তিনি হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতেই বললেন, দাঁড়িয়ে আছ কেন বাস। কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আমার ভাল লাগে না। দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা ঝগড়ার আর বসার ভঙ্গিটা হচ্ছে সন্ধির।
বসলেই সন্ধি হয়ে যাবে তোমার সঙ্গে? কেন অদ্ভুত কথাবার্তা বলে আমাকে ভুলাতে চাইছ? আমি অপলা নই।
ওসমান সাহেব কাগজ এগিয়ে দিলেন। রানু দেখল। শুধু দু’টি লাইনই নয় বেশ ক’টি লাইন সেখানে লেখা। বিদায় অভিশাপ পুরো কবিতাটি তার মুখস্থ। বিয়ের রাতে কী মনে করে যেন সে কবিতাটি শুনিয়েছিল। হয় তো রানুকে অভিভূত করতে চেয়েছিল। রানু কী অভিভূত হয়েছিল। রানুর মনে পড়ল না।
মিলি বসে আছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে
মিলি বসে আছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
মিলির বর এতটা আশা করেনি। তার ধারণা ছিল ডাক্তারের কাছে যাবার কথা শুনে সে রোগে উঠবে। হৈচৈ করবে। ইদানীং সে খুব হৈচৈ করছে। কিন্তু আজ সে বেশ শান্ত। সহজ সুরে পাশে বসা মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। মহিলা পান খাচ্ছেন। তিনি নিশ্চয়ই পেসেন্ট নন। কোন রোগী ডাক্তারের কাছে এসে এমন আরাম করে পান চিবোয় না। মিলি তার বরকে হাত ইশারা করে ডাকল। মতিয়ুর নড়ল না। কাছে গেলেই মিলি হয়ত চট করে রেগে যাবে। সহজ স্বাভাবিক ভাব মুহুর্তের মধ্যে মাটি হবে। মিলি নিজেই এগিয়ে এল। হাসি মুখে বলল, আমাকে একটা পান এনে দেবে? পান খেতে ইচ্ছা হচ্ছে।
ডাক্তারের কাছেও সে বেশ স্বাভাবিক রইল। মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বলল, পান খাচ্ছি বলে রাগ করছেন না তো? ডাক্তার সাহেব হাসলেন।
না, রাগ করব কেন?
আমার বড় ভাই খুলি রাগ করেন।
তাই বুঝি?
জি। কাউকে পান খেতে দেখলেই তার নাকি গরুর জাবর কাটার কথা মনে হয়। ভাইয়া এমনিতে খুব গম্ভীর। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব মজার কথা বলে? আপনি আমার ভাইকে চেনন তো?
হ্যাঁ নামে চিনি। টিভিতে একবার দেখেছিলাম। কী একটা প্রোগ্রামে যেন এসেছিলেন। টিভিতে খুব লাজুক মনে হচ্ছিল।
উনার কোনো বই পড়েছেন?
গল্পের বই পড়ার অভ্যাস আমার খুব কম।
আমারো কম। ভাইয়া আমাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছে, সেটি শেষ করতেও আমার এক মাস লেগেছে। আপনি বোধ হয়। আমার কথা বিশ্বাস করছেন না।
বিশ্বাস করব না কেন?
কেউ বিশ্বাস করে না।
মিলি হাই তুলল। সন্ধ্যাবেলার দিকে তার একবার প্রচণ্ড ঘুম পায়। তারপর বাকি রাতটা কাটে জেগে। কি কষ্ট! কি কষ্ট!
আপনার ভাইকে আপনি খুব পছন্দ করেন?
হুঁ।
আর কাকে পছন্দ করেন?
আর কাউকে না।
কাউকে না?
না। আমার এই কথাটিও আপনি বিশ্বাস করছেন না, তাই না?
বিশ্বাস করব না কেন?
আমার কেন জানি শুধু মনে হয় কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না। আমি অবশ্যি খুব মিথ্যা কথা বলি।
সে তো আমরা সবাই বলি। আমিও বলি।
মিলি খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। ডাক্তার সাহেব অপেক্ষা করতে লাগলেন। মিলি বলল,
আপনি আমার সব কথাতেই সায় দিচ্ছেন কারণ আপনার ধারণা আমি পাগল তাই আমাকে না। রাগাবার চেষ্টা করছেন।
আপনার ধারণা ঠিক নয়। আপনি একজন সুস্থ মানুষ। আপনার কথায় সুন্দর লজিক আছে। একজন মানষিক রোগীর কথাবার্তায় কোনো লজিক থাকে না। প্রায়ই ওরা বুদ্ধিমানের মত কনভারসেশন চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু লজিকে এসে আটকে যায়।
আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই পাগল।
ডাক্তার সাহেব হেসে ফেললেন। মিলিও হাসল। এই ডাক্তারটিকে তার পছন্দ হয়েছে। ক্লিনিক থেকে বেরিয়েই মিলি বলল, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। তাকিয়ে থাকতে পারছি না। মতিয়ুর বলল, বাসায় যাচ্ছি। বাসায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়বে। সে তার স্ত্রীর হাত ধরল। অনেক দিন পর সে স্ত্রীর প্রতি অন্য এক ধরনের মমতা অনুভব করছে। অসহায় শিশুর জন্য যে ধরনের মমতা অনুভব করা হয় সে ধরনের মমতা।
মিলি বলল, আমার বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে না।
বাসায় না গেলে কোথায় যাবে? রাস্তায় ঘুরবে খানিকক্ষণ? না। আমাকে ভাবীর বাসায় নিয়ে চল। অনেকদিন ভাবীকে দেখি না। তাঁকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে।
কাল সকালে গেলে হয় না?
সকালে উনাকে পাওয়া যাবে না। অফিসে চলে যান। তা ছাড়া এখন আমার যেতে ইচ্ছা! করভুসুকুম হয়ত যেতে ইচ্ছা করবে না। ভাবীর সঙ্গে আমার খুব জরুরি কথা আছে।
কী কথা?
মিলি জবাব দিল না। তার ঘুম পাচ্ছে। গাড়িতে উঠেই সে চোখ বন্ধ করে এলিয়ে পড়ল। কে জানে আজ রাতে হয়ত তার গাঢ় ঘুম হবে। জেগে জেগে রাত কাটাতে আর ভাল লাগছে না।
মতিয়ুর নরম গলায় বলল, ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে তোমার কী কথা হল?
তেমন কোনো কথা হয়নি। আমি পান খাচ্ছিলাম তো তাই দেখে উনি খুব রেগে গেলেন। রাগলেন কেন?
ভাইয়ার মত স্বভাব। ভাইয়াও তো রাগত।
বলেই মিলি হাসল। মতিয়ুর আর কিছু বলল না।
মিলিকে দেখে রানু খুবই অবাক হল।
একি অবস্থা তোমার মিলি। শরীরের এ রকম হাল কেন?
আমি পাগল হয়ে গেছি। ভাবী।
কী বলছ আবোল-তাবোল। আস, তুমি বিছানায় শুয়ে থাক। তোমার এতটা শরীর খারাপ হয়েছে আমি জানতামই না।
টগর চোখ বড় বড় করে দেখছে মিলিকে। অপলক তাকিয়ে আছে। মিলি বলল, ভাবী ওকে বল চলে যেতে, আজ রাতে আমি তোমার সঙ্গে ঘুমোব। বলেই সে লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল। এই কথাটি সে দীর্ঘদিন পরে বলল। তার বিয়ের পরও সে বেশ অনেকবার অসময়ে চলে এসেছে রানুর কাছে। লজ্জিত ভঙ্গিতে বলেছে, ভাবী আজ রাতে তোমার সঙ্গে ঘুমোব। রানু হেসে বলল, ঝগড়া কিছু করেছ?
