প্রেসিডেন্টের অতি ব্যস্ততার মধ্যে ঘরে ঢুকলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। প্রেসিডেন্ট এক ঝলক ভুট্টোর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার যা বলার বলুন। আমি কাজ করতে করতে আপনার কথা শুনব। আজ আমার সীমাহীন ব্যস্ততা।
জুলফিকার আলি বললেন, শেখ মুজিবকে কি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে?
প্রেসিডেন্ট কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বললেন, অবশ্যই।
ফর গডস সেক। ডোন্ট ড়ু দ্যাট।
না কেন?
আপনার হাতে মৃত্যুর চেয়ে সে বড় মাপের মানুষ।
জুলফি, আপনার ধারণা তাকে হত্যা করার মতো বড় আমি না?
তাকে হত্যা করলে সারা পৃথিবী আমাদের উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। বিশেষ করে আমেরিকানরা। আমেরিকানরা আপনাকে যত খুশি বাঙালি মারতে দেবে, কিন্তু নট শেখ মুজিব।
জুলফি, আপনি কি মনে করেন আমেরিকানদের মনোভাব আমি জানি না? খুব ভালো যোগাযোগ তাদের সঙ্গে আমার আছে। শেখের কী হলো নিক্সন তার পরোয়া করে না। আমি নিক্সনকে ভালোমতো জানি। আমরা যোগাযোগ রেখে চলি। আপনার সঙ্গে আমি এখন আর কথা বলতে পারছি না, চীনা রাষ্ট্রদূত আসছেন। শুনুন জুলফি, আমি শেখকে অবশ্যই ফাঁসির দড়িতে ঝুলাব। যে ঝামেলায় সে আমাকে ফেলেছে তাকে তার মূল্য দিতে হবে। Good bye.
বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলো
বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলোর কয়েকটি কথা
নববর্ষের দিন সূর্যের আলোয় পথ চিনে এগিয়ে গেলাম, আঠার নং রোডের দুর্গসদৃশ সেই বাড়িটার দিকে। বাইরের ঘরেই বসেছিলেন বেগম শেখ মুজিব। হাসিমুখেই আহবান জানালেন আমাকে। বাড়িটার উল্লেখ করতেই হেসে বললেন–এটা তো তবুও একটা মাথা গুজবার ঠাই, কিন্তু ২৫শে মার্চের পর পুরো দেড় মাস তাও কোথাও পাই নি। আজ এখানে কাল সেখানে, এমনি করে সেই মাসে কম করে হলেও চৌদ্দ পানেরটা বাসা বদল করেছি।
হাসছিলেন বেগম মুজিব, কিন্তু দেখলাম হাসির মাঝে কেমন জানি অস্পষ্ট এক বিষণ্ণতার ছোয়ায় করুণ হয়ে উঠেছে তাঁর চোখের দৃষ্টি।
২৫শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাত। অন্ধকার শোবার ঘরটাতে বিছানায় শুয়ে শেখ সাহেব শুনছিলেন বাইরে বোমায় বিধ্বস্ত ঢাকার আর্তনাদ। উত্তেজনায় এক এক সময় উঠে বসছিলেন তিনি।
ঠিক এমনি এক মুহুর্তে গুলির একটি টুকরো জানোলা ভেদ করে ছোট ছেলে রাসেলের পায়ে আস্তে করে লাগে। অন্ধকারে হাতড় গুলিট কুড়িয়ে নিয়েছিলেন শেখ সাহেব। আর সেই দুঃসহ রাতেই নরপিশাচরা তাকে বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে তখন ছিলেন বেগম মুজিব, আর তার দুছেলে।
২৬শে মার্চ–সমস্ত দিন ছিল কারফিউ। গোলাগুলির শব্দ তখনও থামে নি। নিস্তব্ধ বাড়িটা জুড়ে যেনো এক ভৌতিক বিভীষিকা মাথা খাড়া করে উঠেছে। সামনে ধানমণ্ডি বালিকা বিদ্যালয়ে তাক করে রাখা বড় বড় কামানের মুখগুলো আমার বাসার দিকে। ভয়ে জানালাগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে পারি নি। দুপুরে কারফিউর মধ্যেই এবাসা ওবাসা করে বড় ছেলে কামাল এসে পৌঁছালো।
রাত এলো। সেই আধার কালো রাত। ইয়াহিয়া খানের হিংস্রভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বলা বিবৃতি শুনেই নিজেদের অবস্থা বুঝতে পারলেন বেগম মুজিব। তাই কালবিলম্ব না করে ছোট ছেলে আর মেজ ছেলেকে নিয়ে পাচিল টপকে প্রতিবেশী ডাক্তার সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। অন্যদিকে বড় ছেলে কামাল এবং মহিউদ্দীন সাহেব পালালেন অন্যদিকের পাচিল ডিঙিয়ে। রাত ১১টা থেকেই তোপ দাগার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। কতকটা চেতন কতকটা অচেতন অবস্থায় বেগম মুজিব ২৬শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাতে শুনলেন তার আদরের বাড়িতে গোলাগুলির শব্দ। রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত। সেরাতে এভাবে না পালালে তার এবং তার সন্তানদের ভাগ্যে কী যে ঘটতো আজও তিনি তা ভাবতে পারেন না।
২৭শে তারিখ সকালে বাচ্চা দুটো সাথে নিয়ে তিনি আবার পালালেন। পুরো দেড় মাস এ বাসা ও বাসা করেন। শেষে মগবাজারের এক বাসা থেকে পাক বাহিনী তাকে আঠারো নং রোডের এই বাসায় নিয়ে আসে।
১৮নং রোডে আসবার পূর্বকার মুহুর্তটি স্মরণ করে গভীর হয়ে গেলেন বেগম মুজিব। বললেন–আমি তখন মগবাজারে একটা বাসায় থাকি। আমার বড় মেয়ে হাসিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। সে, জামাই, আমার দেওর, জা, মেয়ে রেহানা, পুত্র রাসেলসহ বেশ কয়েকজন একসাথে ছিলাম মগবাজারের বাসাটাতে। হঠাৎ একদিন পাকবাহিনী ঘেরাও করে ফেলল বাসাটা। একজন অফিসার আমাকে জানাল যে আমাকে তাদের তত্ত্বাবধানে অন্যত্র যেতে হবে। জানি না। কী হবে। ঠিক সেই মুহুর্তটাতে ভীষণ সাহসী হয়েছিলাম। আমি। কড়াভাবেই সেই অফিসারকে বললাম, লিখিত কোনো আদেশপত্র না দেখালে আমি এক পা-ও বাড়াব না। উত্তরে সে উদ্ধতভাবে জানাল যে ভালোভাবে তাদের সাথে না গেলে তারা অন্য পন্থা গ্ৰহণ করবে। তখন বাধ্য হয়ে আমি বললাম যে, আমার মগবাজার বাসায় যারা আছেন তাদের প্রত্যেককে আমার সাথে থাকতে দিতে হবে। আমার কথায় তারা নিজেরা কী যেন আলোচনা করল, পরে তারা রাজি হয়ে নিয়ে এলো আমাদেরকে ১৮নং রোডের এই বাসাটাতে।
১৮নং রোডে আসার প্রথম দিনের কথা বলতে গিয়ে আবার হেসে ফেললেন বেগম মুজিব। ময়লা আবর্জনা পূর্ণ এই বাড়িটাতে তখন বসবার মতো কোনো আসবাবপত্র দূরে থাক, একটা মাদুর পর্যন্ত ছিল না। জানালার পাশ ঘেসা ৩/৪ ফুট প্রশস্ত একফালি জায়গায় ঘেসাঘেসি করে বসেছিলেন তিনি এবং পরিবারের সমস্ত সদস্যরা।
অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে এইভাবে কষ্ট করে বসে থাকতে দেখে সেদিন বুক ফেটে যাচ্ছিল তাঁর। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন নি, শুধু অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলেন চারিদিক। হয়তো অসহায়ের করুণ ডাক আল্লাহতায়ালা সেদিন শুনেছিলেন। প্রহরী পাক-বাহিনীর এক পাঠান অফিসার অনুভব করেছিল তাঁর অসহায় অবস্থাকে। সেই অফিসার একজন ঝাড়ুদার সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে দেয় ঘর দুয়ারি–সংগ্রহ করে দিয়েছিল। কয়েকটি চেয়ার এবং একটি কম্বল।
