আমার দশটা নাম আছে। কোনটা আপনাকে বলব?
সত্যি নামটা বল।
সত্যি নাম আমার নেই। আমার সবই নকল নাম।
তুমি আমার ওপর খুব রাগ করেছ। আমি খুবই অসূস্থ একজন মানুষ; আর অল্প কিছু দিন বেঁচে আছি! এরকম একজন মানুষের ওপর রাগ করা ঠিক না।
আপনার মত রোগীরা সহজে মরে না। আপনি দীর্ঘদিন বাঁচবেন। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের হাড় ভাজা ভাজা করবেন। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ এক’দিন মনে মনে আপনার মৃত্যু কামনা করবে…তবু আপনি মরবেন না।
ফরিদা বললেন, তুমি সত্যি কথাই বলেছ। তুমি আমার আরো কাছে আসি তো তোমাকে ভাল করে দেখি। জানালার একটা পর্দাও সরিয়ে দাও; ঘর বেশি অন্ধকার হয়ে আছে। আজ এত অন্ধকার কেন বল তো? ঝড়বৃষ্টি হবে নাকি? আকাশে কী মেঘ আছে?
তিথি একটি প্রশ্নের জবাবও দিল না। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, যাই।
ফরিদা বললেন, থুথু দিয়ে গেলে না?
তিথি তার জবাব না দিয়ে নিচে নেমে গেল। দবির উদ্দিন বারান্দায় মেয়ের মাথার চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলেন। তিথি তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে উঠোনে নামল। দাবিব উদ্দিন শংকিত চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। অজন্তা বাবাকে জিজ্ঞেস করল, এই মেয়েটা কে বাবা? দবিব উদ্দিন মেয়ের প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না। কিছু একটা বলতে গেলেন, গলা দিয়ে শব্দ বের হল না। গলার মধ্যে আটকে গেল।
টুকু বুঝতেই পারল না
টুকু অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে। অন্ধকার এবং অপরিচিত একটা ঘর। সে শুয়ে আছে মেঝেতে। তার গায়ে দুৰ্গন্ধ মোটা একটা কাঁথা। সে শুনল ইনিয়ে-বিনিয়ে অল্প বয়েসী। একটা বাচ্চা কাঁদছে। কান্নাব শব্দ শুনতে শুনতে টুকু চোখ বন্ধ করল। এই মুহূর্তে সে কিছু ভাবতে চায় না! ঘুমুতে চায়। আরামে তার শরীর অল্প অল্প কাঁপছে। ঘুম এত আরামের হয় সে আগে কখনো ভাবেনি। এখানে সে কী ভাবে এল? নিজে নিজে নিশ্চয়ই আসেনি। কেউ এসে দিয়ে গেছে। কতদিন আগে দিয়ে গেছে? এক’দিন দু’দিন না। সাত দিন? বাড়ি থেকে যেদিন সে বের হল সেদিন কী বার ছিল? সোমবার না মঙ্গলবার? এটা কোন কাল? শীত না গ্রীষ্ম? কিছুই মনে পড়ছে না।
গায়ের উপর রাখা মোটা কথা থেকে দুৰ্গন্ধ আসছে। ঘুমের মধ্যেও সেই দুৰ্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আরো যেন বেশি পাওয়া যাচ্ছে। পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠছে। বমি বমি লাগছে।
টুকু দ্বিতীয়বার চোখ মেলল। সঙ্গে সঙ্গে মোটা একটা গলা শোনা গেল নাম কী তোর? এই নাম কী রে?
টুকু জবাব দিল না; জবাব দেবার আগে লোকটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু লোকটা বসেছে এমনভাবে যে তাকে দেখতে হলে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতে হয়। মাথা ঘুরাতে ইচ্ছা করছে না।
এই পোলা, এই! কিছু খাবি? খাবি? কথা কস না ক্যান? বোলা নাহি। এই এই।
টুকু কথা না বলাই ভাল বিবেচনা করল। কথা বলতে শুরু করলেই এরা অসংখ্য প্রশ্ন করবে। বাড়ি কোথায়? বাবার নাম কী? থাক কোথায়? পড়াশোনা করি? কী হয়েছে তোমার?
এরচে এই যে চুপচাপ পড়ে আছে এটা কী ভাল না? টুকু আগ্রহ করে আশপাশের জীবনযাত্রা দেখছে। যে লোকটি তার সঙ্গে কথা বলছে তার চেহারা সে এখনো দেখেনি। তার কথা শুনে মনে হচ্ছে বুড়ো কেউ হবে। কথার সঙ্গে সঙ্গে সে খুব কাশছে।
এই পোলা, ভুখ লাগছে? কিছু খাবি? ও মতির মা, এই পুলারে খাওন দেও!
মতির মা ঘরে ঢুকল। হাতে এলুমিনিয়ামের বাটি এবং চামচ। বাটিতে তরল সবুজ রঙের কি একটা জিনিস। মতির মার পরনে গাঢ় সবুজ রঙের একটা শাড়ি। বয়স ও খুব কম। একে দেখে মনে হয় না মতি বলে তার কোনো ছেলে আছে।
মাতিব মা, এই পুলাব জবান বন্ধ। তার মুখে তুইলা চাইরােডা খাওয়াইয়া দাও।
মতির মা চামচে করে সবুজ রঙের ঐ জিনিস টুকুর মুখের কাছে ধরল। মতির মার মুখ ভাবলেশহীন। এই ছেলে কিছু খাক না খাক তাতে তার কিছু যায় আসে না। টুকু আগ্রহ করে খেল। জিনিসটা খেতে ভাল। টকটক এবং প্রচণ্ড ঝাল। মাতিব মা যতবার চামচটা মুখের কাছে ধরছে। ততবারই তার হাতেব চুড়ি টুনটুন কবে বাজছে। মেয়েটির হাত ভর্তি গাঢ় লাল রঙের চুড়ি। সবুজ শাড়ি পরা একটি মেয়ের সাদি হাত ভর্তি লাল চুড়ি থাকে তাহলে দেখতে অনা রকম লাগে।
বুড়ো কাশতে কাশতে ডাকল, ও মতির মা।
কী?
এই পুলার তো জবান বন্ধ। তারে ঘবে আইন্যা তে! দেহি আরেক বিপদে পড়লাম।
ফালাইয়া দিয়া আহ।
পুলার গাযে জ্বর আছে কি-না দেহ দেহি।
মতির মা টুকুর গায়ে হাত না দিয়েই বলল, জ্বর নাই।
আর একটা দিন দেখি তারপরে যেখান থাইক্যা আনছি হেইখানে ফালাইয়া থুইয়া আসমু।
যা ইচ্ছা কর।
টুকু আগ্রহ করে চারদিকে লক্ষ্য করছে। এটা নিশ্চয়ই বস্তির কোনো-একটা ঘর। চৌকিটৌকির কোনো ব্যবহার নেই। ঘরের এ-মাথা ও-মাথা পর্যন্ত চাটাই বিছানো। যখন যার ইচ্ছা! এসে খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে যাচ্ছে। রান্না এবং খাওয়াব ব্যবস্থা বারান্দাষ। বিরাট একটা হাড়িতে কি যেন রান্না হয়েছে। বাড়ির লোকজন নিজের নিজের ইচ্ছামত খেয়ে চলে যাচ্ছে। এই পরিবারের লোক কজন টুকু ধরতে চেষ্টা করল। পারল না। মনে হচ্ছে অনেকগুলি মানুষ। এতগুলি মানুষের মেঝেতে ঘুমুবার জায়গা হয় কী করে জানে? এর মধ্যে একটি মেয়ের মনে হয় নতুন বিয়ে হয়েছে। সবাই তাকে নয়া বৌ নয়া বৌ বলছে। মেয়েটা বেশ সেজোগুজে আছে।
বিকেলের দিকে টুকু উঠে বসল। ঘোর বর্ষ। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। এই ঘরে এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়ছে না।–এই আনন্দেই বাড়ির মানুষগুলি উল্লসিত; আধরুড়ো একটা লোক বারবার বলছে . পলিথিনেধ কাগজ দিয়ে কেমুন মেরামত করালাম দেখছ? পঁচিশ টাকা খরচ হইছে কিন্তু আরাম হইছে কত টেকার? পঁচিশ হাজার টেকার আরাম।
