এ্যানার মা চারদিন হল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বেশির ভাগ সময় রাতে এ্যানা তাঁর সঙ্গে থাকে। ভাগ্য ভাল হলে আজও হয়ত সেই আছে।
অবশ্যি হাসপাতালে গিয়েও কোনো লাভ হবে না। ভদ্রমহিলার এখন-তখন অবস্থা। সারাক্ষণই নাকে অক্সিজেনের নল ফিট করা। মাকে এই অবস্থায় ফেলে মেয়ে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে বকবক করবে না। তবু চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।
ফিমেল ওয়ার্ডের দোতলায় জানালা ঘেঁষে এ্যানার মার বেড়। ফিমেল ওয়ার্ডে যাবার ব্যাপারে খানিকটা কড়াকড়ি আছে। হীরুর তেমন সমস্যা ছিল না। কলাপসেবল গেটের দারোয়ানকে কাঁদো। কাঁদো গলায় বলল, ভাই আমার মা ছিলেন হাসপাতালে। মারা গেছেন এ রকম সংবাদ পেয়ে এসেছি। একটু যদি কাইন্ডলি…
হাসপাতালের লোকজনও মৃত্যুর খবরে বিচলিত। দারোয়ান তাকে ছেড়ে দিল। হীরু চলে এল দোতলায়। আশ্চৰ্য ব্যাপার এ্যানা বারান্দাতেই আছে! রেলিং-এ ভর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁদছে নাকি? তার মার কি ভাল-মন্দ কিছু হয় গেল? তেমন কিছু হলে চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তোলার কথা। হাসপাতালে বোধ হয় সে রকম কিছু করার নিয়ম নেই।
এই এ্যানা?
এ্যানা চমকে তাকাল। বিরক্ত গলায় বলল, আবার হাসপাতালে চলে এসেছেন? পরশু দিন না বললাম হাসপাতালে আসবেন না।
তোমার কাছে তো আসিনি। আমার এক ক্লোজ ফ্রেন্ড ইমতিয়াজ, ব্যাটার হঠাৎ পেটে ব্যথা, অ্যাপেনডিসাইটিস-ফাইটিস হবে। হাসপাতালে নিয়ে এসেছি, ব্যাটার এখন অপারেশন হচ্ছে। অপারেশন হওয়া পর্যন্ত থাকতেই হবে। কাজেই ভাবলাম খোঁজ নিয়ে যাই। তোমার মা, তার মানে বলতে গেলে আমারো মা।
আপনার মা হবে কেন? কি-সব উল্টাপাল্টা কথা বলেন!। এইসব আর করবেন না। রাগে গা জ্বলে যায়।
উনি আছেন কেমন?
তা দিয়ে আপনার দরকারটা কি? মার খোঁজে তো আপনি আসেননি।
তোমার মার খোঁজে আসিনি– তাহলে এলাম কেন?
এসেছেন আমাকে বিরক্ত করতে।
হীরু অতি দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল, নিচু গলায় বলল, এখানে সিগারেট খাওয়া যায় এ্যানা?
না, খাওয়া যায় না। আপনি এখন চলে যান তো।
তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছো কেন?
মা ঘুমুচ্ছে তাই দাঁড়িয়ে আছি।
তুমি ঘুমাও কোথায়?
ঘুমাবো। আবার কোথায়? এখানে কেউ কি আমার জন্যে বিছানা করে রেখেছে?
সারা রাত জেগে থাক?
হুঁ, অনেকেই বারান্দায় চাদর পেতে ঘুমায়। আমি পারি না। ঘেন্না লাগে।
বলতে বলতে এ্যানা হাই তুলল। বেচারীর শরীর খারাপ হয়ে গেছে, ভেজা ভেজা চোখ। মুখ শুকিয়ে কেমন হয়ে গেছে। হীরুর মনটা মায়ায় ভরে গেল। সে কোমল গলায় বলল, চা খাবে নাকি এ্যানা?
কি-সব কথাবার্তা আপনার। এখানে চা খাব কোথায়? এটা কি রেস্টুরেন্ট?
হাসপাতালের গেটের ভেতর এক বুড়ে চা বিক্রি করছে। চা খেলে তোমার রাত জাগতে সুবিধা হবে। চল না।
এক কাপ চা খেলেই আপনি চলে যাবেন?
চলে যাব না তো কি? আমার ঐ ফ্রেন্ডের অপারেশনের কি হল খোঁজখবর করে বাসায় যেতে হবে। বিরাট সমস্যা বাসায়। আমার বড় বোন পালিয়ে চলে এসেছে। হেভি ক্রাইং হচ্ছে।
আপনার বাসাটা তো খুব অদ্ভুত। সব সময কেউ পালিয়ে যাচ্ছে। কিংবা পালিয়ে আসছে।
হীরু এর উত্তর দিল না। তার বড় ভাল লাগছে। রাতের বেলা এ্যানাকে পাশে নিয়ে চা খাওয়া, এত আনন্দ সে রাখবে কোথায়? মেয়েটা যে তার দিকে কি রকম উইক এই ঘটনায় তাও প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। এক কথায় চা খেতে চলল। এদিকে তার মা এখন-তখন অবস্থা। মুখে অবশ্যি এই মেয়ে সারাক্ষণ উল্টো কথা বলছে। তা বলুক, এটা মেয়েছেলের ধর্ম। সোজা কথা সোজাভাবে বললে আর মেয়েছেলে রইল কোথায়?
চায়ে চুমুক দিয়ে এ্যানা বলল, চাটা তো ভাল। হীরু দরাজ গলায় বলল, ভাল লাগলে আরেক কাপ খাও।
এ্যানা হেসে ফেলল। এত সুন্দর লাগল মেয়েটার হাসিমুখ। আজ আবার শাড়ি পরেছে। ছাপা শাড়ি। পরীর মত লাগছে দেখতে। আল্লাহতালা মেয়েগুলিকে এত সুন্দর করে পাঠিয়েছেন কেন কে জানে। মেয়েদের সবই সুন্দর। এরা রাগ করলেও ভাল লাগে, অপমান করলেও ভাল লাগে। ভালবাসার কথা বললে কেমন লাগবে কে জানে। এ্যানার মুখ থেকে ভালবাসার একটা কথা শুনতে ইচ্ছা করে।
বলুন কি বলবেন?
আমি নিজে চায়ের দোকান দিচ্ছি। ভেরি সুন।
খুব ভাল।
নাম একটা মনে মনে ঠিক করে রেখেছি। এখনো ফাইন্যাল করিনি। নাম হচ্ছে–এ্যানা টি স্টল।
এ্যানা চায়ে চুমুক দিয়েছিল। হঠাৎ হাসি এসে যাওয়ায় বিষম খেল। হীরু অপ্রস্তুত গলায় বলল, হাসির কি হল?
কিছু হয়নি, এমনি হাসছি।
পীর সাহেবের কথামত দিচ্ছি। পীর সাহেব বলে দিলেন।
চায়ের দোকান দিতে বললেন।
হুঁ।
পীর সাহেবের কথা ছাড়া আপনি কিছুই করেন না?
না।
তাহলে উনার কাছে আমি একদিন যাব।
হীরু উৎসাহিত হয়ে উঠল। উৎসাহটা প্রকাশ করল না। মেয়েটা ঠাট্টা করছে কি না বুঝতে পারল না। ঠাট্টা হবারই সম্ভাবনা।
উনার কাছে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে যেতে হবে তাই না?
হুঁ। টাকা-পয়সা নেন না। টাকা-পয়সা উনার কাছে তেজপাতা।
দিনে ক প্যাকেট সিগারেট পান?
অনেক। ত্রিশ চল্লিশ, পঞ্চাশ।
একটা মানুষ কি এত সিগারেট খেতে পারে?
হীরু সাবধান হয়ে গেল। প্রশ্ন কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে পারল না। এই মেয়ে বড়ই ধুরন্ধর। এই মেয়েকে বিয়ে করলেই জীবনটা শেষ হয়ে যাবে।
এ্যানা বলল, আপনার পীর সাহেব ঐ সব সিগারেট বাজারে বেচে দেয়। এখন বুঝলেন ব্যাপারটা? পঞ্চাশ প্যাকেট সিগারেট একটা লোক খেতে পারে না, তাই না?
