নাইমুল হাঁটছে আর মনে মনে কাক খুঁজছে।
কাক বলে কা কা
ঢাকা শহর খা খা।
বাহ সুন্দর মিলেছে তো! কুকুরের দেখা নাইমুল কিছুক্ষণের মধ্যে পেয়ে গেল। মোটামুটি স্বাস্থ্যবান একটা ঘিয়া রঙের কুকুর ফুটপাতে শুয়ে আছে। তার শুয়ে থাকার ভঙ্গি বিষণ্ণ। নাইমুল বলল, এই তোর খবর কিরে?
কুকুর সঙ্গে সঙ্গে উঠে এলো। ঢাকা শহরে এই প্রথম নাইমুলের কারো সঙ্গে কথা বলা। ডায়েরি লেখার অভ্যাস থাকলে এই ঘটনাটা সুন্দর করে লেখা যেত–
আমি ঢাকায় প্রবেশ করি ১৬ আগস্ট দুপুরে। প্রথম কথা যা বলি তা হলো–এই তোর খবর কিরে? প্রশ্নটি করা হয় একটা কুকুরকে। কুকুরের গায়ের রঙ ঘিয়া। সে পা খুঁড়িয়ে হাঁটে। এই কুকুরটা আমার সঙ্গে অনেকদূর হেঁটে হেঁটে আসে। আমি যখন শান্তিনগরের মোড় পার হই। তখনই শুধু সে থেমে যায়। তবে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। তার তাকানোর ভঙ্গি এরকম যে আমি একটু ইশারা দিলেই সে আবারো আমার পেছনে পেছনে আসবে। আমি তাকে ইশারা দিতাম। কিন্তু দেই নি, তার কারণ আমার চোখে পড়ল একটা নাপিতের দোকান। সঙ্গে সঙ্গে চুল কাটার কথা মনে পড়ল। আমি ঢুকে গেলাম নাপিতের দোকানে।
চুল কাটার সময় কথা বলা সব নাপিতের অভ্যাস। যে নাইমুলের চুল কাটছে তার মুখে কোনো কথা নেই। কচকচ করে চুল কেটে যাচ্ছে। নাইমুলের খুবই আরাম লাগছে। চুলকাটার ব্যাপারটা যে আরামদায়ক নাইমুল তা আগে কখনো টের পায় নি। তার ঘুম ঘুমও পাচ্ছে। চুল কাটাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া কোনো কাজের কথা না। নাইমুলকে বেশ কষ্ট করে জেগে থাকতে হচ্ছে। নাইমুল হাই তুলতে তুলতে বলল, আপনার নাম কী?
নাপিত চাপা গলায় বলল, তৈয়ব।
দোকান আপনার?
মহাজনের দোকান।
কারিগর কি আপনি এক?
হুঁ।
কাস্টমার কেমন হয়?
হয় কিছু।
মিলিটারিরা চুল কাটতে আসে?
তৈয়ব এই প্রশ্নের জবাব দিল না। মিলিটারি প্রসঙ্গে কোনো কথা বলা বোধহয় নিষেধ।
শহরে কি মুক্তি আছে?
নাপিত কিছুক্ষণের জন্যে কাচির ক্যাচ ক্যাচ বন্ধ করে আবার শুরু করল। এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। নাইমুল বলল, আপনারা শহরে আছেন, মুক্তির নাড়াচাড়া বুঝেন না? বোঝার তো কথা।
আছে, নাড়াচাড়া আছে। আপনে কি মুক্তি?
নাইমুল সহজ ভঙ্গিতে বলল, হুঁ।
আপনেরে দেইখ্যাই বুঝেছি।
কীভাবে বুঝলেন?
এইসব বোঝা যায়। মাথা মালিশ কইরা দিব?
দেন। আগে শেভ করেন।
মাথা মালিশ এতই আরামদায়ক হলো যে, নাইমুল সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ল। ছোটখাটো ঘুম না, লম্বা ঘুম। তৈয়ব তার ঘুম ভাঙালি না। খবরেব কাগজ ভাঁজ করে পাশে বসে রইল। মাছি খুব উপদ্রব্য করছে। ঘুমন্ত লোকটার মুখে বারবার এসে বসছে। তৈয়ব খবরের কাগজ দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে।
নাইমুলের ঘুম ভাঙল বিকেলে। তখন শহরে রোদ নেই। আকাশ মেঘলা। শ্রাবণ মাসের আকাশে মেঘ মানেই বৃষ্টি। বৃষ্টি নামলে খুবই সমস্যা হবে। নাইমুল এক কাপড়ে ঢাকা এসেছে।
তৈয়ব তাকিয়ে আছে। তার মুখ ভাবলেশহীন।
নাইমুল বিরক্ত গলায় বলল, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ডাকলেন না কেন?
তৈয়ব জবাব দিল না।
কত হয়েছে আমার? চুল কাটা, শেভ, মাথা মালিশ। কত হয়েছে বলেন।
তৈয়ব বলল, আপনের কিছু দিতে হবে না।
নাইমুল বলল, দিতে হবে না কেন?
তৈয়ব এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না।
নাইমুল বলল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। ভাই, তাড়াতাড়ি বলেন–কত?
তৈয়ব আগের মতোই আবেগশূন্য গলায় বলল, আপনে মুক্তি। আমি মুক্তির কাছে টেকা নেই না। আমারে টেকা দেওনের চেষ্টা কইরা ফয়দা নাই। দিতে পারবেন না।
বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। নাইমুল রাস্তায় নেমে পড়ল। সে হোটেলে জায়গা পেল না। হোটেলের মালিক বদল হয়েছে। মালিকের সঙ্গে নোমও পাল্টেছে। এখন নতুন নাম পাকিস্তান হোটেল। নতুন মালিক নাইমুলকে কঠিন গলায় বলল, হোটেলে লোক নেওয়া নিষেধ আছে। রেস্টুরেন্ট আছে, খানা খাইতে পারেন। থাকার জায়গা নাই।
মিলিটারির নিষেধ?
হুঁ। মাঝে মধ্যে চেকিং হয়। বিরাট দিগদারি।
আশেপাশে কোনো হোটেল আছে?
খুঁজেন। খুঁইজ্যা দেখেন।
নাইমুল আরো দুটা হোটেলে চেষ্টা করল। একটাতে বলল, ফ্যামিলির সাথে বাচ্চাকাচ্চা থাকলে ঘর দিতে পারে। একা মানুষকে ঘর দেবে না।
নাইমুল বলল, একটা রাতের জন্যে আমার কোথাও থাকা দরকার। একটু ব্যবস্থা করে দেন।
হোটেল মালিক ক্লান্ত গলায় বলল, আত্মীয়স্বজনের বাসায় যান। এইটা ছাড়া পথ নাই। হোটেলে আপনেরে কেউ রাখব না। ঢাকা শহরে আপনের স্বজন আছে না?
নাইমুল দেরি না করে স্বজনের খোঁজে বের হলো। অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার তো ঘটেও যেতে পারে। দেখা যাবে মরিয়মরা ঢাকাতেই আছে, ঐ বাড়িতেই আছে। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর মরিয়মের মার ভীত গলা শোনা যাবে–কে? কে?
এই মহিলা মেয়েদের কখনো দরজা খুলতে দেন না। নিজে আসেন দরজা খুলতে। পরিচয় দেয়ার পরেও আরো কয়েকবার বলেন, কে কে?
নাইমুল কড়া নাড়ার পর তিনিই দরজার ওপাশ থেকে ভয়ে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া গলায় বলবেন, কে?
নাইমুল গলা নামিয়ে বলবে, মা আমি। আমি নাইমুল। দরজাটা খুলুন। তবে কাউকে বলবেন না যে আমি এসেছি। আমি একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই।
তিনি দরজা খুলবেন, তবে নিজেকে নিশ্চয়ই সামলাতে পারবেন না। চিৎকার করে বলবেন, মরিয়ম, দেখে যা কে এসেছে! মরিয়ম কী করবে–দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা মচকে ফেলবে। এই মেয়ের সিঁড়িতে পা পিছলানো রোগ আছে। সে সিড়ি দিয়ে নামবে অথচ পা পিছলাবে না–এটা হতেই পারে না।
