বীথি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকাল। সাদা একটা শাড়ি গায়ে। লাল একটা শাল ছড়িয়ে দিয়েছে শাড়ির উপর। শালের উপর মাথার ঘন কালো চুল এলিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য এই সব দৃশ্য তিনি আর বেশি দিন দেখবেন না। একজন অচেনা-অজানা যুবক এই মেয়েটির হাত ধরে ছাদে হাঁটাহাঁটি করবে। অসহ্য। ফয়সল সাহেবের মুখে যন্ত্রণার ছাপ পড়ল।
তিনি মুখ কুঁচকে ফেললেন। বীথি ক্ষীণ স্বরে বলল, স্যার আমাকে ডেকেছিলেন?
হুঁ।
কী জন্যে?
এখন সকাল না। সন্ধ্যা?
বীথি বিস্মিত হয়ে বলল, সন্ধ্যা।
সন্ধ্যা হলে আলো নেই কেন?
বারান্দার বাতিটা জ্বালিয়ে দেব?
দরকার নেই, তুমি বস আমার পাশে।
বীথি বসল।
এত দূরে বসছ কেন? নাকি বুড়ো মানুষদের কাছে বসতে ভাল লাগে না? চেয়ারটা টেনে আরো কাছে নিয়ে এসো।
বীথি চেয়ার টানল। ফয়সল সাহেব বীথির ডান হাতের উপর নিজের হাত রাখলেন। বীথির কোনো রকম ভাবান্তর হল না। যে ভাবে বসেছিল ঠিক সে ভাবেই বসে রইল।
বীথি!
জি।
আমি এই বাড়িটা তোমার নামে লিখে দিয়ে যাব।
বীথি কিছু বলল না। ফয়সল সাহেব বললেন,
বার কাঠা জমির উপর বাড়ি। জমির ভ্যালুয়েশনই হবে তোমার বিশ লাখ টাকা। বাড়ির দাম আর ধরলাম না। কি কথা বলছি না কেন?
বীথি শান্ত স্বরে বলল, চা খাবেন স্যার? চা নিয়ে আসি?
না চা আনতে হবে না। বসে থাক চুপচাপ। হাত ধরে আছি বলে কী তোমার খারাপ লাগছে?
জি না স্যার।
ফয়সল সাহেব বীথির ফর্সা হাতের দিকে তাকালেন। কি ফর্সা হাত! কি নরম! এই কোমল পেলাব হাতের উপর তার হাতটাকে কি কুৎসিত দেখাচ্ছে। তার বুকের ভেতর একটি নিঃশ্বাস পাক খেতে লাগল। ভোগ করবার কত কি আছে পৃথিবীতে কিন্তু সময় এত অল্প। কিছুই ভোগ করা যায় না। সময় এত কম।
বীথি।
জি স্যার।
বাড়ি টা তোমাকে দান করে যাব। বুঝতে পারছ?
অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, বাতি জ্বেলে দেই?
বীথি উঠে গিয়ে বাতি জ্বালাল। এই মেয়েটি আরো সুন্দর হয়েছে। ঘন কালো চোখ; এত কালো চোখ হয় মেয়েদের?
বীথি।
জি।
চোখে কাজল দিয়েছ নাকি?
জি না।
তুমি যাচ্ছ কোথায়?
আপনার জন্যে কিছু খাবার নিয়ে আসি।
কিছু আনতে হবে না। যেখানে বসেছিলে সেখানে বসে থাক।
বীথি এসে বসল। ফয়সল সাহেব। আবার তার হাত তুলে নিলেন। সময় ফুরিয়ে আসছে। নখদন্ত নিয়ে অপেক্ষা করছে কুৎসিত মৃত্যু! সে তার অন্ধ চোখে তাকিয়ে আছে বারান্দার দিকে।
ফয়সল সাহেবের ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে লাগল। বৃক্ষ বার বার তার যৌবন ফিরে পায়। প্রতি বসন্তে নতুন পাতা আসে তার গায়ে কিন্তু মানুষের যৌবন আসে একবার। কোথায় পড়েছেন এটা? কার লেখা? ওসমানের কোন বইতেই কি পড়েছেন? এমন একটি চমৎকার কথা তার অপদার্থ ছেলে কি করে লিখবে? নিশ্চয় অন্য কেউ লিখেছে। আজকাল কিছু মনে থাকে না।
বীথি।
জি।
ওসমানকে একটা টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করত ‘বৃক্ষ বার বার তার যৌবন ফিরে পায়’ এই কথাটা সে তার কোন বইয়ে লিখেছে কিনা।
লিখেছেন। বইটির নাম হচ্ছে….
থাক নামের দরকার নেই; তুমি যাও বাতিটা নিভিয়ে দাও। আলো চোখে লাগছে।
বীথি আলো নিভিয়ে দিল।
রানু আজ একটু সকাল সকাল
রানু আজ একটু সকাল সকাল অফিস থেকে এসেছে। টগরকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাবে। দিন দিন এমন রোগা হয়ে যাচ্ছে কেন সে? ভিটামিন টিটামিন কিছু খাওয়ানো দরকার।
বাসায় ঢুকতে গিয়ে সে চমকে গেল। বসার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। সিগারেটের গন্ধ আসছে। অথচ তালাবদ্ধ থাকার কথা। অপলা কলেজ থেকে ফিরবে। পাঁচটায। টগর খালার কাছে। অসময়ে তালা খুলে ঘরে বসে থাকবে কে?
আলম বসেছিল। রানুকে দেখে সে ফ্যাকাশেভাবে হাসল। রানু বলল, ঘরে ঢুকলে কি ভাবে?
নিচ থেকে চাবি এনে খুলেছি।
ভাল করেছ। কেমন আছ তুমি?
আলম জবাব দিল না। তার ফর্সা গাল ঈষৎ লাল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তাকে নার্ভাস প্রকৃতির মানুষ বলা যাবে না। কিন্তু আজ তাকে নার্ভাস লাগছে। রানু অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। একজন নার্ভাস মানুষ হঠাৎ অস্বাভাবিক কিছু করে বসতে পারে। রানু বেশ সহজভাবেই বলল, তুমি বস, আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি।
আলম কিছু বলল না। আরেকটি সিগারেট ধরাল। রানু বলল, চা-টা কিছু খাবে?
না। পানি খাব। এক গ্রাস পানি দাও।
রানু পানি দিয়ে গেল। আলম একটি চুমুক দিয়েই গ্লাস নামিয়ে রাখল। বিস্বাদ কিছু মুখে দিলে মানুষের চোখ-মুখ যেভাবে বিকৃত হয় তার চোখ মুখও সে রকম হয়েছে। আলম বলল, একটু তাড়াতাড়ি আসবে রানু।
তোমার কী কোন তাড়া আছে?
না।
তাহলে বস। আমার দেরি হবে না।
রানু দেরি করতে লাগল। ঠিক এই মুহূর্তে আলমের সামনে বসে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে না। সব সময় সব কিছু ভাল লাগে না। আলম একটি চমৎকার ছেলে। তার সঙ্গে গল্প করতে রানুর ভাল লাগে। কিন্তু আজ কেন জানি ইচ্ছা করছে না।
রানু অনেকখানি সময় নিয়ে গোসল করল। বালতিতে ভেজা কাপড় ছিল সেগুলি ধুয়ে ফেলল। কাজটা উল্টা করা হল। কাপড়গুলি আগে ধোয়া উচিত ছিল। সে দ্বিতীয়বার গায়ে পানি ঢালতে লাগল। তার মধ্যে কি শুচি বায়ুর কোন লক্ষণ দেখা দিচ্ছে? সম্ভবত দিচ্ছে। বাইরে কোথাও গেলেই সমস্ত শরীর নোংরা মনে হয়। এসব আগে ছিল না। নতুন দেখা দিয়েছে।
আলম গম্ভীর মুখে বসে আছে চেয়ারে। বসার ভঙ্গি রাগী রাগী! রানু ঘরে ঢুকেই বলল, দেরি করে ফেললাম তাই না?
হ্যাঁ তা করেছি। ঠিক এক ঘণ্টা ছ’মিনিট দেরি করেছ।
