ফয়সল সাহেব সিগারেট ধরালেন। বীথি মৃদু স্বরে বলল, ডাক্তার খুব করে বলে গেছেন আপনি যেন সিগারেট না খান। তিনি বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকালেন।
মরবার সময় হয়ে গেছে, সিগারেট খেলেও মরব, না খেলেও মরব, কাজেই এসব নিয়ে বাজে তর্ক করবে না।
তিনি সিগারেট শেষ করে ঘুমুতে গেলেন। ঘুমুলেন সন্ধ্যা পর্যন্ত।
ওসমান সাহেব এলেন বিকেলে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। সকালে যারা এসেছিল তাদের অনেকেই আবার এসেছে। ওসমান সাহেব হকচাকিয়ে গেলেন। এরা সবাই তার আত্মীয়-স্বজন, অথচ কাউকেই ভাল করে চেনেন না। মৃত্যু, অসুখ এইসব বড় বড় ঘটনার সময় তাদের দেখা পাওয়া যায়। তাঁরা আসেন। আন্তরিকভাবেই খোজ-খবর করেন।
ওসমান সাহেবকে দেখে কালো লম্বামত একজন বুড়ো মানুষ বললেন, ভাল আছে বাবা? ওসমান সাহেব হাসলেন। বুড়ো লোকটি বললেন, যাবার সময় হয়ে এসেছে আমাদের। সবাই চলে যাচ্ছে। ভদ্রলোকের বলার ভঙ্গিতে কোন হতাশার ছোঁয়া নেই। যেন বেড়াতে যাবার মত কোনো ব্যাপার নিয়ে কথা বলছেন।
ওসমান সাহেব মনে মনে বললেন, যাবার সময় হল বিহঙ্গের। নিতান্তই অর্থহীন কথা। এ সময় এটা মনে হবার কোনই কারণ নেই। কিন্তু একেক সময় একেকটা কথা মনে আসে এবং ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে থাকে। যাবার সময় হল বিহঙ্গের এই লাইনটি এখন মাথায় ঘুরতেই থাকবে। আটকে যাওয়া রেকর্ডের মত। কিছুতেই তাড়ানো যাবে না।
বুড়ো লোকটি বললেন, যাও বাবা তুমি ভেতরে যাও। আমরা আছি কিছুক্ষণ।
ওসমান সাহেবের কাছে। এ বাড়ি এখন অপরিচিত বাড়ি। সহজভাবে ভেতরে যেতেও কেন জানি সংকোচ লাগছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি কেউ একজন এসে বলবে, আপনি কাকে চাচ্ছেন?
তিনি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেলেন। এক সময় দোতলায় তার এবং মিলির ঘর পাশাপাশি ছিল। মিলি একটু খুঁটিখাট শব্দ হলেই ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলত, ভাইয়া একটু দেখত। চোর এসেছে। মিলির ভয় কী এখনো আগের মতই আছে? বিয়ের পর মেয়েদের অনেক কিছু বদলে যায়। ভীরু মেয়েরা হঠাৎ সাহসী হয়ে ওঠে। লাজুক মেয়েগুলি হাত নেড়ে নেড়ে হড়হড় করে কথা বলে।
স্নামালিকুম। কখন এসেছেন?
বীথি, তাকে দেখে উঠে আসতে শুরু করেছে। উঠে আসার ভঙ্গিটি অত্যন্ত সাবলীল। এটা যেন তার নিজের বাড়ি-ঘর। সে অতিথির খোঁজ নিতে আসছে।
স্যারের ঘুম ভেঙেছে। আপনি কী দেখা করবেন?
আছেন কেমন?
ভালই। তবে খুব দুর্বল। সারা বিকাল ঘুমিয়েছেন। সাধারণত উনি বিকেলে ঘুমান না।
মিলি আসেনি?
এসেছে। সে ঘুমুচ্ছে।
সবাই ঘুমুচ্ছে। ব্যাপার কী?
বীথি হাসল। ওসমান সাহেব ভাবলেন, সুন্দর মেয়েদের সব কিছুই কী সুন্দর? তিনি এখন পর্যন্ত কোন সুন্দরী মেয়ে দেখেননি যাদের হাসি অসুন্দর।
স্যারের ঘরে যাবেন এখন?
ধীরে-সুস্থে যাই। তার মেজাজ কেমন?
খুব খারাপ। সবার ওপর রেগে আছে। আপনি কী বসবেন বারান্দায়? চেয়ার এনে দেব?
না বসব না। দাঁড়িয়ে থাকতেই ভাল লাগছে।
চা খাবেন? চা এনে দেব?
দিতে পারেন।
বীথি নেমে গেল। তাঁর আবার মনে হল এই মেয়েটি এ বাড়িতে অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চলাফেরা করছে। আশ্ৰিত মানুষ কখনো এত সহজ হয় না। তাদের চোখে-মুখে সবসময় একটা বিনীত ভাব ফুটে থাকে।
ভাইয়া তুমি কখন এসেছ?
মিলি বের হয়েছে তার ঘর থেকে। দীর্ঘ ঘুমের জন্য তার চোখ-মুখ ফোলা ফোলা।
তুই অসময়ে ঘুমুচ্ছিলি ব্যাপার কী?
রাতে তো আমার ঘুম হয় না, এই জন্যে দিনে ঘুমাই।
রাতে ঘুম হয় না নাকি?
না।
কেন?
এমনি হয় না। ভাইয়া, বাবা আজ আমার সঙ্গে খুব রাগারগি করেছে।
তাই নাকি?
একটা বাইরের মেয়ের সামনে আমাকে অপমান করেছে।
বাইরের মেয়েটা কে? বীথি?
হ্যাঁ। ওর কাণ্ডকারখানা দেখেও অবাক হয়েছি। এমন ভাব করছে যেন সব কিছু তার। এ বাড়ির সব আলমারীর চাবি তার কাছে থাকে।
থাকুক না। তাতে অসুবিধা কী?
বাইরের একটা মেয়ের কাছে আলমারীর চাবি থাকবে? বলছি কী তুমি?
নিজের ছেলেমেয়েরা যখন কাছে নেই তখন এছাড়া আর কী করবেন। ও নিয়ে তুই কিছু বলতে যাবি না।
বলব না কেন? একশ বার বলব। তুমি যে ঘরটিতে থাকতে সে ঘরটিতে এখন সে থাকে। অথচ নিচে এতগুলি ঘর খালি পড়ে আছে।
আমি তো আর এখানে থাকি না। কাজেই কোনো অসুবিধা নেই।
যথেষ্ট অসুবিধা আছে। এ বাড়িতে আমাদের ঘরগুলি ঠিক আগের মত থাকবে। যখন ইচ্ছা! আমরা আসব। যতদিন ইচ্ছা থাকব। নিজেদের ঘরগুলিতেই থাকব।
তুই থাকিস। তোর ঘর তোর খালিই আছে।
মিলি মুখ অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে রইল। বীথিকে ট্রেতে করে চা নিয়ে আসতে দেখে তাঁর মুখ আরো অন্ধকার হয়ে গেল। সে ঢাপ স্বরে বলল, আপনি ভাইয়ার ঘর দখল করে আছেন কেন?
ভাইয়া খুব বিরক্ত হয়েছে। সে প্রায়ই নিজের ঘরে এসে থাকে। আপনি আসার পর সে একবারও আসেনি।
বীথি অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওসমান সাহেব কী বলবেন ভেবে পেলেন না। এমন অপ্রস্তুত করতে পারে মিলি।
কিন্তু বীথি মেয়েটি বেশ শক্ত, সে সহজেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। অন্য কোনো মেয়ে হলে সামলাতে পারত না। কেন্দো-টেদে ফেল।
বীথি বলল, স্যার আপনাকে ডাকছেন। চা খেয়েই যান। চিনি হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে।
বাবা আপনার শরীর কেমন? ফয়সল সাহেব ছেলের প্রশ্নের জবাব দিলেন না। হাত উঁচিয়ে দেয়ালে টানানো প্রশ্নোত্তরগুলি দেখিয়ে দিলেন। ওসমান সাহেব মৃদু হাসলেন। বৃদ্ধ মানুষের মধ্যে শিশুর ব্যাপারগুলি দেখা দিতে থাকে কথাটা মিথ্যা নয়।
