হাসছিস কেন? কাজটা হাস্যকর?
হ্যাঁ। এর উদ্দেশ্য যদি কথা কম বলা হত তাহলে হাস্যকর হত না। কিন্তু আপনি কথা কম বলছেন না। বরং আগের চেয়ে বেশি বলছেন।
ঘরে ঢুকেই সেটা বঝে গেলি? বড় সাহিত্যিক হয়ে গেছিস মনে হয়। শুদ্ধ করে তো তিনপাতা বাংলা লিখতে পারিস না।
ওসমান সাহেব একটা চেয়ার টেনে বাবার পাশে বসলেন। মৃদু স্বরে বললেন, রাগ করার মত কিছু তো বলিনি, রাগ করছেন কেন? এই শরীরে রাগ করাটা ঠিক হবে না।
যোগ করতে হলে দুখ দৈ খেয়ে শবীর ঠিক করতে হবে? কী চুপ করে আছিল কেন? বল গুনে ফেলি।
ওসমান সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, আমাকে দেখে আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন, আমি বরং যাই। পিবে আসব। তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
বোস তুই, কথা আছে।
তিনি বসলেন। ফয়সল সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে থাকলেন ছেলের দিকে।
কী বলবেন বলুন।
কেন তোর রাজকাৰ্য পড়ে আছে নাকি? না কোনো মহাকাব্য লেখার কথা?
আমার লেখালেখি আপনার পছন্দ নয়?
এই সব নাকি কান্না আমার পছন্দ হবার কথা না। আমার বয়স হয়েছে। আমি বার বছরের খুকি না।
ফয়সল সাহেব বালিশের নিচ থেকে সিগারেট বের করলেন। তার হয়ত ধারণা ছিল ওসমান নিষেধ করবে। কিন্তু ওসমান সাহেব কিছুই বললেন না।
তোর সঙ্গে আমার খুব জরুরি কথা আছে।
বলুন, আমি শুনছি।
ঠিক ঠিক জবাব দিবি।
তিনি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাবা কী বলবেন আঁচ করতে চেষ্টা করছেন।
শুনলাম বৌমা নাকি আলম নামের কোন এক ছেলেকে বিয়ে করেছে? কথাটা সত্যি?
কার কাছ থেকে শুনেছেন?
কার কাছ থেকে শুনেছি সেটা জরুরি নয়। ঘটনাটা সত্যি কী না বল।
আমি ঠিক জানি না।
কিছুই জানিস না। কিছুই শুনিসনি?
ওসমান সাহেব চুপ করে রইলেন।
বেকুবের মতো চুপ করে থাকিস না, কথার জবাব দে।
আমিও শুনেছি।
ঘটনা সত্যি?
সত্যি হতেও পারে। ও আমাকে একটা শিক্ষা দেবার জন্যে এটা করবে। ঐ ছেলেটির প্রতি তার আলাদা কোনো মমতা আছে বলে মনে হয় না।
তুই একটা মহাবেকুব। তুই বেকুব, তোর বোন বেকুব। দুইজনই বেকুব।
ওসমান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মৃদু স্বরে বললেন, এটাই কী আপনার জরুরি কথা?
না, এটা জরুরি কথা হবে কেন? তোদের কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা তোদের ব্যাপার? আই ডোন্ট থিংক আই কেয়ার।
জরুরি কথা কী বলুন শুনে যাই।
এখন বলতে ইচ্ছে করছে না।
ঠিক আছে। আমি পরে আসব।
আসার কোনো দরকার নেই। যে সব বেকুবদের বৌ অন্য লোকের সঙ্গে ভোগে যায় তাদের সাথে দেখা–সাক্ষাৎ হওয়ার আমার কোনো প্রয়োজন নেই।
আপনি ব্যাপারটা যেভাবে দেখছেন আসলে এটা সেরকম নয়। আমরা আলাদা হয়েছিলাম। এই অবস্থায় তার যদি কোনো একটি ছেলেকে পছন্দ হয় এবং সে তাকে বিয়ে করে তাতে দোষের তো কিছু নেই।
ফয়সল সাহেব বাড়ি কাঁপিয়ে ধমকে উঠলেন–শাট আপ। মিলি এবং বীথি দুজনেই ছুটে এল। মিলির কোলে তার বাচ্চাটি কাঁদছে। ওসমান সাহেব নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন। বসার ঘরে অনেকেই তখনো বসে আছে। একজন বলল, চললেন? তিনি জবাব দিলেন না।
গেট খুলে বাইরে পা ফেলামাত্র মিলি বলল, ভাইয়া বাবা ডাকছে। তিনি ফিরে এলেন। ফয়সল সাহেব বেশ সহজ এবং স্বাভাবিক। বিছানায় বসে আছেন। পা বুলিয়ে। ছেলেকে ঢুকতে দেখে পা দোলানো বাড়িয়ে দিলেন।
ডেকেছেন নাকি বাবা?
হুঁ বোস। জরুরি কথাটা বলেই ফেলি।
তিনি কিছু বললেন না। বাবার মুখোমেখি বসলেন। ফয়সল সাহেব গলার স্বর খানিকটা নামিয়ে বললেন, একটা বিয়ে করব বলে ঠিক করেছি। অল্প বয়সী একটা মেয়ে।
অল্প বয়সী একটা মেয়ে আপনাকে বিয়ে করতে রাজি হবে কেন?
রাজি হয় টাকার লোভে। পৃথিবীতে পুরুষ মানুষ হয় তো দু’একটা পাওয়া যাবে যাদের টাকার লোভ নেই। কিন্তু মেয়ে মানুষ পাওয়া যাবে না। এ বাড়িটা মেয়েটির নামে লিখে দিলেই সুড়সুড়ি করে রাজি হবে।
মেয়েদের সম্পর্কে আপনার বড় খারাপ ধারণা।
তোর তো খুব উচ্চ ধারণা ছিল। তার ফল তো হাতে হাতে দেখলি। তোকে লাথি মেরে চলে গেল।
তিনি কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। বাবার দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। যেন বাবাকে বুঝতে চেষ্টা করছেন।
বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে অল্প বয়সী মেয়ে বিয়ে করাই ভাল। এতে বেঁচে থাকার আগ্রহ জন্মে। কী বলিস তুই? সাহিত্যিক মানুষ তোর ধারণাটা শুনি।
তিনি জবাব দিলেন না। একবার ভাবলেন, জিজ্ঞেস করেন মেয়েটি কে? জিজ্ঞেস করা হল না। সব প্রশ্ন সবসময় করা যায় না।
বাবা আজ যাই।
ঠিক আছে যা।
ফয়সল সাহেব পা দোলাতে লাগলেন। তিনি খুব মজা পাচ্ছেন।
ওসমান সাহেব উদ্দেশ্যহীনভাবে অনেকক্ষণ রাস্তায় হাঁটলেন। বেশ শীত পড়েছে। শীতের রাতে হাঁটতে ভালই লাগে। তার মাথায় ক্রমাগত বাজছে যাবার সময় হল বিহঙ্গের। তাড়ানো যাচ্ছে না। এটাকে।
তিনি বাড়ি ফিরলেন রাত দশটায়। নবী তখনও আছে। বসার ঘরে আরামের ভঙ্গি করে সিগারেট টানছে। চা কফি–টেবিলের উপর রাখা।
কোথায় ছিলেন। সারাদিন? আমি সেই সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছি। আপনার কোনো ট্রেস নেই। কলেজেও ফোন করেছিলাম। তারাও কিছু জানে না।
ওসমান সাহেব জবাব দিলেন না।
সায়েন্স ফিকশনটা নামিয়ে দিয়েছি। বসে আছি আপনাকে পড়বার জন্যে। তিনি ক্লান্ত স্বরে বললেন, আজ থাক, অন্য একদিন পড়বা। আজ আমার শরীরটা ভাল না।
না না। আজই পড়বেন। গরম গরম। যান, হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। আকবরের মা, চা কর
আমাদের জন্যে। তুরন্ত।
