কোথায়?
রাস্তায় হাঁটব। শিশু পার্কের দিকেও যেতে পারি। যাবে?
টগর মাথা নাড়ল। সে যাবে কিন্তু তার মধ্যে তেমন কোনো উৎসাহ দেখা গেল না। যেন নেহায়েত মাকে খুশি করবার জন্যে রাজি হওয়া।
রাতে ঘুমুতে যাবার আগে রানু উঁকি দিলা অপলার ঘরে। সে গভীর মনযোগে খাতা খুলে দেখছে। রানুকে ঢুকতে দেখেই সে খাতা বন্ধ করে ফ্যাকাসে ভাবে হাসল। রানু লক্ষ্য করল অপলার মুখ লালচে হয়ে আছে।
তোর এখানে একটু বসি অপলা?
বস। আমার এখানে বসতে হলে আবার অনুমতি লাগবে নাকি?
অপলা নার্ভাস ভঙ্গিতে হাসল। রানু বলল, তোর ঐ খাতায় তোর দুলাভাই কী অটোগ্রাফ দিয়েছে?
হুঁ।
দেখতে পারি?
অপলা খাতা বের করল। দুলাইনের একটি লেখা হায় সখী, এত স্বৰ্গপুরী নয়। পুষ্পোপ। কীট সম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা দেখতে ভাল লাগে।
অপলা ভয়ে ভয়ে বলল, যারা অটোগ্রাফের জন্যে গিয়েছে দুলাভাই তাদের সবার খাতাতেই এ রকম সুন্দর সুন্দর লাইন লিখে দিয়েছেন।
জানি। এ রকম অসংখ্য লাইন তার মুখস্থ।
তুমি রাগ করনি তো আপা?
রাগ করব কেন?
অপলা মাথা নিচু করে বসে রইল। রানু বলল, কিন্তু তুই এমন ভাব করছিস যেন তোকে একটা প্রেমপত্র লিখে দিয়েছে। তুই এই লেখাটা কম করেও এক লক্ষ্য বার পড়েছিস; পড়িসনি।
তুমি শুধু শুধু রাগ করছ আপা।
না। রাগ করছি না। একজন লেখক তার ভক্ত পাঠিকাকে সুন্দর একটা কবিতার লাইন লিখে দিয়েছে এতে রাগ করার কিছু নেই। কিন্তু সেই পাঠিকা। যদি মনে করে এই লাইনটি তাল জন্যেই লেখা তাহলেই মুশকিল।
কী মুশকিল?
রানু বলল, তোকে একটা গল্প বলি শোেন–আমার বিয়ের পর পর একবার একটি মেয়ে তাকে চিঠি লিখল। বিবাহিতা মেয়ে। বিয়েতে ওর কিছু বই পেয়েছিল। সেই বই পড়ে আবেগে আপুত হয়ে লেখা চিঠি। ও চিঠির জবাব দিল। মেয়েটি আবার লিখল . . চমৎকার চিঠি। তারপর একদিন এল দেখা করতে। মেয়েটি দেখতে ভাল নয়। কালো বেঁটে অসম্ভব রোগা। তোর দুলাভাই ময়েটিকে দেখেই রেগে গেল। মুখ কালো করে বলল,–আমি এখন লিখছি, এখন কথা বলতে পারব না। অথচ এই মেয়েটিকে সে সুন্দর চিঠি লিখেছে, বই পাঠিয়েছে।
তারপর?
তারপর আবার কী। তোর দুলাভাই চলে গেল অন্য ঘরে। মেয়েটি ঘণ্টাখানিক বসে রইল আমি দু’একটা কথা-টথা বলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে কথা বলতে আসেনি।
দুলাভাই আর কথা বললেন না?
না। তবে মেয়েটি যদি সুন্দরী হত সে তার সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাহিত্য নিয়ে আলাপ করত। আগ্রহ নিয়ে বলত জীবন কী, জীবনের মানে কী? মেয়েটি আবার ঘুরে ঘুরে আসত।
অপলা ছোট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। রানু বলল, লোকটির মধ্যে কোনো কিছুর প্রতি কোনো মমতা নেই। মানুষের প্রতি যার মমতা নেই সে লেখক হতে পারে না। লেখকরা মানুষের কথা লেখেন। মমতা ছাড়া তাদের কথা লেখা যায় না।
কিন্তু তিনি তো লিখছেন।
ঐ সব ট্র্যাস। ডাস্টবিনে ফেলে দেবার জিনিস। যে কবিতার লাইন তোর খাতায় লিখেছে তার পেছনেও কোনো সত্য নেই। অন্যের ধার করা লাইন। তার গল্প উপন্যাসও সে রকম। তুই ঐ পাতাটি ছিঁড়ে ফেলে দে।
অপলা অবাক হয়ে বলল, কী বলছি তুমি?
ঠিকই বলছি, ছিঁড়ে ফেল।
না, ওটা আমি ছিঁড়ব না।
দে পাতাটা আমার কাছে।
অপলা খাতা দিল না। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। রানু খাতাটা হাতে নিয়ে মুহুর্তের মধ্যে ছিড়ি কুচি কুচি করে ফেলল।
আপা তুমি এ রকম করলে কেন?
ঠিকই করেছি।
না, তুমি ঠিক করনি। এটা আমার জিনিস। আমার জন্যে লেখা। এটা তুমি ছিড়তে পার না। তোমার নিজের যা আছে সে সব ছিঁড়ে ফেল। আমার গুলি কেন?
অপলা কেঁদে ফেলল। রানু বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বাইল আপলার দিকে। সে নিজেও নিজের আচরণে খুব অবাক হয়েছে। সে কেন এরকম করল? সমস্ত ব্যাপারটাই ঘটেছে আলমের জন্যে। আলম আজ না এলে এটা হত না। তার আসার কারণেই রানু, অস্থিরতায় ভুগছিল। খাতা ছিঁড়ে ফেলার পেছনে অন্য কোনো যুক্তি নেই। এমন ছেলেমানুষি একটি কাণ্ড রানু করতে পারে না।
অপলা, আই এ্যাম সরি। কিছু মনে করিস না।
আপলা টেবিলে মাথা রেখে কাঁদছে। রানু তার পিঠে হাত রাখল। হঠাৎ তার মনে হল অপলার মতো একটি মেয়ের সঙ্গে ওসমানের বিয়ে হলে বেশ হত। এই কথাটি তার কেন মনে হল
কে জানে।
ওসমান সাহেব বাথরুমে হাত-মুখ ধুচ্ছিলেন। কাল রাতে তার ভাল ঘুম হয়নি। চোখ লাল হয়ে আছে। মাথা ভার ভার। এই অবস্থাতেই তাকে বেরুতে হবে। আজ অনেকগুলি কথা বলবেন। কলেজে যাবেন। প্রিন্সিপ্যালকে বলবেন মাস্টারি। আর করব না। আমি অসুস্থ। মাস্টারিতে মন বসছে না। রানুর কাছে যাবেন। রানুকে বলবেন বেশ কিছু দিনের জন্য তিনি গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। নবীর কাছে যেতে হবে। নবী। খবর পাঠিয়েছে খুব দরকার।
ওসমান সাহেব বাথরুম থেকে বেরিয়েই দেখলেন রানু এসেছে। সকাল সাতটায় হঠাৎ তার আসার কোনো কারণ নেই।
কী ব্যাপার রানু?
রানু সহজ স্বরে বলল, তুমি একটা কাগজে লিখে দাও–হায় সখা এত স্বৰ্গপুরি নয়। পুষ্পে কীট সম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়। তারপর নাম সই কর।
কেন?
দরকার আছে। এই নাও কাগজ।
ওসমান সাহেব লিখতে বসলেন।
লিখতে লিখতে বললেন, তুমি কেমন আছ রানু? রানু কিছু বলল না। ওসমান সাহেব বললেন, বাবার শরীর খারাপ হয়েছে। বেশ খারাপ।
তাতে তো তোমার কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়। অন্যের অসুখ-বিসুখে তোমার কিছু যায় আসে না। তোমার উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা সুখে থাকলেই হল। ওরা সুখে আছে তো?
