এই পর্যায়ে দোকানির বিশ্বাস ফিরে আসে। তার চোখ-মুখ থেকে ভয় কেটে যায়। মুখ হাসি হাসি হয়ে যায়। সে আনন্দিত গলায় বলে, ভাই, চা খাইবেন?
আপনার দোকানে চায়ের ব্যবস্থা কই?
ব্যবস্থা নাই, আনায়ে দেই।
আচ্ছা আনান। তার আগে সিগ্রেটের দামটা নেন। আমরা মুক্তি। জোরজবরদস্তি কইরা জিনিস নেওয়া আমরার নিষেধ আছে।
দোকানি প্রায় চেচিয়ে বলে, কী সর্বনাশ। আপনের কাছ থাইক্যা সিগারেটের দাম নিমু? আমি কি বেজন্মা?
মুক্তি সেজে গল্প করতে বাচ্চু মিয়ার ভালো লাগে। তখন নিজেকে মুক্তিই মনে হয়।
ভাইসব, আপনাদের অপারেশন চলতেছে কেমন?
রাইতে বোমা শুনেন না?
অবশ্যই শুনি। মাঝে মধ্যে দিনেও শুনি।
রাইত-দিন বইল্যা এখন আমরার কিছু নাই। সব সময় শুনবেন। আমরার দলের লোকজন আরো আসতেছে। প্ৰতিদিনই আসে।
আলহামদুলিল্লাহ।
মিলিটারির পাতলা পায়খানা শুরু হয়ে গেছে। বুঝতেছেন না?
অবশ্যই বুঝতেছি।
চরমপত্র শুনেন?
আরে কী বলেন? এইটা না শুনলে চলে? চরমপত্র আর ঢাকা শহরে বোমার শব্দ–এই দুইটা না শুনলে আমার আর আমার পরিবারের ঘুম হয় না।
যতই দিন যাচ্ছে বাচ্চু মিয়ার সাহস ততই বাড়ছে। এখন সে মাঝে-মধ্যে মিলিটারির কোনো দল দেখলে এগিয়ে যায়। মিলিটারিরাও বিহারি দেখলে মনে ভরসা পায়। বাচ্চু মিয়া, তাদের দিকে সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে–ভাই হালত কিয়া? মিলিটারিদের সঙ্গে তার ভালোই কথাবার্তা হয়।
পানের পিক ফেলতে ফেলতে সে গম্ভীর গলায় বলে, সব মুক্তি ফিনিস করডো। বাঙালি খতম করো। সব খতম।
তার উর্দু ঠিক হয় না। তাতে সমস্যা নেই। বিহারিরাও ভালো উর্দু বলতে পারে না। বিহারিদের চেনার উপায় হলো–বাংলা উর্দুর মিকচার ভাষা। এই ভাষা বাচ্চু মিয়া জানে।
সন্ধ্যার আগে আগে বাচু ঘরে ফিরে আসে। চাল-ডালের খিচুড়ি বসিয়ে দেয়। রান্না ভালো হবে না খারাপ হবে–এটা নিয়ে চিন্তা করার কিছু নাই। সে একা মানুষ। কাঁচা চাল-ডাল চিবায়ে খেলেও কারো কিছু বলার নেই। একা থাকার এই মজা। সে কলিমউল্লাহর বাসাতেই আছে। মাঝে-মাঝে লোকটাকে নিয়ে তার চিন্তা হয়। দশ টাকা হাত খরচ দিয়ে মানুষটা যে গেল, আর তার খোঁজ নেই। মারা যায় নি তো? আজকাল মরে যাওয়া কোনো ব্যাপারই না। ঘর থেকে বের হলে মৃত্যু, ঘরে বসে থাকলেও মৃত্যু। ঢাকা শহরে আজরাইলের কোনো বিশ্রাম নাই।
বাচ্চু মিয়া খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রেডিও কানের কাছে নিয়ে শুয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলা বেতারের কোনো কিছুই যেন বাদ না পড়ে। বিশেষ করে চরমপত্র। চরমপত্র যখন হয় তখন বাচু চরমপত্রের লোকটার মতো গলা করে বলে, দে দে গাববুইরা মাইর দে।
চরমপত্ৰ শোনার সময় তার মনে হয়, ইস যদি সত্যি মুক্তি হতে পারতাম তাহলে গাবুইরা মাইর দিতাম। মিলিটারি বুঝত মাইর কী জিনিস। বাঙালি কী জিনিস!
এক শুক্রবারে দরজার কড়া নড়ছে। কড়া নড়ার ভঙ্গি ভালো না। খারাপ কিছু না তো? কোনো বাঙালি এখন এত জোরে কড়া নাড়ে না। বাঙালি কড়া নাড়ে ভয়ে ভয়ে। লালমুখা মিলিটারি?
শুয়োরের বাচ্চারা এখন বাড়ি বাড়ি তালাশ শুরু করেছে। জোয়ান ছেলে সব ধরে নিয়ে যায়। এরা ফিরত আসে না। জোয়ান হওয়ার এই এক বিপদ হয়েছে। বড় পীর গাউসুল আযমের নাম নিয়ে বাক্ষু মিয়া দরজা খুলল। দরজা খুলে হতভম্ব! কলিউমউল্লাহ দাঁড়িয়ে আছেন। দাড়ি, মাথায় টুপি, ইন্ত্রি করা পাঞ্জাবি।
কলিমউল্লাহ বলল, কিরে তুই এখনো আছিস? পালায়ে যাস নাই?
বাচ্চু মিয়া কদমবুসি করতে কবতে বলল, আমি যামু কই? আপনে খরচ বরচ কিছুই দিয়া যান নাই। খায়া না খায়া আছি। আপনি ছিলেন কই?
কলিমউল্লাহ তীক্ষ্ণ চোখে ঘর-দুয়ার দেখতে দেখতে বলল, জিনিসপত্র বিক্রি করেছিস না-কি? খালি খালি লাগছে।
হিসাব মিলাইয়া দেখেন।
চা বানা। চা খাই। ভালো কথা, তুই কি আমার বিছানায় শুয়ে ঘুমাস নাকি? বিছানা দেখে তো সে রকমই লাগে।
বাচ্চু মিয়া জবাব না দিয়ে চা বানাতে গেল। ঘটনা সত্যি।
সে আগে মেঝেতে ঘুমাতো। এখন স্যারের বিছানাতেই ঘুমায়। যুদ্ধের বাজারে সব সমান। আম কাঠ সেগুন কাঠের একই দর। সে কেন বিছানায় ঘুমাবে না?
কলিমউল্লাহ চায়ে চুমুক দিয়ে কিছুটা শান্ত হলো। বাচ্চু মিয়া যে ঘর বাড়ি ফেলে পালিয়ে যায় নি–এটা বড় ব্যাপার। চুরি অবশ্যই করেছে। টুকটাক চুরি তো করবেই।
স্যার, আপনে ছিলেন কই?
কলিমউল্লাহ বলল, বিয়ে করলাম। এই নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।
বাচ্চু মিয়া অবাক হয়ে বলল, বিবাহ করেছেন?
হুঁ।
ভাবিসাব কই?
আছে। অন্য একটা বাড়িতে তুলেছি।
উনার নাম কী?
নাম দিয়ে তুই কী করবি? ফাজিলের মতো কথা।
উনার সাথে পরিচয় হবে না?
তুই এত বড় তালেবর যে পরিচয় করায়ে দিতে হবে? তুই এই বাড়িতে যে রকম আছিস, সে রকম থাকিবি। বাড়ি পাহারা দিবি। বুঝেছিস?
বুঝলাম।
আমি মাঝে-মধ্যে এসে দেখে যাব। খরচ দিয়া যাব। জিনিস বিক্রি বন্ধ।
বাচ্চু মিয়া নিজের জন্যেও চা বানিয়ে এনেছে। বেয়াদবি যেন না হয়। সে জন্যে অন্যদিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। স্যার বিবাহ করেছেন শুনে ভালো লাগছে। যে বাড়িতে মেয়েছেলে নাই, সে বাড়িতে কাজ করে মজা নাই।
স্যার, দেশ স্বাধীন হইব কবে?
স্বাধীন তো হয়েই আছে। নতুন করে কী হবে? উল্টা পাল্টা কথা বন্ধ।
জি, আচ্ছা বন্ধ।
তুই চাকর, চাকরের মতো থাকিবি। তোর কাজ ভাত রান্দা, বুঝেছিস?
জি, বুঝলাম। তয় এখন অবশ্য ভাত রান্দনের সময় পাই না। কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতে হয়।
