পীর-ফকির সম্পর্কে সাবধানে কথা বলবে এ্যানা। কখন ফট করে বরদোয়া লেগে যাবে।
লাগুক।
এ্যানা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। হীরুর বুক ছাঁৎ করে উঠল। এখন নিশ্চয়ই চলে যাবে। ইস আরো কিছুক্ষণ যদি আটকে রাখা যেত!
এ্যানা গেল না। দাঁড়িয়ে রইল। তারও সম্ভবত রুগ্ন মায়ের পাশে সারাক্ষণ থাকতে ভাল লাগে না।
আপনার চায়ের দোকান কবে স্টার্ট হচ্ছে?
শিগগির–ক্যাপিটালের অভাবে আটকা পড়ে আছে। হাজার পাঁচেক টাকা পেলেই ধাঁ করে বেরিয়ে যেতাম।
টাকাটা জোগাড় হচ্ছে না?
হয়ে যাবে। পীর সাহেব বলে দিয়েছেন। ঐ নিয়ে চিন্তা করি না।
আপনি এত বোকা কেন?
হীরু আহত চোখে তাকিয়ে রইল। রাগ হবার কথা। কিন্তু রাগ লাগছে না। মনটা খারাপ হয়ে গেছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। এ্যানা বোধ হয় ব্যাপারটা টের পেল। সে কোমল গলায় বলল, আরেক কাপ চা খাব।
হীরুর মন খারাপ ভাবটা সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেল। সে মনে মনে বলল অসাধারণ মেয়ে। অসাধারণ। এই মেয়ে পাশে থাকলে চোখ বন্ধ করে সমুদ্রে ঝাপ দেয়া যায়। বাঘের মুখের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দেয়া যায়।
এ্যানা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আপনাকে একটা কথা বলব।
কি কথা?
আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?
কি বলছ এই সব।
মার খুব ইচ্ছা। মরবার আগে বিয়ে দেখতে চায়।
তোমার বড় বোনেরই তো বিয়ে হয়নি?
ওদের সম্বন্ধ আসে না। আমার এসেছে। ছেলে আরব বাংলাদেশ ব্যাংকে কাজ করে। অফিসার। বড় অফিসার। আগে একটা বিয়ে করেছিল। বউ মরে গেছে। ছেলেপুলে কিছু নেই।
এইসব পাগলামী চিন্তা একদম করবে না। স্টপ। কমপ্লিট সটপ।
এ্যানা তরল গলায় বলল, কষ্ট করতে ভাল লাগে না। বড়লোকের বউ হতে ইচ্ছা করে। রোজ গাড়ি করে ঘুরব। আমি এখন যাচ্ছি। মার বোধহয় ঘুম ভেঙেছে। ঘুম ভেঙে আমাকে না। দেখলে পাগলের মত হয়ে যাবে।
বিয়ের ব্যাপারটা ঠাট্টা না সত্যি?
ঠাট্টা ভাবলে ঠাট্টা। সত্যি ভাবলে সত্যি।
এ্যানা চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে শাড়ির আঁচলে মুখ মুছল। হীরুর দিকে না তাকিয়ে বলল,–যাই। হীরু কিছুই বলতে পারল না। তার মনে হল সে ঠিকমত নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। যতটা বাতাস তার দুই ফুসফুসের জন্যে দরকার ততটা বাতাস এখন নেই। চায়ের বুড়ো দোকানদারের সামনে হীরু দাঁড়িয়ে রইল, নড়ল না। তার কেবলি মনে হচ্ছে এক্ষুণি এ্যানা নেমে এসে বলবে–আপনার সঙ্গে তামাশা করছিলাম। আপনি এমন বোকা কেন? মেয়েদের কোন কথা চট করে বিশ্বাস করতে নেই–বুঝলেন সাহেব।
এক ঘণ্টা পার হল, এ্যানা নামল না। হীরুর মনে হল নিৰ্ঘাত মার ঘুম ভেঙে গেছে! মাকে খাইয়ে টাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে তারপর নামবে।
অপেক্ষা করতে করতে রাত এগারোটা বাজল। এ্যানা নামল না।
চায়ের দোকানদার এক সময় বলল, আর কত চা খাইবেন? বাড়িত যান–চা বেশি খাওয়া ঠিক না। ভাইজান আপনের চা হইছে তেরটা। আপনের এগারোটা আপার দুইটা। তের টাকা পাওনা।
হীরু টাকা বের করে দিল। হাসপাতালের গেট পার হয়ে খোলা রাস্তায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একজন রিকশাওয়ালা বলল, স্যার ভাড়া যাবেন? সে বিনা বাক্যব্যয়ে রিকশায় উঠে বসল। পরীক্ষণেই নরম গলায় বলল, না। আমি যাব না। ভাই আপনি কিছু মনে করবেন না। এক্সকিউজ করে দেন।
রিকশায় উঠেই তার মনে হয়েছে, এ্যানা নেমে এসে তাকে না দেখে ফিরে যাচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা, এ্যানার মার যদি এই রাতে ভালমন্দ কিছু হয় তাহলে তো বেচারী বিরাট প্রবলেমে পড়বে। এ্যানা তাকে যাই বলুক রাতটা তার থেকে যাওয়াই উচিত।
হীরু দ্বিতীয়বারে ফিমেল ওয়ার্ডে ঢুকতে পারল না। কলাপসেবল গেট অবশ্যি খোলা। দু’জন দারোয়ান সেখানে বসে আছে। তারা পাস না দেখে কাউকে ছাড়বে না। রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান ডিউটিতে আছেন। তিনি খুবই কড়া লোক। পাস ছাড়া কাউকে দেখলে তাদের না-কী চাকরি চলে যাবে।
হীরু রাত একটার দিকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরল। সারা পথ প্রতিজ্ঞা করতে করতে এল–এই জীবনে মেয়েছেলের সঙ্গে সে কোনো কথা বলবে না। মেয়েছেলের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে কাঁচা গু খাওয়া ভাল।
অরু বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গিয়ে বসল। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। অরুর চোখ। আবার ভিজে উঠতে শুরু করল। বড় খারাপ লাগছে। সুমনের জন্যে বুকের মাঝখানে সন্ধ্যা থেকেই যন্ত্রণা হচ্ছিল সেই যন্ত্রণা এখন তীব্র হয়ে তাকে অভিভূত করে দিচ্ছে।
সুমনের বয়স তিন। এই বয়সেই সে সব কথা বলতে পারে। তিনটা ছড়া জানে। তাল গাছ ছড়াটা বলার সময় কেমন এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পুরো ছড়াটা সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বলতে চেষ্টা করে, শেষ পর্যন্ত অবশ্যি পারে না। ধুপ করে পড়ে যায়। তখন ছলোছলো চোখে বলে–আম্মা, তালগাছ ব্যথা দেয়।
অরুকে তখন বলতে হয়–আহারে ময়না সোনা।
দিনের মধ্যে কতবার যে ধূপ করে এসে তার কোলে বসবে মিষ্টি মিষ্টি গলায় বলবে, আদর খাও আম্মা। আদর খাও।
তখন অরুকে হামহুম করে আদর খাওয়ার ভঙ্গি করতে হয়। আর হেসে লুটুপুটি খায় সুমন। হাসির মধ্যেই সুমন বলে, আরো আদর খাও আম্মা। আরো খাও।
তুমি বড় বিরক্ত করছ, সোনামণি। এখন যাও খেলা কর।
না। আম্মা তুমি আদর খাও।
সুমনের ছোট হল রিমন। বয়স দেড় বছর। এমন শান্ত বাচ্চা এ পৃথিবীতে আর জন্মেছে বলে অরুর মনে হয় না। ক্ষিধে পেলেও কাঁদবে না। মুখে চুকচুক শব্দ করতে থাকবে। একবার খাইয়ে দিলে হাত-পা এলিয়ে ঘুমুবে কিংবা নিজের মনে খেলা করবে।
