তিথি ছুঁচালো দাড়ির মিস্ত্রীটের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল, তুমি কী বললে? মিস্ত্রী এই প্রশ্নের জন্যে তৈরি ছিল না। সে আমতা আমতা করতে লাগল। তিথি বলল, তোমার দাড়ি ধরে তোমাকে আমি এই পানির মধ্যে চুবিয়ে ধরব বুঝতে পারছ?
মিস্ত্রীদের কেউ কোনো কথা বলল না। তারা ইট পরিষ্কারের ব্যাপারে এখন অতিরিক্ত মনোযোগী। ওদের একজন লজ্জিত গলায় বলল, কিছু মনে লাইয়েন না আফা। এইডা দবির স্যারের বাসা। ডাইন দিকে যান!
তিথি এগিয়ে যাচ্ছে। দাড়িওয়ালা মিস্ত্রীটি কী বলেছিল কে জানে। তার জানতে ইচ্ছা করছে। অনেক কিছুই আমাদের জানতে ইচ্ছা করে, শেষ পর্যন্ত জানতে পারি না। এটা একদিক দিয়ে ভাল। সবচে সুখী মানুষ তারাই যারা সবচে কম জানে। এটা তিথির বাবা জালালুদ্দিন সাহেবের কথা। জালালুদ্দিন সাহেব এক সময় দার্শনিকের কথাবার্তা বলতেন। এখন বলেন না। তার এখনকার সব কথা নিজের চোখ নিয়ে এবং খাদ্যদ্রব্য নিয়ে। আজও তিথি বেরুবার সময় অনেকক্ষণ বকবক করলেন।
একজন বড় চোখেন ডাক্তারের কাছে আমাকে নিয়ে যা তো মা! বা চোখটায় এখন আর কিছুই দেখতে পাঠ না। আগে কিছুটা দেখতাম, হীরুর পীরের কাছে যাওয়ার পর থেকে এক্কেবারে সাড়ে সৰ্ব্বনাশ; এই দেখ, ডান চোখ বন্ধ কৰে তোব দিকে ত:কাচিহ্ন! তোকে দেখছি না। কিছু না অন্ধকার। ঐ শাল। পারের কাছে কেন যে গোলাম।
ডানটা কী ঠিক আছে?
এখনো আছে আর কিন্তু বেশিদিন থাকবে না। একটা গেলে অন্যটা যায় এটাই নিয়ম। তিথি অন্যমনস্ক স্বাবে বলল তুমি দেখি অনেক নিয়ম-কানুন জান। তার উত্তরে জালালুদ্দিন কিছু বলেননি। অদ্ভুত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়েছেন। তিথি বলেছে সামনের সপ্তাহে একজন বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
দেরি হয়ে যাবে তো।
দেরি হলেও কিছু করার নেই। হাত খালি। ডাক্তার বিনা পয়সায় তোমাকে দেখবে না। নগদ একশ টাকা দিতে হবে। জালালুদ্দিন নিচু গলায় বললেন, আমার কাছে কিছু আছে।
তিথিবি জন্যে এই খবরটা অবাক হবার মত। রান্না হয়নি, খাওয়া-দাওয়া হয়নি এমন দিন ও তাদের গেছে। জালালুদ্দিন শব্দ করেননি; শুকনে মুখে উপোস দিয়েছেন। অথচ তার কাছে টাকা ছিল। তিথি বলল,
কত টাকা আছে?
তিনি জবাব দেননি; চোখ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন; একটা হাত একবার ডান চোখের সামনে ধরছেন, একবার বাঁ চোখের সামনে। তিথি বলল, কত টাকা বল? আমি তো নিয়ে যাচ্ছি না।
আছে কিছু।
সেই কিছুটা কত?
এই ধরা শ পাঁচেক।
এতগুলি টাকা নিয়ে ঘাপটি মেরে ছিলে? তুমি তো বেশ মজার মানুষ বাবা। দাও আমাকে একশ টাকা ধার দাও। ভয় নেই, ফিরিযে দেব। তিনি না-শোনার ভান করলেন। খাট থেকে নেমে হাতড়ে হাতড়ে রওনা হলেন বাথরুমের দিকে। তিথি বাড়ি থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত তিনি বেরুলেন না।
তের–চৌদ্দ বছরের রোগা একটা মেয়ে দরজা খুলে দিল। মেয়েটির চেহারা খুব মায়াকাড়া! ভারি কোমল চোখ! গোলাকার মুখ! যেন কেউ কাটা কম্পাস দিয়ে মুখ একেছে। পাতলা ঠোট। এত পাতলা য়ে মনে হয় তীক্ষ্ণ চোখে তাকালে রক্ত চলাচল দেখা যাবে।
দবির সাহেবের বাসা?
জি।
উনি আছেন?
জি গোসল করছেন।
কে হন তোমার?
আমার বাবা।
আমি উনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
বসুন। বাবা বের হলে বলব। উনার বের হতে অনেক দেরি হয়।
তোমার নাম কী?
অজন্তা।
বাহ খুব সুন্দর নাম তো।
আমার ভাল নামটা খুব খারাপ।
ভাল নাম কী?
অজন্তা কিছু বলল না। আগ্রহ নিয়ে সে তিথিকে দেখছে। মনে মনে বলছে, এই মেয়েটার গলার স্বর এত মিষ্টি কেন? শুধু শুনতে ইচ্ছা করে। তার একটু মন খারাপও হল। অজন্তার ধারণা তার গলার স্বরটা খুব বাজে। কর্কশ, কানে লাগে। এই জন্যে বাইরের মানুষের সামনে সে কথার্বতা একেবারেই বলে না। তবু এই মহিলাটির সঙ্গে সে অনেক কথা বলে ফেলেছে। এখন মন খারাপ লাগছে। তার ধারণা এই মহিলা মনে মনে বলছেন। অজন্তা মেয়েটা এত সুন্দব কিন্তু তার গলার স্বর এরকম কাকের মত কেন? তিথি বলল,
তোমার আজ স্কুল নেই অজন্তা?
উঁহু।
কিসের ছুটি?
এসএসসি পরীক্ষার ছুটি। আমাদের স্কুলে সিট পড়েছে।
তুমি ক্লাস সেভেনে পড়, তাই না?
অজন্তা অবাক হয়ে বলল, কি করে বুঝলেন? তিথি হাসিমুখে বলল, চেহারা দেখে আমি অনেক কিছু বলতে পারি। এখন দেখ তোমার বাবা বের হয়েছেন কী না।
বের হননি।
কী করে বুঝলে?
বাথরুমের দরজা খুলেই তিনি আমাকে ডাকেন লেবুব শরবত দেবার জন্যে। গোসল শেষ করে তিনি এক গ্লাস লেবুর শরবত খান। ভিটামিন সি আছ শরবতে। বেশি করে ভিটামিন সি খেলে মাথায় চুল ওঠে।
তিথি হেসে ফেলল। অজন্তা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল। নিজের ওপর তার খুব রাগ লাগছে। কাকের মত গলায় সে এতক্ষণ ধরে কথা বলেছে। কী লজ্জা! জিভটা কেটে ফেলতে পারলে বেশ হত। ভেতর থেকে ভারী গলা ভেসে এল, অজু, মা অজু। অজন্তা মুখ কালো করে বলল, বাবা আমাদের আদর করে অজু ডাকেন। কী বিশ্ৰী যে লাগে শুনতে। দবির সাহেব খালি গায়ে, কাধে শুধু একটা ভেজা গামছা জড়িয়ে বসার ঘরে ঢুকেই পাথরের মূর্তির মত হয়ে গেলেন। তিথি উঠে দাঁড়াল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন বস। বস। তিথি বলল, আপনি কী আমাকে চিনতে পারছেন…
হুঁ।
আমার নাম মনে আছে আপনার?
না, নাম মনে নাই। আমার কোনো মানুষের নাম মনে থাকে না। চেহারা মনে থাকে; একবাধ কাউকে দেখলে সারা জীবন মনে থাকে। তুমি ব্যস, আমি একটা শার্ট গায়ে দিয়ে আসি।
