আপনাদের চিবুকে তিল ছিল বলেই আপনাদের এত বন্ধুত্ব ছিল?
শুধু তিল না। আরো অনেক মিল ছিল আমাদের মধ্যে। আমরা তিনজনই বেশ ভাল ছাত্রী ছিলাম। একজন তো ছিল খুবই ভাল ছাত্রী। স্কুলে বরাবর ফাস্ট সেকেন্ড হত। অথচ ম্যাট্রিক রেজাল্ট বের হলে দেখা গেল। তিনজনই সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছি।
তাই নাকি?
কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ার সময়ই তিনজনের বিয়ে হয়ে গেল। তার পরেও মিল আছে। বল তো মিলটা কি?
আপনারা তিনজনই এখন অসুস্থ?
না। দু’জন মারা গেছে। আমি শুধু বেঁচে আছি। এই বাঁচা তো মৃত্যুর মতই। তাই না?
হ্যাঁ তাই! আপনার ঐ দুই বান্ধবী কিভাবে মারা গেলেন?
প্রথম মারা গেল তৃণা। বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গেল। তারপর মারা গেল বরুনা। ম্যানিনজাইটিস হয়েছিল।
কথা বলতে বলতে ফরিদা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। হাতের ইশারায় তিনি তিথিকে পানির গ্লাস আনতে বললেন। তিথি পানি এনে দিল। সবটা খেতে পারলেন না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন। তিথি বলল, আপনার কি কষ্ট হচ্ছে?
হ্যাঁ।
কোনো ওষুধপত্র কি আছে যা খেলে কষ্ট কমবে?
না।
আমি কি চলে যাব? নাকি আপনি আমাকে আরো কিছু বলবেন?
ফরিদা চোখ না মেলেই বললেন, যাও।
তিথি বলল, আপনার কি খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?
হুঁ।
আমি বরং আপনার পাশে বসে থাকি। ব্যথা যখন আরেকটু কমবে তখন যাব।
ব্যথা কমবে না। তুমি যাও।
তিথি উঠে দাঁড়াতেই ফরিদা বললেন, একটু বস। তিথি বসল না। দাঁড়িয়ে রইল। ফরিদা চোখ মেলে তাকালেন। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, তোমার নিচের চিবুকেও তিল আছে এটা কি তুমি কখনো লক্ষ্য করেছ? তিথি কিছু বলল না। ফরিদা কঠিন কণ্ঠে বললেন, তোমার ভাগ্য ও আমার মতই হবে।
হলে কি আপনি খুশি হন?
না খুশি হই না।
তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তার বন্ধ চোখের পাতা উপচে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। মানুষের মন বড় বিচিত্র। তিথি ফরিদার চোখের পানি দেখে হঠাৎ অভিভূত হয়ে গেল। তার নিজের বুক ঠেলে কান্না উঠে আসতে লাগল।
ফরিদা বললেন, তুমি কি একটু অজন্তার বাবাকে ডেকে আনবে? পাঁচটার মধ্যে সে আসে। এখন পাঁচটা দশ বাজে। সে নিচে আছে।
তিথি দবির উদ্দিনকে পেল না। বসার ঘরে অজন্তা একা একা বসে ছিল। সে বলল, বাবা ছিলেন, আপনি এসেছেন শুনে শার্ট গায়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেলেন। বলতে বলতে অজন্তা মুখ টিপে হাসল। এবং একটু যেন লজ্জাও পেল। এই লজ্জার কারণ তার নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।
অরু এসে উপস্থিত
ভাদ্র মাসের শুরুতে অরু এসে উপস্থিত। হাতে একটা সুটকেস। তাকে নিয়ে এসেছে। সদ্য গোঁফ উঠা মুখচোরা ধরনের এক ছেলে। ভীতু ছাউনি, একবারও মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছে না। স্যুটকেস নামিয়ে রেখেই সে উধাও হয়ে গেল। মিনু বললেন, ব্যাপার কি রে?
অরু মায়াকান্না জুড়ে দিল।
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে ভাঙা ভাঙা কথা থেকে যা জানা গেল তা হচ্ছে– স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে পালিয়ে এসেছে। যে তাকে পৌঁছে দিয়েছে তার নাম সাঈদ। কলেজে আইকম পড়ে। পাশের বাড়িতে লজিং থাকে। মিনু কঠিন গলায় বললেন, তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পেটে ছয় মাসের বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে চলে এলি? তার আগে বিষ খেয়ে মরতে পারলি না। বাজারে বিষ পাওয়া যায় না?
অরু শুকনো গলায় বলল, সব কিছু না শুনেই তুমি এই কথা বললে? বেশ, বিষ এনে দাও আমি খাব। সময় তো শেষ হয়ে যায়নি।
জালালুদ্দিন বললেন, কি শুরু করলে মিনু, মেয়েটা একটু ঠাণ্ডা হোক। সব আগে শুনি। না শুনেই বকাঝকা।
মিনু ঝাঝিয়ে উঠল, সব কিছুর মধ্যে কথা বলবে না। কথা শোনা শুনির এখানে কি আছে? বোকার বেহদা মেয়ে। পেটে ছমাসের বাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে। কি সর্বনাশের কথা!
জালালুদ্দিন বললেন, একটা ব্যবস্থা হবেই। এত চিন্তার কি? বিপদ দেবার মালিক যিনি, বিপদ ত্ৰাণ করার মালিকও তিনি। তুমি এক কাপ গরম চা মেয়েটিকে দাও। মুড়ি থাকলে তেলমরিচ দিয়ে মেখে দাও। অরু মা, তুই আয় আমার কাছে। ঘটনা কি শুনি। মিনু বললেন,
তোমাকে কোনো ঘটনা শুনতে হবে না।
তিনি মেয়েকে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, এখন বল কি হয়েছে? তোর এত বড় সাহস কেন হল শুনি! অরু কিছুই বলল না, মাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। সমস্ত দিনেও এই কান্না থামল না।
তিথি এল চারটার দিকে। তিথিকে দেখে অরুর কান্না আরো বেড়ে গেল। জালালুদ্দিন বললেন, মেয়েটা কিছুই খায়নি। তিথি মা দেখ তো কিছু খাওয়াতে পারিস কি-না! বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। বেশি কান্না ভাল না। চোখের ক্ষতি হয়।
হীরু এল সন্ধ্যার আগে আগে। সে কিছু না শুনেই খুব লাফঝাপ দিতে লাগল–দুলাভাই বলে রেয়াত করব না। চটি জুতা দিয়ে পিটিয়ে চামড়া ঢিলা করে দেব। দাঁত সব কটা খুলে ফেলব। শালাকে ডেনটিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত বাধাতে হবে। তিথি এসে ধমক দিয়ে হীরুকে থামাল। এবং বুঝিয়ে-সুঝিয়ে টেলিগ্রাম করতে পাঠাল। টেলিগ্রাম করা হবে। আবদুল মতিনকে। সেখানে লেখা থাকবে, অরু এখানে আছে। চিন্তার কোনো কারণ নাই।
হীরু টেলিগ্রাম করে টাকা নষ্ট করার তেমন কোনো প্রয়োজন অনুভব করল না। বললেই হবে–টেলিগ্রাম করা হয়েছে। চিঠি যদি মিস হতে পারে তাহলে টেলিগ্রাম ও হতে পারে। বর্তমানে হাত একেবারেই খালি! টেলিগ্রাম উপলক্ষে পাওয়া বিশ টাকার নোটটা কাজে লাগবে। হীরু চলে এল ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে।
