বিছানায় চারজনের একসঙ্গে জায়গা হয় না। সুমন ঘুমায় তার দাদীর সঙ্গে। রাতের বেলা চুপিচুপি উঠে এসে অরুর পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে। এক’দিন দু’দিন না, এই কাণ্ড হয় রোজ রাতে। আজ বেচারা কার সঙ্গে ঘুমিয়েছে? ঘুম ভেঙে সে কী অরুকে খুঁজছে না?
অরুর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।
তিথি এসে অরুর সামনে দাঁড়াল। কোমল গলায় বলল, আপা।
অরু চোখ তুলে তাকাল। কিছু বলল না। সে কান্না থামাতে চেষ্টা করছে, পারছে না। কান্না বন্যার জলের মত। বাঁধ দিতে চেষ্টা করলেই যেন বড় বেশি ফুলে ওঠে।
এস আপা বিছানায় শুয়ে গল্প করি।
অরু ধরা গলায় বলল, সুমনের জন্যে মনটা ভেঙে যাচ্ছে রে তিথি।
খুব বেশি খারাপ লাগলে ফিরে যাও।
না-রে ফিরে যাওয়া যাবে না।
এখানে তুমি যে কষ্ট পাবে তারচে বেশি কষ্ট কী দুলাভাইয়ের ওখানে? ওখানে তো তোমার সুমন, রিমন আছে। এখানে কে আছে? আমরা তোমার কেউ না আপা। এস ঘুমুতে এস।
অরু উঠে এল, এখন সে শান্ত। এখন আর কাঁদছে না। কাঁদারও হয়ত সীমা আছে। সীমা অতিক্রম করার পর কেউ কাঁদতে পারে না। সে শুয়েছে তিথির সঙ্গে। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। আবার উঠে বসে। খাট থেকে নেমে বারান্দায় যায়, জলচৌকির উপর গিয়ে বসে। তিথি এক সময় বলল, বড় বিরক্ত করছি আপা।
ঘুম আসছে না।
চুপচাপ শুয়ে থাক। ছটফট করে লাভ হবে কিছু?
অরু ক্ষীণ গলায় বলল, এখানে এসে ভুল করেছি। তাই না?
ভুল করেছ কি শুদ্ধ করেছ তা জানি না। কোনটা ভুল কোনটা ভুল না, তা এখন আব্বা আমি জানি না।
তোরা সবাই বদলে গেছিস।
তিথি তরল গলায় হেসে উঠল। অরু তীক্ষু গলায় বলল, হাসছিস কেন?
সিরিয়াস সিরিয়াস সময়ে আমার কেন জানি হাসি আসে।
তোর সম্পর্কে যে সব শুনি সেগুলি কী সত্যি?
কি শোন?
অরু চুপ করে রইল। তিথি বলল, মুখে আনতে লজ্জা লাগছে, তাই না? তোমার কী আমার সঙ্গে ঘুমুতে এখন ঘেন্না লাগছে? ঘেন্না লাগলে মায়ের সঙ্গে ঘুমাও।
যা শুনছি সবই তাহলে সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি।
বলতে তোর লজ্জা লাগল না।
না।
আমি হলে গলায় দড়ি দিয়ে মরে যেতাম।
না মরতে না। এই যে এত যন্ত্রণার মাঝ দিয়ে তুমি যাচ্ছ তুমি কী গলায় দড়ি দিয়েছ? দাওনি। বাঁচার চেষ্টা করছ। করছ না?
অরু ক্ষীণ গলায় বলল, বাচ্চা দুটার জন্যে বেঁচে আছি। নয়ত কবেই…
তিথি আবার হেসে উঠল। অরু বলল, হাসিস না।
আচ্ছা যাও হাসব না। তুমিও ঘুমুবার চেষ্টা কর।
ঘুম আসছে না।
আমার কাছে ঘুমের অষুধ আছে, খাবে? মাঝে মাঝে আমি খাই। দু’টা আস্ত বোতল আছে এককটাতে বত্ৰিশটা করে ট্যাবলেট–এর পনেরটা খেলেই ঘুম হবে খুবই আনন্দের। খাবে আপা?
অরু কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ঠাট্টা করছিস তিথি? আমার এই অবস্থায় তুই ঠাট্টা করতে পারিস?
হ্যাঁ পারি। আমি যে কী পরিমাণ বদলে গেছি। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
তুই আমাকে ফিরে যেতে বলছিল?
বলছি।
একটা ব্যাপার শুধু তোকে বলি তার পরেও যদি তোর মনে হয় আমার চলে যাওয়াই ভাল, আমি চলে যাব।
বেশ তো বল।
অরু কিছু বলল না, চুপ করে রইল। তিথি বলল, বলতে যদি তোমার খারাপ লাগে তাহলে বলার দরকার নেই।
খারাপ লাগবে না, তুই শোন কোন-একজনকে বলার দরকার। কাকে বলব বল? আমার বলার লোক নেই।
অরু খানিকক্ষণের জন্যে থামল। তারপর নিচু গলায় বলতে লাগল–তোর দুলাভাই যে খুব নামাজী মানুষ তা তো তুই জানিস। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, তাহাজ্জুত পড়ে। রোজ ভোরবেলা আধঘণ্টা কুরআন শরীফ পড়ে।
রাতের বেলা সে কখনো স্বামী-স্ত্রীর ঐ ব্যাপারটায় যাবে না। কারণ তাতে তার শরীর অপবিত্র হবে। গোসল করতে হবে, নয়ত ফজরের নামাজ হবে না। কাজেই সে ফজরের নামাজ শেষ করে কুরআন শরীফ পড়া শেষ করে আমার ঘুম ভাঙাবে। দিনের পর দিন এই যন্ত্রণা। শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে কী প্রেম-ভালবাসা থাকতে নেই? তুই কী আমার যন্ত্রণা বুঝতে পারছিস তিথি?
পারছি।
আরো শুনবি?
না।
তিথি দু’হাতে বোনকে জড়িয়ে ধরল। দু’জন দীর্ঘ সময় বসে রইল চুপচাপ। এক সময় অরু বলল, বাচ্চা দুটাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না রে তিথি। আমি কাল সকালে চলে যাব।
তিথি কিছু বলল না। অনেক’দিন পর তার কান্না পাচ্ছে, অনেক অনেক দিন পর।
অজন্তা ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকল
ফরিদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কে?
দরজার পাশ থেকে কে যেন সরে গেল। ফরিদা বললেন, ভেতরে এস অজন্তা। অজন্তা ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকল। তার গায়ে স্কুলের পোশাক, হাতে বই-খাতা এবং পানির ফ্লাস্ক। বলল, স্কুলে যাচ্ছ? অজন্তা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মাকে সে খুব ভয় পায়।
তুমি আরেকটু কাছে আসি তো। তোমাকে ভাল করে দেখি। অজন্তা পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। ফরিদা বললেন, তুমি আগের চেয়ে একটু লম্বা হয়েছ তাই না?
হুঁ।
কত লম্বা হয়েছ জানো সেটা? মেপেছ কখনো?
না।
তাহলে বুঝলে কী করে লম্বা হয়েছ?
জামাটা ছোট হয়েছে।
তাই তো, জামা ছোট হয়েছে। আজ তোমার বাবাকে বলবে কাপড় কিনে যেন দরজির দোকানে দিয়ে আসে।
আচ্ছা।
তুমি কী স্কুলে যাবার আগে রোজই আমার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাক?
অজন্তা জবাব দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল।
আমি বেঁচে আছি কিনা তাই দেখ, ঠিক না?
অজন্তা কথা বলল না, মাথাও তুলল না। তার খুব অস্বস্তি লাগছে। মাকে কেন জানি একই সঙ্গে ভয় লাগে এবং ভাল লাগে।
ফরিদা বললেন, আমি আরো মাসখানিক বেঁচে থাকব।
