কিছু কিছু পড়েছি।
দু’একটার নাম বলতে পারবে?
ছেলেটি চুপ করে গেল। ছেলেটি তাঁর নতুন লেখাগুলি পড়েনি। আগের গুলিও হয়ত পড়েনি। ওসমান সাহেব মৃদু হেসে বললেন, না পড়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক না। তুমি কী সিগারেট খাবে? ভাল সিগারেট আছে খাওয়াতে পারি।
জি না। আমার একটা কাজ আছে? আমি মতিঝিল যাব।
ঠিক আছে দেখা হবে পরে।
তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগলেন। মিছিল গুলিস্তানের কাছে এসে ভেঙে গেল। ক্লান্তি লাগছিল। তিনি একটা রিকশা নিলেন। কোথায় যাওয়া যায়? মনিকার কাছে যাবেন কী? তার মনে হল মনিকার কাছে যাবার ইচ্ছাই এতক্ষণ পুষে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি ওর কাছে যাবেন না। শোকের ব্যাপারগুলি থেকে তিনি দূরে থাকতে চান। এখন মনিকাকে ঘিরে অনেকেই বসে আছে। এ সময় উপস্থিত হবার কোনো মানে হয় না। কিন্তু তবু মনিকার বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নামলেন।
অনেকগুলি গাড়ি পার্ক করা। তাঁর চোখের সামনেই বিরাট একটা নীল রঙের গাড়ি থামল। কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল হয়ে গেছে এমন একজন মহিলা নামলেন। মহিলাটির পরনে ধবধবে সাদা সিন্ধের শাড়ি। কাশ্মিরী একটি শাল কাধে। শালটির রঙ টকটকে লাল। সাদার সঙ্গে লালের কম্বিনেশন কী চমৎকার লাগছে।
ওসমান সাহেব বাড়িতে ঢুকলেন না। কিন্তু এখন কোথায় যাওয়া যায়? তার যাবার জায়গা দ্রুত কমে আসছে। হয়ত এমন একটি সময় আসবে যখন কোথাও যাবার জায়গা থাকবে না। নিজের ঘরেই থাকবে দিন-রাত। কিছুক্ষণের জন্য রাস্তায় হাঁটবেন তারপর আবার ফিরে যাবেন নিজের জায়গায়।
রানুদের বাসায় গেলে কেমন হয়? আজ বুধবার না। তাতে কী? দেখা যাক না হঠাৎ উপস্থিত হলে কী হয়। টগর নিশ্চয়ই খুব অবাক হবে।
রানুরা বাসায় ছিল না। দরজা তালা বন্ধ। কয়েকটা দিন খুব খারাপভাবে শুরু হয়। আজও কী সে রকম একটি দিন? মিলিদের বাসায় গেলে কেমন হয়? মিলি কী আছে? না সেও ঘরে তালা দিয়ে উধাও হয়ে গেছে কোথাও।
অবশ্যি মিলিদের বাসা কোথায় তার পরিষ্কার ধারণা নেই; ইচ্ছা থাকলেও যাওয়া যাবে না। তিনি বাড়ি ফিরে এসে শুনলেন তার বাবার আরেকটি স্ট্রোক হয়েছে। ওসমান সাহেবের ক্লান্তি লাগছিল। বাবার কাছে যেতে ইচ্ছা করছিল না।
ফয়সল সাহেব পিঠের নিচে
ফয়সল সাহেব পিঠের নিচে দু’টি বালিশ দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর মুখ দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে ভোর বেলাতে তার উপর দিয়ে বড় রকমের একটা ঝড় গিয়েছে। লোকজন তাকে দেখতে আসতে শুরু করেছে। সবাই একই কথা বিভিন্নভাবে বলছে।
কী করে ব্যাপারটা হল?
ব্যথাটা প্রথম কোথায় শুরু হয়েছিল?
ডাক্তারের কাছে কখন গেলেন?
ডাক্তার কী বলল?
এখন অবস্থা কী?
খাওয়া-দাওয়া কী করছেন?
ফয়সল সাহেব দুপুরের মধ্যেই মহাবিরক্ত হয়ে গেলেন। বীথিকে ডেকে বললেন, যেসব প্রশ্ন সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করছে সেগুলির উত্তর লিখে তুমি দেয়ালে টানিয়ে দাও। এক দুই করে নম্বর দিয়ে দেবে।
বীথি হ্যাঁ সূচক ঘাড় নেড়েছে। অন্য কিছু বললেই তিনি রেগে যাবেন নানান তর্ক-বিতর্ক শুরু করবেন। এই ঝামেলায় না যাওয়াই ভাল।
দাঁড়িয়ে থাকবে না, এক্ষুণি লিখে ফেল। সবশেষে লিখবে এখন দয়া করে বিদেয় হন। যা জানিবার সবই জেনেছেন। মিলি কী করছে?
রান্না ঘরে বাচ্চার দুধ গরম করছে।
একেবারে আণ্ডাবাচা নিয়ে চলে এসেছে? সে জানে না বাচাকাঁচা আমি পছন্দ করি না? ওকে বল বাসায় চলে যেতে। আমার মরার সময় এখনো হয়নি। সময় হলে তাকে খরব দেৱে
বীথি বলল, এটা বলা কী ঠিক হবে?
খুবই ঠিক হবে। তুমি বলতে না পারলে আমি বলব। ডেকে আন তাকে।
ডেকে আনতে হল না। মিলি তার ছেলে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকল। আদুরে গলায় বলল, তোমার পাশে ওকে শুইয়ে দেই।
কেন?
দুধ খাবে। ও দুধ খাওয়ার সময় কাউকে কাছে থাকতে হয়।
ফয়সল সাহেব রুক্ষ গলায় বললেন, ঝামেলা করিস না, ওকে নিয়ে বাসায় চলে যা।
মিলি তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। সে বাবার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। মিলি তাকাল বীথির দিকে। বীথি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
বাসায় চলে যাব?
হ্যাঁ।
কেন?
কেন কী? এখানে থেকে লাভটা কী হচ্ছে? বাচ্চার ঘ্যান ঘ্যান পেশাব পায়খানা। একশ ঝামেলা।
কখন সে ঘ্যান ঘ্যান করল?
ফয়সল সাহেব প্রচণ্ড এক ধমক দিলেন। মার কোলের বাচ্চাটি এতক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। এই বার সে কাঁদতে শুরু করল। মিলির নিজের চোখেও পানি এসে গেল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চোখ মুছল। মিলি ভেবে রেখেছে বেশ কয়েক দিন এ বাড়িতে থাকবে। সুটকেস গুছিয়ে এনেছে। কাজের একটি মেয়েকেও এনেছে সঙ্গে এখন কী হুঁট করে চলে যাবে? বাসায় গিয়ে বলব কী? বাবা তাড়িয়ে দিয়েছেন?
বাবু ক্রমাগত কাঁদছে। ক্ষিধের কান্না। বাবার কানে যাচ্ছে এবং তিনি নিশ্চয়ই আরো রাগিছেন। মিলি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল। আগে যে ঘরটিতে সে থাকত সেই ঘর সকালবেলা সে নিজের জন্যে গুছিয়ে নিয়েছে। এখন কেন যেন মনে হচ্ছে এটা অন্যের বাড়ি। এ ঘরে সে আগে কোনোদিন থাকেনি।
অসুখ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলির উত্তর দেয়ালে টানানোর পর ফয়সল সাহেব ঘোষণা করলেন, কাউকে যেন এ ঘরে ঢুকতে না দেয়া হয়। বীথিকে বললেন,
কাউকেই আসতে দেবে না। ওসমানকেও নয়। বুঝতে পারছ?
পারছি।
ওসমান কী এসেছিল?
জি না। এখনো আসেনি। খবর পাননি বোধ হয়।
খবর পেলেও আসবে না। মহালায়েক ছেলে। সাহিত্য সভাতে চলে গেছে। কিংবা কোনো মহাকাব্য লিখছে। মহাসাহিত্যিক তো। ও এলেই হাকিয়ে দেবে।
