আমার রাঁধতে ইচ্ছা হচ্ছে না। অন্য কেউ রাঁধুক।
তুমি কি করবে?
আমি ভাইয়ার সঙ্গে গল্প করব। তুমি কাউকে বল। কিংবা হোটেল থেকে কিছু আনিয়ে নাও।
মতিয়ুর চলে গেল। তার মুখ থম থম করছে। ঘরে রান্না-বান্না করার কেউ হয়ত নেই। খুব সহজেই মিলি হোটেলের প্রসঙ্গ এনেছে তার মানে এরা প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার অ্যানিয়ে নেয়। কিন্তু ওর শাশুড়ি তো এখানে থাকেন। তিনি থাকতে হোটেলের খাবার আসর্বে এ বাড়িতে?
ভাইয়া তুমি কি মাকে কখনো স্বপ্নে দেখ।
ওসমান সাহেব ভেবে পেলেন না হঠাৎ মা-র প্রসঙ্গ কেন এল। মিলি কি এলোমেলোভাবে চিন্তা করতে শুরু করছে। তিনি মিলির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। মিলি হালকাভাবে বলল,
আমি প্রায়ই দেখি। রোজ রাতে দেখি। কাল ও দেখেছি।
কি দেখি।
দেখি মা খুব লজ্জিত ভঙ্গিতে আমার কাছে এসে দাঁড়ান। অস্পষ্ট স্বরে বলেন, ভুল হয়ে গেছে মিলি, কিছু মনে করিস না। তখন আমি তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করতে শুরু করি।
কি নিয়ে ঝগড়া?
জানি না কি নিয়ে। মা এত ভাল মানুষ ছিলেন তার সঙ্গে আমি ঝগড়ার স্বপ্ন কেন দেখব?
স্বপ্ন স্বপ্নাই।
না, স্বপ্ন স্বপ্ন না। স্বপ্নের অনেক মানে আছে।
মিলি কাঁদতে শুরু করল। তিনি কি বলবেন ভেবে পেলেন না।
কান্না থামা মিলি।
মিলি সঙ্গে সঙ্গে কান্না থামাল। ওসমান সাহেব বললেন, আমি কিছু দিন আমাদের গ্রামের বাডিতে গিয়ে থাকব।
কেন?
এমনি।
কোনো বিশেষ কারণ নেই।
আমি ও তোমার সঙ্গে যাব ভাইয়া।
একা থাকার জন্যে যাচ্ছি। দলবল এসে গেলে তো আর থাকা যাবে না।
এখানে তো একাই থাকতে।
তা ঠিক।
গ্রাম এবং শহর বেশ কমটা কি হচ্ছে?
ওসমান সাহেব মৃদু স্বরে বললেন, অনেক দিন থেকে কিছু লিখতে পারছি না। পরিবেশ বদলে দেখতে চাই লাভ হয় কি না।
তোমার রান্না-বান্না করে দেবে কে?
লোকজন পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই।
যাবে কবে?
কাল।
রানু ভাবী জানে?
না।
মিলি খানিক্ষণ ইতস্তত করে বলল, গতকাল রানু ভাবী আর আলম ছেলেটিকে দেখলাম রিকশা করে যাচ্ছে। হাত ধরাধরি করে দু’জন বসে আছে। ওসমান সাহেব হেসে ফেললেন। মিলি বিরক্তি স্বরে বলল, হাসছ কেন?
এমনি হাসছি।
মিলির কোনো ভাবান্তর হল না। ওসমান সাহেব বললেন, কাউকে দিয়ে সিগারেট আনিয়ে দে। সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। মিলি উঠল না। যেভাবে বসেছিল। সেভাবেই বসে রইল। যেন তার কথা শুনতে পায়নি।
মিলি।
বল।
মতিয়ুরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। সে তোকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায়।
জানি, পাগলের ডাক্তার। তোমার কী মনে হয় আমি পাগল?
না, পাগল হবি কেন?
আমাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বলছি আসলে তোমার নিজেরও ধারণা আমি পাগল। তা না হলে ডাক্তারের কথা তুলতে না।
তুই এত সুন্দর লজিক বের করেছিস। এরপর তোকে পাগল বলবে কে?
বলে, সবাই বলে। আমার শাশুড়ি এখন আমাকে দেখে এমন ভয় পান, আমি ঘরে ঢুকলেই চমকে ওঠেন। পাগলকে মানুষ যেমন ভয় পায় সে রকম আর কি!
বলতে বলতে মিলি খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। সে হাসি আর কিছুতেই থামে না। ওসমান সাহেব অবাক হয়ে মিলির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সম্পূর্ণ অপ্রকৃতস্থ একজন মানুষের হাসি। মতিয়ুর ঘরে ঢুকে ধমক দিল, আবার কি শুরু করেছ? মিলির হাসি থেমে গেল। সে থমথমে গলায় বলল, আমি হাসতেও পারব না?
তুমি রান্না ঘরে যাও তো মিলি।
না, আমি রান্না ঘরে যাব না। এখানেই থাকব। এবং ভাইয়াকে সব কথা বলে দেব আমি। ভাইয়া শোন ও এখন আমাকে ঘর থেকে বেরুতে দেয় না। গোটে তালা দিয়ে রাখে। কাউকে টেলিফোনও করতে দেয় না। টেলিফোনের মাউথ পিস খুলে রেখেছে। সে যখন কাউকে টেলিফোন করতে চায় তখন মাউথ পিস লাগায়।
মিলি তুমি রান্না ঘরে যাও তো।
না, আমি যাব না। কি করবে তুমি? মারবে আমাকে? বেশ তো মার।
ওসমান সাহেব মৃদু স্বরে বললেন, ক্ষিধে লেগেছে মিলি, খাওয়ার ব্যবস্থা কর। মিলি শান্ত মেয়ের মত সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। হাসি মুখে বলল, দশ মিনিটের মধ্যে খাবার দেব। সে ছুটে বেরিয়ে গেল। ওসমান সাহেব মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলেন, আর সামনে মতিয়ুর রহমান বসে আছেন। দুজনের কারুর মুখেই কোন কথা নেই।
মিলিদের বাড়ি থেকে তিনি বের হলেন সন্ধ্যার পর। রিকশাওয়ালাকে বললেন, আমি কোথাও যাব না। শহরেই খানিকটা ঘুরব। তোমার যে দিকে যেতে ইচ্ছা করে সেদিকে যাও।
রিকশাওয়ালা ইতস্তত করছে। মন ঠিক নেই এমন কাউকে রিকশায় তুলতে তার হয়ত দ্বিধা আছে।
ঘুমের রুটিনে অদল-বদল হয়ে গেছে
আজকাল ফয়সল সাহেবের ঘুমের রুটিনে অদল-বদল হয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন। বেশ গাঢ় ঘুম। সেই ঘুমের স্থায়িত্ব কম। জেগে উঠেন মিনিট পাচেকের মধ্যে এবং জেগেই নিজের ওপর রেগে যান। ভয়ঙ্কর রাগ। কেন দীর্ঘদিনের এই ক্রীতদাস শরীর। তার কথা শুনবে না। মৃত্যু কি এসে যাচ্ছে? সে কি অপেক্ষা করছে বাইরে। দেখতে সে কেমন? ফয়সল সাহেবের মনে হল সে দেখতে অন্ধ ভিখারীদের মত। নোংরা পূতিগন্ধময় তার পোশাক। হাতে লম্বা লম্বা কালো নখ। সমস্ত গায়ে কুণ্ঠ–রোগীর ঘা। সেই ঘা থেকে লালাভ রস ঝরছে।
আজও ফয়সল সাহেব নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ নিয়ে জেগে উঠলেন। ঘড়ি দেখলেন সন্ধ্যা ছটা। হঠাৎ তার খটকা লাগল সন্ধ্যা না। সকোল? তার মাথা দুলতে লাগল। সময়ের জ্ঞান কি চলে যাচ্ছে? এ কেমন কথা? তিনি ভয় পাওয়া গলায় ডাকলেন, বীথি। বীথি!
