তিথিকে পরের মাসে আবার আসতে হল। এবারের আবেদন একশ টাকার। যে করেই হোক দিতে হবে।
মনজুর সাহেব টাকা দিয়ে দিলেন এবং সেদিনও সুজির হালুয়া রোধে খাওয়ালেন। তবে ঐ দিনের মত গল্পগুজব হল না বা এগিয়ে এসে রিকশা ঠিক করে দিলেন না।
তার পরের মাসে তিথি আবার এল। সারাপথ কাঁদতে কাঁদতে আসল। টাকা চাইতে হবে এই দুঃখে তার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। বাসে বসে তার মন চাইছিল একটা ট্রাকের সঙ্গে এই বাসটার অ্যাকসিডেন্ট হোক। সেই অ্যাকসিডেন্টে সে যেন মারা যায়। সে মরল না। এক সময় মনজুর সাহেবের বাসার কড়া নাড়ল। মনজুর সাহেব দরজা খুললেন তবে তাকে দেখে খুব অবাক হলেন না। শুকনো গলায় বললেন, কি খবর? তিথি মাথা নিচু করে বলল, বাবা একটা চিঠি দিয়েছেন।
আবার চিঠি। এস ভেতরে এস। তিথি ভেতরে এসে বসল। মনজুর সাহেব বললেন, এইবার কত টাকা চেয়েছে?
একশ।
তিথির ধারণা ছিল এবারে তিনি টাকা দেবেন না। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। তিনি পঞ্চাশ টাকার দু’টা নোট তিথির হাতে দিলেন এবং বললেন, ঘেমে-টেমে কি হয়েছে ফ্যানের নিচে বস। বিশ্রাম কর।
জি-না। তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে। টুকুর খুব জ্বর। ডাক্তার আনতে হবে।
দুতিন মিনিট বসে গেলে ক্ষতি হবে না। তিনি হাত ধরে তিথিকে তার পাশে বসলেন। পরমুহুর্তেই তিথিকে জড়িয়ে ধরলেন। তিথি ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। কোনোমতে বলল, ছাডুন চাচা। আমাকে ছেড়ে দিন।
তিনি আহ্ বলে বিরক্ত প্রকাশ করলেন। তিথিকে ছাড়লেন না। তিথি চিৎকার করতে চেষ্টা করলেন, গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না। সিগারেটের গন্ধ ভরা, পান খাওয়া একটা মুখ তার মুখের ওপর লেপ্টে রইল। দু’টি হাত মাকড়সার মতো তার সারা শরীরে কিলবিল করতে লাগল। এর পর কি কি ঘটল। সে মনে করতে পারছে না। শুধু যা মনে আছে তা হচ্ছে সে বেতের সোফায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে। মনজুর সাহেব একটা বাটিতে হালুয়া বানিয়ে তাকে বললেন এই তিথি, নাও হালুয়া খাও। এর পরেও অনেকবার তিথিকে তার কাছে আসতে হয়েছে। প্রতিবারেই মনজুর সাহেব তাকে টাকা দিয়েছেন। এবং বলেছেন, দরকার হলেই আসবে। কোনো অসুবিধা নেই।
তিথি বড় আপার চিঠি টেবিলে রাখতে রাখতে মৃদু স্বরে বলল, তুমি তো সুখেই আছ আপা। কত সুখে আছ তুমি জানো না। জানলে এ রকম চিঠি লিখতে না।
এ হচ্ছে নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলা। নিজের সঙ্গে কথা বলার এই অদ্ভুত অসুখ তিথির ইদানীং হয়েছে। মনে মনে ভাবা কথাগুলি সশব্দে বের হয়ে আসে। রিকশায় আসতে আসতে একবার এরকম হল। রিকশাওয়ালা তিথির বিড়বিড় শুনে চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। অবাক হয়ে বলল, কি কন আফা? এগুলি কি পাগল হবার লক্ষণ? এক সময় সে কি পাগল হয়ে যাবে? হয়ত হবে। কিংবা কে জানে এখনি হয়ত সে খানিকটা পাগল।
বাড়ি থেকে বেরুবার মুখে হীরুর সঙ্গে দেখা! হীরু বলল, তিথি যাচ্ছিস কোথায়? তোর সঙ্গে আমার খুব জরুরি কথা আছে, ভেরি আর্জেন্ট।
তিথি বলল, আমার কোনো জরুরি কথা নেই। বিরক্ত করিস না তো?
হীরু সঙ্গে সঙ্গে আসতে লাগল। তিথি বলল, কেন বিরক্ত করছিস?
তুই আমাকে থ্রি থাউজেন্ড টাকা জোগাড় করে দিতে পারবি?
না।
এর জন্যে তুই আমাকে তোর পা ধরতে বলিস। আমি তোর পা ধরে বসে থাকব। টাকাটা আমার খুবই দরকার।
দরকার হলে চুরি কর। ছিনতাই কর। কানে দুল পরে মেয়েরা যায়। ঐ দুল টান দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে যা।
তুই পাগল হয়ে গেলি তিথি? আমি ভদ্রলোকের ছেলে না?
হ্যাঁ, ভদ্রলোকের ছেলে। তুই ভদ্রলোকের ছেলে, আমি ভদ্রলোকের মেয়ে। আমি টাকা কিভাবে আনি তুই জানিস? নাকি তোর জানা নেই?
হীরু চুপ করে গেল। তিথি বলল, আমি কিভাবে টাকা আনি সেটা কেউ জানে না, আবার সবাই জানে। মজার একটা খেলা। তুই আমার পেছন পেছন আসবি না। যদি আসিস তাহলে ধাক্কা দিয়ে নর্দমায় ফেলে দেব।
হীরু দাঁড়িয়ে পড়ল। তিথিকে বিশ্বাস নেই। এই কাণ্ড সে সত্যি সত্যি করে বসতে পারে। একবার নর্দমায় পড়ে গেলে চৌদবার গোসল করলেও গন্ধ উঠবে না। হীরুর মন খারাপ হয়ে গেল। তিথির কাছ থেকে সে টাকা পাবে না এটা জানত। টাকা চাওয়ার উদ্দেশ্য ভিন্ন। হীরুর ধারণা ছিল টাকার কথা শুনেই তিথি বলবে এত টাকা দিয়ে তুই কি করবি? তখন হীরু কারণটা ব্যাখ্যা করবে।
কারণটা বেশ অদ্ভুত।
আজ হাঁটতে হাঁটতে সে পীর সাহেবের কাছে গিয়েছে। খালি হাতে গিয়েছে, এই জন্যে সে আর তার সঙ্গে দেখা করল না। উঠোনে মাথা কামানো এক লোকের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল। মাথা কামানো লোকটির নাম সবুর। তার বাড়ি কালিয়াকৈর। মাস তিনেক আগে বিয়ে করেছে। গত সপ্তাহে তার বৌ হঠাৎ পালিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় খোঁজখবর করেও সে কোনো সন্ধান না পেয়ে পীর সাহেবের কাছে এসেছে। পীর সাহেবের সঙ্গে এখনো দেখা হয় নি। হীরু বলল, ঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন ভাইজান। মোটেই চিন্তা করবেন না, এক মিনিটের মামলা। পীর সাহেব ফড়ফড় করে সব বলে দেবেন।
সত্যি?
সত্যি মানে? আমার নিজের ইয়ং ব্রাদার মিসিং হয়ে গেল। তার নাম টুকু। পীর সাহেবকে বললাম। উনি বললেন–চিন্তা করিস না। এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরবে।
ফিরল এক সপ্তাহের মধ্যে?
ফিরবে না মানে? পীর সাহেবের সঙ্গে ইয়ার্কি চলে না। ডাইরেক্ট অ্যাকশান। আপনি খালি হাতে আসেননি তো?
একশ টাকা এনেছি, গরিব মানুষ।
