মাজার? কয়েকদিন আগে সুদীপ্ত মাজার দেখেছিলেন। সন্ধ্যার দিকে নিউ মার্কেটে যাচ্ছিলেন সামান্য কেনাকাটার জন্য। মোড়ের ভিড়টাকে তিনি ঠিকই। লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু চিরকালের অভ্যাস মতোই ভিড় এড়িয়ে অন্য দিকে সরে যাচ্ছিলেন। সহসা কানে এলো—
আপনারা মাজারে যে যা পারেন দান করে যাবেন।
এই রাস্তার মাঝখানে মাজীর? অগত্যা দাঁড়াতে হল। ভিড়ের কাছে এগিয়ে দেখেন সত্যি সত্যিই চৌরাস্তার ঠিক কেন্দ্রস্থলে পাশাপাশি দুটি কবর। বালি ও ইট-পাথর সংগ্রহ করে সত্যকার কবরের মতো করেই বানাননা হয়েছে। তার উপর শক্ত কাগজের দুটো সাইনবোর্ড—একটাতে নাম লেখা ইয়াহিয়া খানে, অন্যটাতে জুলফিকার আলি ভুট্টোর। একটা লোককে, বোধ হয়। সে ফকির হবে, সেবায়েত সাজানো হয়েছে। সে মাঝে মাঝে চিৎকার করছে
আপনারা যে যা পারেন মাজারে দান করে যাবেন। « বাহ, কৌতুকটা জমিয়েছে বেশ তো। এ না হলে বাঙালি! গুপ্ত কবি ঠিকই লিখে গেছেন, এতো ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গ ভরা। সেদিন ভারি পুলকিত হয়েছিলেন সুদীপ্ত।
আজ সকালে সদ্য ঘুম-ছাড়া শয্যায় সেদিনের কথা সুদীপ্তর মনে হল। সেই মাজার সাফা করার জন্য গতকাল গাড়ি থেকে নামিয়ে কাজে লাগানো হয়েছিলো ভদ্রলোকদেরকে। কুলি-মজুর লাগানো যেত না? কিয়া বাত? কাজে লাগানো হয়েছে বাঙালিকে। তারি মধ্যে আবার ভদ্রলোক-কুলিমজুর ভেদাভেদ করতে হবে নাকি।
কথাটা সুদীপ্ত গতকালই গাড়িতে আসতে ফিরোজের কাছে তুলেছিলেন—
মানুষের কার কি মর্যাদা সেটা বিচার না করেই।…..
কী যে বল। সুদীপ্তকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ফিরোজ বলে উঠেছিলেন জানো না, রক্ত পায়িদের কাছে সব মানুষই সমান।
০৫. বিছানা ছেড়ে কিছুতেই আজ
বিছানা ছেড়ে কিছুতেই আজ উঠতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু ফিরোজ তো উঠে গেছেন। শূন্য ঘরে সুদীপ্ত একটি শপথ নিতে চাইলেন মনে মনে। এইসব যা ঘটে গেল তা ভেবে কিছুতেই মন খারাপ হতে দওয়া হবে না। ভেবে কী লাভ! হাঁ, কাজ করতে হবে। দেশের জন্য এখন কতো কাজ করার আছে। কিন্তু তিনি কী করবেন! তাই তো, কি যে করা যায়! জানলা দিয়ে কী সুন্দর রোদ এসে পড়েছে মেঝেয়! কতোকাল জানলা দিয়ে এমন রোদ আসেনি। তার পরিবর্তে এসেছে গুলি-গোলা আর ধোঁয়ার কুন্ডলি। শ্বাসরুদ্ধকর সেই প্রভাতে জীবনকে তবু পরিত্যাজ্য মনে হয়নি তো। ঠিক কী যে মনে হচ্ছিল তার কোন নাম নেই। তবে তাঁর সমগ্র সত্তাকে যা আকঁড়ে ধরেছিল তার নাম আর যাই হোক নেতিবাচক কিছু নয়। কিছুতেই এ কথা একবারও তার মনে হয় নি যে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে তাঁর মৃত্যু প্রতীক্ষা করছে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ মৃত্যুকে অবিশ্বাস করে। পঁচিশের রাতে-না তো, রাত তখন কত? প্রায় দুটার কাছাকাছি, অতএব ছাব্বিশে মার্চ তখন—এই ছাব্বিশে মার্চের রাতে ওরা যখন ঘরে ঢুকল তখন কি মনে হয়েছিল, আমি সেই সুদীপ্ত মাত্র। কয়েক সেকেন্ড পরে আর জীবনে নেই, আছি মৃত্যুর রাজ্যে! কী আশ্চর্য। সৈনিকগুলো সামান্য মাথা হেট করে খাটের নিচে আর তাকালো না। তাকাতো যদি হয়ত মরে যেতাম। হয়ত মরে যেতাম-সুদীপ্ত ভাবলেন। ভাবনার মধ্যে মানুষ অলৌকিক রূপ কথার দেশেও বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসের বেলায়? পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাইরে অনেকে পদক্ষেপে ইচ্ছুক হবে না। আমি মরে যাচ্ছি-কথাটা মানুষ ভাবতে পারে, কিন্তু কখনো বিশ্বাস করতে পারে না। সৈনিকগুলো যখন একেবারে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল। আবার ঐ কথা? না, ঐ সব আর ভাবব না। বলতে বলতেই বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন সুদীপ্ত।
সকালের চায়ের টেবিলে একজন নতুন মানুষকে দেখা গেল-হাসিম সেখ, সম্পর্কে ফিরোজের ভাগনে। বয়সে ফিরোজের চেয়ে সামান্য ছোট। ভদ্রলোকের মা হচ্ছেন গ্রাম সুবাদে ফিরোজের বোন-বাল্যকালে বাপ মারা গেছেন। ফলে তিনি লেখাপাড়া বেশিদূর চালাতে পারেন নি। আই. এ. পাস করে পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলেন। সেই পঁচিশের রাতে ছিলেন রাজারবাগে। পাকিস্তানিদের সাথে সেই রাতের অসম-সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এখন সেনাবাহিনীর রোষ দৃষ্টি এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
কিন্তু এতো সকালে কেউ আসে কি ভাবে?-প্রশ্নটা মনে উদিত হতেই সুদীপ্ত ঘড়ির দিকে তাকালেন। তাই তো, নটা যে বাজে! হাঁ, তা নটা হতে। পারে বৈ কি? ঘুম কি তাঁর এখন ভেঙ্গেছে! আটটার দিকে কারফিউ উঠে। গেছে। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভদ্রলোক পথে রেরিয়েছিলেন।
পথে বেরিয়ে, মামা, সে কী বিপদ! মুসলিম লীগের হরমুজ মিয়ার সাথে দেখা।
সেই হরমুজ মিয়া, যে বর্তমানে লীগ-নেতার নির্দেশে সেনাবাহিনীকে। আওয়ামী লীগের লোকদের এবং হিন্দুদের বাড়ি-ঘর ও দোকান চিনিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব কামে সে খুব যোগ্য লোক। হাসিম সেখকেও সে চিনেছিল। ঠিকই। সামনে এসে দাঁত বের করে বলেছিল–
আরে হাসিম সেখ মালুম হতেছে। রাজারবাগ তন আসা হল কখন?
হাসিম সেখ কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেলেই হয়েছিল আর কি। তিনি ঘাবড়ান নি। সঙ্গে সঙ্গেই উর্দু ভাষায় মুখ খিস্তি করে গাল দিয়ে উঠেছিলেন। উর্দু ভাষায় ভারি সুন্দর মুখ খিস্তি করা যায়।
এ শালে শুয়ার কা বাচ্চা, উল্লুকা পাঠঠে, কমবখত মরদুদ, তু হাসিম সেখ। কাহত। কিসকো। মায় আতাউল্লাহ খান। খোদ কানপুর সে আনেওয়ালা হ্যায় হাসিম তেরা বাপকা মাফিক বেঈমান আওর গাদ্দার নেহি।
