আই এ্যাম সরি।
আলম শীতল স্বরে বলল, তুমি ইচ্ছা করে এতটা দেরি করলে। আমার মনে হয় তুমি আমাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছি।
এড়িয়ে যাবার চেষ্টা কর কেন?
আমি জানি না কেন? কিন্তু তুমি করছি। এটা অবশ্যি নতুন না, প্রায়ই তুমি এরকম কর। কর না? বল কর, কি কর না?
আমরা সবাই কখনো কখনো প্ৰিয়জনদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আমি যেমন করি তুমিও তেমন কর। ঠিক না?
আলম জবাব দিল না। রুমাল বের করে মুখ মুছল। এটা তার বিদায় নেবার লক্ষণ। উঠবার সময় হলেই সে রুমাল বের করে মুখ মোছে। চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে নেয়। অভ্যাসটা মেয়েলি। পুরুষ মানুষের চেহারা সম্পর্কে এতটা সচেতন হওয়া ঠিক না।
আলম বলল, আমি উঠছি।
এখনই উঠবে কি? বাস চা খাও।
সে হ্যাঁ না কিছুই বলল না। যেভাবে বসেছিল সেভাবেই বসে রইল।
রানু চা বানাতে চলে গেল। অপলা এসে ঢুকল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। পাঁচটা বেজে গেছে নাকি? অপলা আসে। পাঁচটার দিকে।
আলম ভাই কেমন আছেন?
ভাল।
এমন মুখ কালো করে রেখেছেন কেন? আপার সঙ্গে ঝগড়া-টগাড়া হয়েছে নাকি?
না।
দারুণ একটা খবর আছে দাঁড়ান বলছি। ভেরি এ্যাকসাইটিং। অপলা রূঢ়া ঘরে চলে গেল।
তোমার অফিস কেমন হল আপা?
ভাল।
টগর ফেরেনি এখনো?
না।
দারুণ একটা ব্যাপার হয়েছে আপা।
রানু কোনো রকম উৎসাহ দেখাল না। আপলা প্রায়ই দারুণ খবর ধলে। যে সব খবর বলে সেগুলি খুবই হালকা ব্যাপার।
আজ আমাদের কলেজে নবীন বরণ উৎসব হল। দু’জন বিখ্যাত লেখককে আনা হয়েছিল। একজন হচ্ছেন…আন্দাজ করত কে?
রানু জবাব দিল না।
দুলাভাই। চমৎকার একটা বক্তৃতা দিলেন। এমন সব হাসির কথা বলতে লাগলেন আমরা হাসতে হাসতে বাচি না। দুলাভাই যে এমন হাসাতে পারেন জানতাম না। সাধারণ সব গল্প এমন অন্য রকম করে বলতে লাগলেন একটা গল্প হচ্ছে একজন ভূতের গল্পের লেখককে নিয়ে। ভদ্রলোক একদিন দুপুরবেলা গল্প লিখতে বসেছে…
বলতে হবে না। গল্পটা আমি জানি। তুই বসার ঘরে চা-টা দিয়ে আয়।
গল্পটা শেষ করে যাই এক মিনিট লাগবে।
শেষ করার দরকার নেই।
অপলা থেমে থেমে বলল, দুলাভাই লোকটিকে তুমি পছন্দ না করতে পার কিন্তু তার গল্পগুলি তো ভাল। গল্প তো কোনো দোষ করেনি?
রানু উত্তর না দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। অপলা চা দিতে গিয়ে গল্প শুরু করেছে। হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে
বুঝলেন আলম ভাই, আমি তো ভাবিনি দুলাভাইকে দেখব। আমি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলাম। বহু কষ্টে সামলেছি। অনুষ্ঠান শেষে অটোগ্রাফ নেবার জন্য ঠেলা ঠেলি পড়ে গেল। আমিও অচেনা মেয়ের মত খাতাটা বাড়িয়ে দিয়েছি। তারপর কী হয়েছে শোনেন…
আলমের কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। সে নিশ্চয়ই থমথমে মুখে বসে আছে।
বাড়ির সামনে রিকশা এসে থেমেছে। একজন অপরিচিত লোক টগরকে কোলে কবে নামছে রিকশা থেকে। কার না। কার হাতে ছেলেকে পাঠিযে দিয়েছেন খালা। রানু, টগরের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। টগর তাকাল। হাসল না, হাত নাড়ল না, কিছুই করল না। কী যে অদ্ভুত হচ্ছে ছেলেটা। সমস্ত দিন মাকে দেখেনি। কিন্তু সে নির্বিকার; যেন মাকে সারাদিন দেখতে না পাওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা।
বসার ঘরে অপলা একাই কথা বলে যাচ্ছে। আর তার উচ্ছাস এবং আবেগ দুইই খুব উঁচু তারে বাধা। দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে এটাই কী উচ্ছাসের মূল কারণ?
আলম ভাই এই গল্পটা শোনেন। একজন লেখক শুধু ভূতের গল্প লেখেন। একদিন দুপুর বেলায়…
আপলা তোমার গল্পটা অন্যদিন শুনব। আজ আমার একটা কাজ আছে আমি উঠব।
এক মিনিট লাগবে। বসুন না।
প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। অন্য একদিন শুনব।
বসুন আপাকে ডাকি।
না থাক, ওকে ডাকতে হবে না।
আলম ভাই আপনাদের কী রাগারগি হয়েছে?
না না কিছুই হয়নি।
আলম ঘর থেকে বের হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টগর ঢুকাল। অপলা ব্যস্ত হয়ে পড়ল টগরকে নিয়ে।
এই টগর আজ কী হয়েছে বলত?
কী হয়েছে?
আমাদের ফাংশনে একজন বিখ্যাত লোক এসেছিলেন। সেই লোকটি লম্বা। চোখে কাল চশমা। বল তো লোকটি কে?
বাবা?
হুঁ। যা কাণ্ড হয়েছে না।
কী হয়েছে?
রানু বসার ঘরে ঢুকে দেখল টগর অপলার কোলে বসে আছে। মাকে ঢুকতে দেখে লাজুক ভঙ্গিতে হাসল।
কেমন ছিলে সাংবাদিন, টগর?
ভাল।
সারাদিন বাসাতেই ছিলে না। অন্য কোথাও গিয়েছিলে?
টগর সে কথার জবাব দিল না। মুখটিপে হাসল। যেন এটি একটি অপ্রয়োজনীয় কথা, এর জবাব দেবার দরকার নেই। বাবার কিছু কিছু স্বভাব সে পেয়ে যাচ্ছে। যে সব প্রশ্নের জবাব দেবার সে কোনো প্রয়োজন মনে করবে না সে সব প্রশ্নের সে জবাব দেবে না। রানু সব সময় ভাবত টগরের বাবা এটা অন্যদের ভাগিয়ে দেবার জন্যে করে থাকে। এখন মনে হয় না। এখন মনে হয়, এটা তার স্বভাব। রানু বলল,
টগর, দুপুরে কী দিয়ে ভাত খেয়েছ?
টগর এই প্রশ্নটিরও জবাব দিল না। সম্ভবত এটাও তার কাছে একটি অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। সে অপলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বলল। রানু শীতল স্বরে জিজ্ঞেস করল, কী বলছ টগর? টগর চুপ করে রইল। অপলা হাসি মুখে বলল, দুলাভাই আমাদের ফাংশনে কী বললেন তাই জানতে চাচ্ছে।
এটা ফিসফিস করে বলার দরকার কী?
হয়ত ভাবছে তুমি রেগে যাবে।
আমি রেগে যাব কেন?
না রাগলেও বিরক্ত হবে। তার কথা উঠলেই তুমি নীরব হও। হও না?
রানু লক্ষ্য করল অপলা কাটা কাটা জবাব দিচ্ছে। তার গলার স্বর তীক্ষু। যেন সে একটা ঝগড়া বাঁধাতে চায়। রাগিয়ে দিতে চায় রানুকে। টগর অপলার গলা জড়িয়ে ধরে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। রানু সহজ স্বরে বলল, যাও টগর, হাত-মুখ ধুয়ে আসা। আমি তোমাকে নিয়ে হাঁটতে যাব।
