আমি কী আপনাকে কোনো অস্বস্তিতে ফেলেছি।
হুঁ, তা তা তা কিছুটা… কী জন্যে এসেছ?
আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন।
আমি, আমি আসতে বলেছিলাম? বল কী!
একটা কার্ড দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই ঠিকানা পেলাম।
ও আচ্ছা আছচা।
বলেছিলেন। আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দেবেন।
চাকরি? চাকরি আমি কোথায় পাব?
তা তো জানি না; আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন, তাই এসেছি। চলে যেতে বললে চলে যাব।
না না বস। একটু বাস। চা খাও! আমি একটা শার্ট গায়ে দিয়ে আসছি। ঘরে কোনো কাজের লোক নেই। চারজন ছিল। গত সোমবার একসঙ্গে চারজনকে বরখাস্ত করেছি। ছাব্বিশ ইঞ্চি একটা কালার টিভি চুরি হয়েছে। ওদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া সেটা সম্ভব না। আমার ধারণা, ওরা ধরাধরি করে টিভিটা চোরের রিকশায় তুলে দিয়ে এসেছে। আই অ্যাম পজিটিভ।
দবির উদ্দিন শার্ট গায়ে দেবার জন্যে দোতলায় চলে গেলেন। তার ঘর তার স্ত্রী ফরিদার ঘরের পাশে। এক সময় তারা দু’জন এক খাটে ঘুমুতেন। এখন তা সম্ভব না। ফরিদার গায়ে একটু হাত রাখলে সে ব্যথায় নীল হয়ে যায়। দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থেকে থেকে তার পিঠে দগদগে ঘা হয়েছে। সেখান থেকে কটু গন্ধ আসে। দবির উদ্দিন সেই গান্ধ সহ্য করতে পারে না। সমস্ত শরীর পাক দিয়ে ওঠে। মনে হয় বমি করে ফেলবেন। বহু কষ্টে বমির চাপ সামলাতে হয়। সামলাতে না পারলে খুব খারাপ ব্যাপার হবে। ফরিদা মনের কষ্টেই মরে যাবে।
দবির উদ্দিন ফরিদার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় থমকে দাঁড়ালেন। সকাল বেলার এই সময়টায় সে আচ্ছান্ন অবস্থার মধ্যে থাকে। কিছু জিজ্ঞেস করলে কথা বলে না। তাকায় না পর্যন্ত। কথা বলতে শুরু করে বিকেলের দিকে। আজি অন্য রকম হল। ফরিদা ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলেন এই শোন। দবির উদ্দিন ঘরে ঢুকলেন। দরজার ও-পাশ থেকে বললেন কী?
ঐ মেয়েটা কে?
কোন মেয়েটা?
ফরিদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, যার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বললে। দবির উদ্দিন ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। ফরিদা বললেন, মেয়েটাকে আমার এখানে একটু আসতে বল। আমি কথা বলব!
তিথি অনেকক্ষণ কিছু দেখতেই পেল না। জানালা ভারী পর্দায় ঢাকা। ঘরের তিনটি দরজার দুটোই বঙ্গ। যেটা খোলা, সেখানেও জানালার মতই ভারী পর্দা। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার আগেই তিথি শুনল কেউ একজন তীক্ষ্ণ গলায় বলছে, ভেতরে এসে দাঁড়াও। পর্দা ধরে দাড়িও না। পর্দার কাঠ আলগা হয়ে আছে, মাথার উপর পড়বে।
তিথি খানিকটা এগুলো। এগুতে ও ভয় লাগছে। কোনো কিছুর সঙ্গে হয়ত ধাক্কা লাগবে।
তোমার বা দিকে চেয়ার আছে, তুমি চেয়ারে বাস।
সে বসল না। দাঁড়িয়ে রইল। চোখে অন্ধকার সয়ে গেছে। ঘর দেখা যাচ্ছে। পুরনো আমলের পালংক দেখা যাচ্ছে। পালংকে শুয়ে থাকা মহিলাকে দেখা যাচ্ছে। খুব রুগ্ন মানুষকে আমরা কংকাল বলি। এই মহিলাটি তাও নয়। তার কংকাল ও যেন শুকিযে ছোট হয়ে গেছে। হাঁটু পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মাথার উপর শ্লথগতিতে একটা ফ্যান ঘুরছে। ঘরের ভেতর চাপা এক ধরনের গন্ধ।
বসতে বললাম, বসছ না কেন?
তিথি বসল। তাকিয়ে রইল দেয়ালের দিকে। ফরিদা বললেন, চেয়ারটা ঘুরিয়ে বাস; তোমার মুখ দেখতে পারছি না। তিথি চেয়ার ঘুরিয়ে বসল।
তোমার চেহারা তো বেশ সুন্দর। বেশ্যাদের এত সুন্দর চেহারা থাকে জানতাম না। আমি শুনেছি। ওদের শরীর ভাল থাকে, চেহারা ভাল থাকে না। তিথি তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।
তোমাকে বেশ্যা বলায় রাগ করলে নাকি? ও আমাকে তোমার বিষয়ে বলেছে। ও আমাকে সব কিছু বলে। কোনো কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে না।
আপনি মনে হচ্ছে খুব ভাগ্যবতী।
ঠাট্টা করলে নাকি?
তিথি কিছু বলল না।
ফরিদা বললেন, আমি অবশি। শুনেছি তোমার মত মেয়েরা খুব ঠাট্টাতামাশা করতে পারে।
আমাদের সম্পর্কে এত খবর জানলেন কী ভাবে?
ইচ্ছা করলেই জানা যায়। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে। জেনেছি।
তিথি বলল, আপনার কথা কী শেষ হয়েছে। আমি এখন উঠব?
না বস। আরো খানিকক্ষণ বস। তোমার কাজের ক্ষতি হলেও বাস, আমি পুষিয়ে দেব।
কীভাবে পুষিয়ে দেবেন? ঘণ্টা হিসেবে টাকা দেবেন?
হ্যাঁ দেব। তুমি বস। চা খেয়েছ তুমি? চা দিয়েছে?
না দেয়নি। চা খেলে আপনার কাপ নোংরা হয়ে যাবে না?
হবে। আমার এত শুচিবায়ু নেই। আচ্ছা তুমি বল ও তোমার সঙ্গে কী কী করেছিল?
আপনার স্বামী আমার সঙ্গে কী কী করেছিল তা শুনতে চান?
হুঁ।
উনি আপনাকে কিছু বলেননি?
বলেছে। তবু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। তুমি বল। আমি তোমাকে টাকা দেব। এটা বলার জন্যে আপনি আমাকে টাকা দেবেন?
হ্যাঁ দেব। ও ভীষণ লাজুক। ওর মত লাজুক একটা মানুষ তোমার মত সুন্দরী একটা মানুষ নিয়ে কী করল তাই জানতে চাই।
আপনিও তো এক সময় সুন্দরী ছিলেন। আপনাকে নিয়ে উনি কী কী করেছিলেন?
আমি আর তুমি এক হলাম?
এক না? আমাদের দুজনের শরীরই তো এক রকম? তাই নয় কী?
তুমি খুবই ফাজিল একটা মেয়ে।
আমার মত মেয়েরা ফাজিলও হয়। এই খবরটা বোধ হয় আপনি জানেন না। অন্য মেয়েদের সঙ্গে আমরা খুব ফাজলামী করি আবার ছেলেদের সঙ্গে মধুর ব্যবহার। এখান থেকে যাবার সময় আমি করব কী জানেন? আপনার মুখে থুথু দিয়ে যাব। আপনার শরীরের যে অবস্থা আপনি আমার সেই থুথু মুখে মেখে শুয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে পারবেন না।
খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার ফরিদা এই কথায় রাগ করলেন না, বরং তার মুখের রেখাগুলি কোমল হয়ে গেল। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, তোমার নাম কী?
