তিনি বারান্দায় এসে আছেন। সকাল নটার মত বাজে। বাড়িতে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। মিনু গেছেন বাজারে। তিথি কোথায় গেছে। তিনি জানেন না। যাবার আগে তাকে বলে যায়নি। হীরু গত রাতে বাড়ি ফিরেনি। টুকু অবশ্যি রাতে বাড়িতেই ছিল। ভোরবেলা কোথায় বেরিয়ে গেছে। এই ছেলে কখন আসছে কখন যাচ্ছে কোনো ঠিক নেই। শক্ত মারধব করতে পারেন না। এই একটা সমস্যা। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হয় মায়ের দায়িত্বটা তাকেই নিতে হবে। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই নিতে হবে।
টুকু থাকলে সুবিধা হত। এই যে লোকটা এতক্ষণ এসেছে। কথাবার্তা বলছে না দাঁড়িয়ে আছে, তার ব্যাপারটা কি তা টুকু চট করে ধরে ফেলত। লোকটা কোনো বদ মতলবে এসেছে কিনা কে জানে।
জালালুদ্দিন আবার বললেন, কে?
লোকটি এইবার কথা বলল। তার গলার স্বর নরম এবং সে ইতস্তত ভঙ্গিতে কথা বলছে। কাজেই লোকটা সম্ভবত খারাপ না। খারাপ লোক এইভাবে কথা বলে না।
আমার নাম দবির। আমার ছোটখাটো ব্যবসা আছে। আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনার সঙ্গে আগে আমার দেখা হয়নি।
দেখা হলেও চিনতাম না। আমি চোখে দেখি না।
তাই নাকি?
জালালুদ্দিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, বিরাট যন্ত্রণায় আছি ভাই। আপনি বাইরের মানুষ। ভেতরের কথা আপনাকে কি বলব? সামান্য চিকিৎসা করালেই অসুখ সারে। সেটা কেউ করাবে না। আপনি কার কাছে এসেছেন?
দবির ইতস্তত করে বললেন, পরী কিংবা তিথি বলে কেউ কি এখানে থাকেন?
পরী বলে কেউ থাকে না। তবে তিথি আছে। আমার দ্বিতীয় কন্যা। ভাল নাম ইশরাত জাহান। ও কোথায় যেন গেছে।
কোথায় গেছে জানেন?
জি না। আমাকে কিছু বলে যায়নি। আগে বলত এখন আর বলে-টলে না। সম্ভবত ওর মাকে বলে গেছে। বসুন, ওর মা এসে পড়বে। ওর মা কাঁচার বাজারে গেছে। ঘরে কাজের লোক নেই। নিজেদেরই সব করতে হয়। ঐখানে একটা জলচৌকি আছে। টেনে নিয়ে বসুন। ঘরের ভেতর চেয়ার আছে, ঘরে তালা দিয়ে গেছে এই জন্যে চেয়ার দিতে পারছি না। নিজগুণে ক্ষমা করবেন।
দবির বললেন, আমি বসব না। কাজ ফেলে এসেছি। আপনি দয়া করে তিথিকে বলবেন, আমি এসেছিলাম। নাম বললেই হবে। আমার নাম দবির তাকে একটু বলবেন যেন আমার বাসায় যায়। আমার স্ত্রীর কিছু কথা আছে তার সঙ্গে। জরুরি কথা।
বলব। অবশ্যই বলব। বাসার ঠিকানা কি তিথি জানে?
জি জানে। তাছাড়া এই কার্ডটাও রেখে গেলাম। কার্ডে ঠিকানা আছে।
বলব। তিথি আসলেই বলব। তা এসেছেন যখন খানিকক্ষণ বসেই যান। আমার স্ত্রী এসে পড়বেন। তখন চা খেতে পারবেন। কষ্ট করে এসেছেন। শুধু মুখে যাবেন। এটা কেমন কথা।
জি না। আজ আর বসব না।
জালালুদ্দিন খানিকক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত থেকে বললেন, ভাইসাব আপনার কাছে সিগারেট আছে? প্যাকেটটা রয়েছে ভেতরে। আমার স্ত্রী ঘরে তালা দিয়ে চলে গেলেন। চাবিটাও নেই। থাকলে আপনাকে বলতাম না।
দবির বললেন, সিগারেট তো আমি খাই না। তবে এনে দিচ্ছি।
তাহলে দরকার নেই। বাদ দেন। সঙ্গে থাকলে ভিন্ন কথা।
কোনো অসুবিধা নেই।
জালালুদ্দিন, এই অপরিচিত লোকটির ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। লোকটা এক প্যাকেট ফাইভ ফাইভ এবং একটা দিয়াশলাই কিনে দিয়ে গেছে। শুধু তাই না। একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে গেছে। এরকম একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোকের সঙ্গে তার মেয়ের পরিচয় আছে ভাবতেই ভাল লাগছে। এমন চমৎকার একজন মানুষকে চা খাওয়ানো গেল না। এই দুঃখে তিনি খুবই কাতর হয়ে পড়লেন, পরের বার এলে চা এবং চায়ের সঙ্গে দু’টা মিষ্টি দিতে হবে। এইটুকু ভদ্রতা না করলে খুবই অন্যায় হবে।
মিনু চলে এসেছেন। তাঁর পায়ের শব্দ কানে যেতেই জালালুদ্দিন সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে ফেললেন। মেয়েদের মন থাকে সন্দেহে ভরা। হাজারটা প্রশ্ন করবে। কি দরকার? তিনি উৎসাহের সঙ্গে বললেন, বাজার কি আনলে মিনু?
মিনু জবাব দিলেন না। স্বামীর প্রশ্নের জবাব দেয়া তিনি ইদানীং ছেড়েই দিয়েছেন।
মাছ-টাছ কিছু পাওয়া গেল?
মিনু সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন। না। বাজার নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। জালালুদ্দিন তাতে মন খারাপ করলেন না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বললেন, এক ফোঁটা চা দিও তো মিনু। বুকে কফ বসে গেছে। চা কফের জন্যে খুবই উপকারী। আমার কথা না। বড় বড় ডাক্তাররা বলেন।
মিনু এই কথায় ঝাঝিয়ে উঠলেন না। এটা খুবই ভাল লক্ষণ। হয়ত চা পাওয়া যাবে। চা এলে চায়ের সঙ্গে একটা সিগারেট ধরাতে হবে। সব জিনিসের একটা অনুপান আছে। চায়ের অনুপান হচ্ছে সিগারেট। দৈ-এর অনুপান মিষ্টি।
তিথির অবাক হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।
কিছুতেই সে এখন আর অবাক হয় না। হীরু যদি তাকে কোনোদিন এসে বলে, দেখ তিথি আমি এখন আকাশে উড়তে পারি। এবং সত্যি সত্যি যদি খানিক্ষণ উড়ে দেখায়, তাহলেও বোধ হয়। তিথি অবাক হবে না।
অথচ দাবির উদ্দিনের রেখে-যাওয়া কার্ড দেখে সে অবাক হল। এই লোক তার ঠিকানা পেল কোথায়? সে তো কোনো ঠিকানা রেখে আসেনি। তার ঠিকানা জানার কথা নয়! দবির উদ্দিনের স্ত্রী তার সঙ্গে কথা বলতে চান। এই খবরটিও অবাক হবার মত। তাতে তিথি অবাক হল না। ভদ্রমহিলা অসুস্থ, তার নিশ্চয়ই সময় কাটে না। গল্পগুজব করবার জন্যে তার কিছু মজার চরিত্র দরকার। তিথির মত মজার চরিত্র তিনি আর কোথায় পাবেন।
ঐ বাড়িতে তিথির যেতে ইচ্ছা করছে না। তবু সে হয়ত যাবে। দবির উদ্দিন নামের ঐ লোক তার ঠিকানা কোথায় পেল এটা জানার জন্যেই তাকে যেতে হবে। আর যেতে যখন হবে তখন আজি গেলে কেমন হয়?
