তিথি কাপড় বদলাল।
হালকা রঙের একটা শাড়ি পরল। চুলে বেণী করল। আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবল একটু কাজল কি দেবে? চোখের পল্লব ঘেঁষে হালকা রেখা যা চোখে পড়বে না। আবার পড়বেও।
মিনু ঘরে ঢুকে দেখলেন তিথি খুব সাবধানে চোখে কাজল দিচ্ছে। তিথি থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিথি বলল, তুমি কিছু বলবে?
না।
তাহলে দাঁড়িয়ে আছ কেন? চলে যাও।
মিনু ক্ষীণ স্বরে বললেন, তুই কি আমাকে দেখতে পারিস না। তিথি? তিথি মার দিকে না। তাকিয়ে বলল, না। পারি না।
আমি কি করেছি? আমার দোষটা কী?
তোমাকে কি আমি কোনো দোষ দিয়েছি? দোষ ছাড়াই তোমাকে দেখতে পারি না।
মিনু খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আগের চেয়েও ক্ষীণ গলায় বললেন, অরু চিঠি দিয়েছে।
তিথি কিছু বলল না।
মিনু বললেন, তোর টেবিলের উপর রেখেছি।
আমার টেবিলের উপর রেখেছ কেন? আমি ঐ সব চিঠি-ফিঠি পড়ব না। ভাল্লাগে না।
মিনু চলে গেলেন। তিথি অবশ্যি ঘর থেকে বেরুবার আগে বোনের চিঠি পড়ল। একবার না। দুবার পড়ল। খুবই সংক্ষিপ্ত চিঠি। মার কাছে লেখা।
মা,
আমার সালাম নিও। আমি বুঝতে পারছি, তোমাবা ওর টাকাটা দিতে পারছ না কিংবা দিচ্ছ না। আমি ঐ নিয়ে আর কিছু বলব না। কিন্তু মা তোমার পায়ে পড়ি আমাকে কিছু দিন তোমাদের কাছে এনে রাখ। এখানে আমি মরে যাচ্ছি। হীরুকে পাঠাও মা, আমাকে নিয়ে যাক।
তোমার অরু।
এত সংক্ষিপ্ত চিঠি অরু কখনো লেখে না। তার চিঠি হয় দীর্ঘ। চিঠির শেষের দিকে এসে বাবার বাড়ির সবার সম্পর্কে কিছু না কিছু লেখা থাকে। এই চিঠিতে সে সব কিছু নেই। তিথি ভাবতে চেষ্টা করল। বড়। আপা কি ধরনের কষ্টে আছে? কষ্টের নমুনাটা কি? বড় আপার কষ্টের সঙ্গে তার নিজের কষ্টের কি কোনো মিল আছে? সম্ভবত নেই। সে যে জাতীয় যাতনা বোধ করছে বড় আপার সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, ধারণা থাকার কথাও না। তার বয়স তখন কত? পনেরো কি ষোল? এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তখনো রেজাল্ট হয়নি। বাবা তাকে পাঠালেন। মনজুর সাহেবের কাছে। বাবার দূর-সম্পর্কের ভাই। তিথি তাকে কখনো দেখেনি। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এ জি অফিসে কাজ করেন। থাকেন সরকারি কোয়ার্টারে। তাকে একটা চিঠি দিতে হবে। চিঠিটা বাবার জবানীতে লিখেছে। তিথি। চিঠির বিষয়বস্তু খুবই সাধারণ জালালুদ্দিন সাহেব তাঁর ফুফাতো ভাইকে জানাচ্ছেন যে তিনি সাময়িকভাবে খুবই অসুবিধায় পড়েছেন। যদি দুশ টাকা তাকে দেয়া হয় তাহলে তিনি চির কৃতজ্ঞ থাকবেন। টাকাটা তিনি সামনের মাসে যে করেই হোক ফেরত দেবার ব্যবস্থা করবেন। তিনি নিজেই আসতেন ইদানীং চোখের একটা সমস্যার জন্যে আসতে পারছেন না।
চিঠি নিয়ে যাবার কথা হীরুর। সে গম্ভীর গলায় বলল, এটা তো ভিক্ষা চাওয়া চিঠি। যাকে বলে বেগিং। আমি বেগিং বিজনেসে থাকতে পারব না। জালালুদ্দিন কিছুতেই তাকে রাজি করাতে পারলেন না। শেষটায় মেয়েকে বললেন, তুই যাবি তিথি? গভৰ্মেন্ট কোয়ার্টার। খুঁজে বের করতে কোনো অসুবিধা হবে না। পারবি মা?
তিথি বলল, উনি যদি চিনতে না পারেন?
বলিস কি তুই? চিনতে পারবে না। মানে! পরিচয় পেলে দেখবি কত খাতির-যত্ন করে।
টাকা যদি না দেন তাহলে তো বাবা খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।
তোর কিসের লজ্জা? তুই তো আর টাকা চাসনি। আমি চেয়েছি। লজ্জা হলে আমার হবে।
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে উনি খুব খারাপ ব্যবহার করবেন! বিরক্ত হবেন।
আহা গিয়ে দেখি না। বিশিষ্ট ভদ্রলোক।
যদি চিনতে না পারেন?
মনজুর সাহেব তাকে চিনতে পারলেন। হাসিমুখে বললেন, তোমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছি। তোমার মনে নেই। তবে তোমার বড় বোনের নিশ্চয়ই মনে আছে। কি নাম যেন তার? অরুমিনা না?
জি। ডাকনাম অরু।
তোমার বাবার তো আমার খুব কাব্যিক নাম রাখার বাতিক। তোমার নাম কি?
তিথি।
বাহ খুব সুন্দর নাম। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন। তিথিদের অবস্থা শুনে খুবই দুঃখিত হলেন এবং আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, এই সাময়িক সাহায্য তো কিছু হবে না। স্থায়ী কিছু করতে হবে। কিভাবে করা যায় সেটা হচ্ছে কথা। তোমার ভাইকে পাঠিয়ে দিও। আমার কিছু জানাশোনা আছে দেখি কোথাও লাগিয়ে দেয়া যায় কি-না। তিথির মনে যে চাপা উদ্বেগ ছিল তা দূর হয়ে গেল। বাবার এই ফুফাতো ভাইকে তার পছন্দ হল। ছোটখাটো মানুষ। সারাক্ষণ পান খাচ্ছেন। একটু পরপর পানের রস গড়িয়ে পড়ছে। সরুয়া টানার মত সেই রস টেনে নিচ্ছেন। মাথায় এক গাছিও চুল নেই। চকচকে টাকা। কিছুক্ষণ পরপর টাকে হাত বুলাচ্ছেন। তখন তাঁর মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয় টাকে হাত বুলিয়ে তিনি খুব আরাম পাচ্ছেন। তিথি খানিক গল্পগুজবও করল। সহজ স্বরে বলল, বাসায় আর কেউ নেই কেন? চাচী কোথায়?
ও থাক, গফরগাঁয়ে। ছেলেমেয়েরা ঐখানেই স্কুলে-কলেজে পড়ে। ঢাকার এত খরচ চালান কি সোজা ব্যাপার। সরকারি বাসা পাওয়ায় রক্ষা হয়েছে। অর্ধেক সাবলেট করে দিয়েছি। আমি দু’টা ঘর নিয়ে থাকি।
একা একা খারাপ লাগে না আপনার?
না। সপ্তাহে সপ্তাহে যাই। বৃহস্পতিবারে দুপুরে চলে যাই শনিবার সকালে আসি। খানিকটা কষ্ট হয়। কি আর করা বল।
খাওয়া-দাওয়া কোথায় করেন?
বেশির ভাগ সময় নিজেই রাঁধি। বাইরেও খাই।
তিনি তিথিকে সুজির হালুয়া রেঁধে খাওয়ালেন। দু’শ টাকা দিয়ে নিজে এসে একটা রিকশা ঠিক করে রিকশা ভাড়াও দিয়ে দিলেন। তিথিকে বললেন, একা একা ঢাকা শহরে ঘোরাফিরা করা ঠিক না। তোমার বাবাকে বলবে। আর যেন তোমাকে এ ভাবে না পাঠান।
