঁটছিলাম। বাবার ধারণা হল পাশের বাসার একটা ছেলের সঙ্গে খাতির জমানোর চেষ্টা করছি। তুমি আমার কথা বিশ্বাস কবছ তো ভাবী?
করছি।
আমি অবশ্যি প্রচুর মিথ্যা কথা বলি, তবে মাঝে মাঝে সত্যি কথাও বলি। আমারই হযত লেখক হওয়া উচিত ছিল কিন্তু লেখক হয়ে গেল ভাইয়া। যে তার সাবা জীবনে কোন মিথ্যা কথা বলেনি। মজার ব্যাপার, তাই না ভাবী?
মিলি তাকাল রানুর দিকে। সে হয়ত মনে মনে ভেবেছে এই জাগোযাতে বানু আপত্তি করবে। কিন্তু রানু কিছু বলল না। মিলি বলল, ভাইযা প্রসঙ্গে এই কথাটা কী আমি ঠিক বললাম ভাবী?
বোধ হয় ঠিক।
তবে আমার কী মনে হয় জান ভাবী, আমার মনে হয় সব মানুষের মিথ্যা বলাব অভ্যেস থাকা উচিত। এতে অনেক ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওযা যায়। ভাইযােব। যদি মিথ্যা বলাব অভ্যাস থাকত তাহলে আর তোমাদের এই ঝামেলা হত না।
রানু ঠাণ্ডা গলায় বলল, তোমার তো মিথ্যা বলার অভ্যাস আছে। তোমাদের খুব ঝামেলা হয় না?
হয়।
মিথ্যা কথা বলা না বলার ওপর কোনো সম্পর্ক নির্ভর করে না।
মিলি একটি নিঃশ্বাস ফেলল। অপলা বলল, আপনার বাবা আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে। দিলেন তারপর কী হল সেটা বলুন, আমার খুব শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে। রানু বিবক্ত স্বাবে বলল, ঐ সব শুনে কী হবে?
আমার শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে আপা।
মিলি হাসি মুখে বলল, ব্যাপারটা খুব কষ্টের কিন্তু এখন কেন জানি আমার হাসি লাগছে। বাবা আমাকে ছাদ থেকে ডেকে আনলেন, তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, যে ছেলেটিকে ভুলাবার জন্যে তুমি এত সাজসজ্জা করে ছাদে হাঁটাহাঁটি করছ, তার সঙ্গে চলে যাও। এই বলেই দারোযানকে গোট বন্ধ করে দিতে বললেন। আমি গেটের বাইরে হতভম্ব হয়ে দাড়িযে রইলাম। আমার গায়ে ঝলমলে একটা শাড়ি। কিন্তু পায়ে কিছু নেই। খালি পাযে ছাদে হাঁটছিলাম তো।
তার পর?
তার পরটা শুনে কী হবে? বাদ দাও। বাবার স্বভাবই ছিল এ রকম। আমাদের দুই ভাইবোনকে কি পরিমাণ কষ্ট যে দিয়েছেন। ভাইয়ার প্রথম বই যখন বের হল খুব হৈচৈ হল। অল্প দিনের মধ্যেই ভাইয়া বিখ্যাত হয়ে গেল। তখন বাবা ইংরেজিতে একটা বিশাল প্রবন্ধ লিখলেন এবং সেই প্রবন্ধে প্রমাণ করলেন যে বইটা কোনো এক ফরাসি বিখ্যাত উপন্যাসের দুর্বল অনুকরণ। মিলি শব্দ করে হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল। রানুর এই প্রথমবারের মত মনে হল মিলি বেশ অসুস্থ।
বুঝলে ভাবী, আমরা দু’জন খুব কষ্ট করেছি।
রানু কথা ঘুরাবার জন্যে বলল, তোমার মেয়ে কেমন আছে?
জানি না কেমন আছে। বোধ হয় ভালই আছে।
জান না মানে?
ও তো আমার সঙ্গে থাকে না। একেক সময় একেক জনের সঙ্গে থাকে। এখন আছে তার এক ফুপুর সঙ্গে। আমার তো মাথার ঠিক নেই। আমার সঙ্গে রাখতে ভরসা পায় না। কখন কি করে বসি। কয়েকদিন আগে আমার কাছে এনেছিল, আমি এমন ভান করলাম যেন চিনতে পারছি না। আমি মাঝে মাঝে পাগলের ভান করি এবং বেশ ভালই করি।
মিলি আবার উঁচু স্বরে হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতেই বলল, ভাবী আমি উঠব।
এখনই উঠবে?
হ্যাঁ, এসো তুমি আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দাও।
রানু বলল, টগারকে আদর করলে না? সব সময় তো আদর করতে।
এখন আমার আর ছোট বাচাকাঁচা ভাল লাগে না ভাবী। টগর যাই? অপলা যাচ্ছি কেমন?
আবার এসো।
না, আমি আর আসব না।
কেন?
মিলি হাসতে হাসতে বলল, আর আসতে ইচ্ছা করবে না। অপলা হেসে ফেলল। মিলি বলল আমার কথা তুমি বিশ্বাস করছ না, তাই না? মাঝে মাঝে আমি কিন্তু সত্যি কথা বলি।
রানু মিলিকে ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামল। মিলি বলল, আমি নিজে নিজেই নামতে পারব। আমাকে যতটা দুর্বল দেখাচ্ছে তত দুর্বল আমি না। আমি বেশ শক্ত। মাঝে মাঝে দুর্বল হবার ভান করি।
