কেন?
যেতে ইচ্ছে করছে না। অন্য একদিন আসব।
না না, এসব কি, চলুন। আপা অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে।
আমার জন্যে অপেক্ষা করছে না। নাও, টগারকে কোলে নাও! ও ঘুমিয়ে পড়ছে।
অপলা টগরকে কোলে নিল।
ওর শরীর মনে হয় পুরোপুরি সারেনি। কেমন চটকরে ঘুমিয়ে পড়ল।
ও কোলে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ে।
তিনি বললেন, অপলা আমি যাচ্ছি। আপলা বিস্মিত হয়ে বলল, আপনার কী হয়েছে দুলাভাই?
কিছু হয়নি। আমি লিখতে পারছি না।
লিখতে না পারা কি খুব কষ্টের?
হ্যাঁ, খুব কষ্টের। আচ্ছা যাই।
দুলাভাই, প্লিজ আপনি রানু আপার সঙ্গে দেখা করে যান। আপনার পাযে পড়ি। আমার একটা কথা রাখুন।
তিনি বড়ই অবাক হলেন। মেয়েটির গলায় এত কাতরতা কেন?
আসুন দুলাভাই।
তিনি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করলেন। হঠাৎ তার বড় ক্লান্তি লাগল। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি কখনোই কিছু করতে পারেন না। মনের ওপর অসম্ভব চাপ পড়ে।
রানু বেশ সহজ স্বাভাবিকভাবেই কথা-টথা বলল। ওসমান সাহেব জানতে পারলেন সে শিগগিরই এ বাড়ি ছেড়ে দেবে। অফিসের কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাট নেবে।
তুমি দেখো তো, তোমার চোখে কোন খালি বাড়ি পড়ে কি না। তুমি তো হেঁটেই বেড়াও। নাকি এখন আর হাঁট না?
হাঁটি। এখনো হাঁটি। বাড়ি চোখে পড়লে তোমাকে বলব।
তিনি উঠে পড়লেন। রানু সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে হঠাৎ করে বলল, মিলিকে একজন ভাল ডাক্তার-টোক্তার দেখানো উচিত। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, কেন?
আমার মনে হয় ও অসুস্থ।
কি রকম অসুস্থ?
বুঝতে পারছি না। ওকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও। ওর স্বামীর সঙ্গে কথা বল।
বলব।
তুমি তো যাও না। ওদের বাসায়। যাও একদিন। ওর স্বামীকে বুঝিয়ে বল।
ওসমান সাহেবের বেশ মন খারাপ হল। রিকশায় উঠে তিনি মিলির মেয়েটির জন্যে তিন অক্ষরের একটি নাম ভাবতে লাগলেন। যার শুরু হবে মা দিয়ে। এবং এমন একটি নাম যা আগে কেউ রাখেনি।
প্রথমেই যে নামটি মনে হল সেটা হচ্ছে ময়ূর। ময়ূর নাম কেউ কি আগে রেখেছে? পাখিদের নামে প্রচুর নাম আছে দোয়েল, ময়না কিন্তু ময়ুরের নাম কেউ রাখেনি। অথচ কি চমৎকার একটি পাখি। নাম রাখার ব্যাপারে খুব সূক্ষ্মভাবে হলেও কোন এক ধরনের সাইকোলজি কাজ করে। ফলের নামে আমরা রাখি আপেল, বেদানা, কমলা কিন্তু আম দিয়ে কারুর নাম নেই। এর কারণ কি? ওসমান সাহেব শব্দ করে হেসে উঠলেন। রিকশা-ওয়ালা চমকে পেছন ফিরে তোকাল। বোধ হয় তাকে পাগল ভাবছে। মিলির কাছে এখন আর যেতে ইচ্ছে করছে না। কাল যাওয়া যাবে।
মিলি বাসায় ছিল না
সকাল ন’টা।
এ সময় সাধাবণত সবাইকে ঘরে পাওয়া যায।
মিলি বাসায় ছিল না। মিলির বর মতিয়ুর রহমান ছিল। এই ছেলেটিকে ওসমান সাহেব পছন্দ কলেন। অথচ সে ঠিক পছন্দ করার মত মানুষ নয়। উদ্ধত প্রকৃতির মানুষ! হিসেবী ও বৈষয়িক। তবু তাকে ভাল লাগে। কেন? চেহারার জন্যে নিশ্চযই নয়। মতিয়ুর রহমানের চেহারা ভাল নয়। গ্রাম্যভাব আছে। ওসমান সাহেবকে দেখে মতিয়ুর রহমান খুবই অবাক হল। অতিরিক্ত বকমের ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ভাই সাহেব কেমন আছেন?
ভাল।
হঠাৎ এদিকে?
এমনি এলাম। তেমন কারণ নেই। মিলি কোথায?
মিলি ডাক্তারেব কাছে গেছে। এখনি চলে আসবে।
ঠিক আছে, আমি বসছি। মিলির সঙ্গে দেখা হয় না। অনেক দিন। ও আছে কেমন?
ভালই আছে। অবশ্যি সব সময কমপ্লেইন করে ঘুম হয় না। আমি কিন্তু দেখি ঠিকই ঘুমাচ্ছে।
ওষুধ খেয়ে ঘুমায়?
না। এমনিতেই ঘুমায।
একজন সাইকিযাটিস্ট দেখালে কেমন হয?
সাইকিয়াট্রিস্ট?
হ্যাঁ। ও বোধ হয় ঠিক সুস্থ না।
মতিয়ুর অনেক্ষণ চুপ করে থেকে অপ্রাসঙ্গিকভাবেই বলল,
ভাই সাহেব, আপনি কী আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে চারটা ডাল-ভাত খাবেন।
খাব। আমি বিকেল পর্যন্ত থাকব। এখানে। মিলি আসবে কখন?
আমি ওকে আনার জন্যে লোক পাঠাচ্ছি।
লোক পাঠানোর দরকার নেই। ও আসুক। ধীরে-সুস্থে।
ডাক্তারের কাছে অন্য সমযও যেতে পারবে। এখন এসে আপনার জন্য নিজের হাতে বান্নাবান্না করুক। খুব খুশি হবে। আপনি কি হাত-মুখ ধোবেন?
না। তুমি তোমার কাজ কর। আমার জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না। একা বসে থাকতে আমার খারাপ লাগে না। ভালই লাগে।
আপনি চা খান, আমি আধ-ঘণ্টার মধ্যে আসছি।
বাজারে যাচ্ছে নাকি?
না মিলিকে নিয়ে আসতে যাচ্ছি।
তিনি এদের এই বাড়িতে অনেক দিন পর এসেছেন। বাড়ির অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। নতুন ঘর উঠেছে কয়েকটি। মিলিদের এই বাড়ি কিনে নেবার কথা ছিল, কিনে নিয়েছে কিনা কে জানে। সওদাগরদের বাড়ির মত বিশাল এক বাড়ি। আসবাবপত্র ঠাসা। এদের প্রচুর পয়সা হয়েছে মনে হয়। আগে এত সচ্ছলতা ছিল না।
মিলি বাড়িতে ঢুকেই উচ্ছসিত হয়ে উঠল। কল কল করে বলল,
তুমি আমার এখানে আসবে এটা আগে বললে না কেন?
আগে বললে কি হত?
কত কিছু করতাম।
তোর মেয়ের নাম ঠিক করেছিস?
হ্যাঁ মিনতি। নামটা কেমন ভাইয়া?
সুন্দর নাম। আমি আসতে আসতে তোর মেয়ের জন্যে নাম ভাবছিলাম। তিন অক্ষরের ম দিয়ে শুরু।
কি নাম?
ময়ূর।
মিলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
ময়ুর?
হ্যাঁ।
ময়ূর কখনো নাম হয়? তোমার কি মাথা-টাথা খারাপ হয়েছে না কি ভাইয়া?
বোধ হয় হচ্ছে।
মিলি খুব হাসতে লাগল। যেন অনেক দিন পর সে মজার একটা কথা শুনল। হাসির ভঙ্গিও অস্বাভাবিক। ওসমান সাহেব মনে মনে ভাবলেন। মিলি কি সত্যি অসুস্থ? মতিয়ুর রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। হাসি থামলেই সে হয়ত কিছু বলবে। মিলি হাসি থামাল। তার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। মতিয়ুর বলল, তুমি যাও রান্না-বান্না শুরু কর। বারটা বাজে।
