ওসমান সাহেব সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন ঠিক এই মুহূর্তে এ শহরে কতজন মানুষ জেগে আছে। জেগে আছে না বলে বলা য়াক ঘুমুতে পারছে না। চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। একদল জেগে আছে ক্ষুধার যন্ত্রণায়। অন্য আরেক দল রোগ যন্ত্রণায়। বাকিরা সবাই সৌখিন নিশি যাপনকারী। তিনি, নবী সাহেব এবং মনিকা।
মনিকা নিশ্চয়ই জেগে আছে। এবং নবীর কথা অনুযায়ী ধরে নিতে হয় খুব কান্নাকাটি করছে। এখনও কী কাঁদছে? মেয়েদের কান্নার ব্যাপারে তার একটা মজার অবজারভেশন আছে। কিশোরীরা কাঁদে লুকিয়ে। যুবতীরা কাঁদে প্রকাশ্যে। প্রৌঢ় এবং বৃদ্ধর আশপাশে বেশ কিছু মানুষজন না থাকলে কাঁদতেই পারে না।
রানু তাঁর এ কথায় খুব রেগে গিয়েছিল। থমথমে মুখে বলেছিল, কী ভাব তুমি মেয়েদের মেয়েদের ছোট করে দেখবার একটা প্রবণতা আছে তোমার মধ্যে। এর মধ্যে ছোট করে দেখবার কী আছে তিনি বুঝতে পারেননি। রানুর হঠাৎ রেগে যাওয়া দেখে দুঃখিত ও লজ্জিত হয়েছেন।
রানু কখন থেকে তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে? বিয়ের পর পরই কী? দীর্ঘদিন পাশাপাশি থাকলে দুজনের ভেতরে ক্রমে ক্রমে ভালবাসা জনাতে থাকে। তাদের মধ্যে সে রকম হয়নি। রানু তাঁর প্রতিটি ব্যাপারে বিরক্ত হতে শুরু করল গোড়া থেকেই।
মশারির ভেতরে মেঘ তৈরি করছ? এই সব হালকা ধরনের কথা বলে আমাকে ভুলাতে চাও কেন? বল, তোমার আলসী লাগছে।
ওসমান সাহেব বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। রাত প্ৰায় শেষ হয়ে আসছে, চারটা দশ বাজে। কিছুক্ষণের ভেতর আকাশ ফর্সা হতে শুরু করবে। তিনি বসার ঘরে এলন। নবীর দরজা হাট খরে খোলা। সে এই শীতেও খালি গায়ে চেয়ারে বসে দ্রুত লিখছে। চমৎকার একটি দৃশ্য। তিনি দীর্ঘদিন কিছু লিখতে পারছেন না।
নবী চোখ তুলে একবার দেখল। অত্যন্ত সহজ গলায় বলল, সায়েন্স ফিকশনটা নামিয়ে দিচ্ছি।
ভাল।
আজ সারাদিন চালাব। ননস্টপ, ফ্লো এসে গেছে। কাইন্ডলি কফির ব্যবস্থা করুন।
কফি নেই। চা খেতে পারেন।
হোক। চা-ই হোক।
তিনি নিজেই চা বানাতে গেলেন। হাতের কাছে কিছুই পাওয়া গেল না, চিনির পট, দুধের কৌটা। কিছুই নেই। সংসার অগোছালো হয়ে গেছে। অগোছালো এবং অপরিচ্ছন্ন। রান্না ঘরের বেসিনের উপর রাতের থালাবাটি পড়ে আছে। টক টক একটা গন্ধ ছাড়ছে। আকবরের মাকে আজ কিছু কড়া কড়া কথা বলতে হবে।
কী ওসমান সাহেব। আপনার চা কোথায়?
একটু দেরি হবে। আকবরের মা উঠুক। ঘুম থেকে।
ডেকে তুলুন না। ডেকে তুললেই হয়।
নবী উঠে এসে উঁচু গলায় ডাকতে লাগল, এ্যাই এ্যাই।
আকবরের মা ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
জলদি চা বানাও। তুরন্ত। চা বানানো হয়ে গেলে গরম পানি করবে। আই উইল টেক এনাদার হট বাথ।
ওসমান সাহেব দেখলেন নবীর চোখ মুখ উচ্ছল। লেখার কাজ নিশ্চয়ই ভাল হচ্ছে। নবী বলল,
প্রথম কয়েক পাতা শুনবেন নাকি? পড়ে শুনাতে পারি।
আপনি শেষ করুন। তারপর শুনব।
সন্ধ্যা নাগাদ শেষ হবে। আমি কী সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে পারি? এখন জায়গা বদল করতে চাই না।
নিশ্চয়ই থাকতে পারেন।
আপনি কফির ব্যবস্থা করবেন?
হ্যাঁ করব।
সকাল আটটার দিকে ওসমান সাহেব বের হলেন। নবীকে কিছু বলে গেলেন না। কোথায় যাবেন কিছু ঠিক নেই। একবার কলেজে যাওয়ার দরকার। শারীরিক কারণে তিন মাসের ছুটি নেয়া আছে। সেই ছুটি বাড়িয়ে ছ’মাস করতে চান।
রাস্তায় নেমেই ভাবলেন চাকরিটা ছেড়ে দিলে কেমন হয়? মন বসছে না। একদল ছাত্র তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তিনি কথা বলবেন। তারা নোট নেবে। হাই তুলবে। তাদের চোখেমুখে থাকবে অপরিসীম ক্লান্তি। ভাল লাগে না। এতটুকুও ভাল লাগে না।
রাস্তায় একটা মিছিল বের হয়েছে। নিৰ্জিব মিছিল। একদল রোগা ও ক্লান্ত মানুষ চিকন গলায় চেঁচাচ্ছে, দিতে হবে দিতে হবে। ঢাকা শহরের মিছিলগুলি সহজেই জমে যায়। ছোট একটি মিছিল দেখতে দেখতে ফুলেফেপে ওঠে। সমুদ্র গর্জনের মত শব্দ উঠতে থাকে। কিন্তু এই মিছিলটি ক্রমেই যেন প্ৰাণ হারিয়ে ফেলছে। প্রথম দিকের একজন নেতা গোছের কেউ মিছিল ভেঙে পানি কিনতে এল।
ওসমান সাহেব মিছিলের পেছনে হাটতে লাগলেন। রোদ ভালই লাগছে। শীতের সকালের রোদের মতো ভাল জিনিস আর কী হতে পারে? তার প্রথমদিকের একটি উপন্যাসে শীতের রোদকে তুলনা করেছিলেন শিশুর আলিঙ্গনের সঙ্গে। শিশুর দেহের ওম ওম ভাবটি আসে শীতের রোদ থেকে। অতি বাজে ধরনের তুলনা।
আরে আপনি এখানে?
তিনি তাকিয়ে দেখলেন চশমা পরা একটি রোগা ছেলে। মাথা ভর্তি লম্বা চুল। কোন তরুণ কবি বা গল্পকার হবে।
আমাকে চিনতে পারছেন তো?
তিনি একটি পরিচিতের হাসি দিলেন।
আপনি এখানে কী করছেন?
এই হাঁটছি। আর কী?
কিসের মিছিল এটা জানেন?
না। কিসের?
ট্রাক ড্রাইভার এসোসিয়েশনের। এক ট্রাক ড্রাইভার একটি ছেলেকে চাপ দিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। পুলিশ হেভি পিটন দিয়েছে। পারলিকও দিয়েছে। তার প্রতিবাদে মিছিল। চলে আসেন।
ওসমান সাহেব চলে এলেন না। হাঁটতে লাগলেন নিজের মনে। ছেলেটি বলল, লেখালেখি কেমন হচ্ছে স্যার?
হচ্ছে না।
কিছু মনে করবেন না। স্যার। আপনার ইদানীংকালের লেখাগুলি আগেরগুলির মত হচ্ছে না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। ইদানীংকালের লেখাগুলি মনে হয় পপুলার ডিমান্ডে লেখা। তেমন ডেপথ নেই।
তুমি কী আমার ইদানীংকালের লেখাগুলি পড়েছ?
