ভোরবেলায় সে যখন বাড়ি থেকে বেব হল তখনো তার মাথায় ছিল একটা রূপকথার গল্প। যেন সে একজন রাজকুমার। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বের হয়েছে। বের হবার কারণ ভয়ংকর একটা দৈত্য। দৈত্যটার নাম করুবেক। এই করুবেক দৈত্যের ভয়ে সমস্ত পৃথিবী থারথার করে কাঁপছে। একে কেউ মারতে পারছে না। কারণ করুবেক অমর। শুধু একজন পারে করুবেককে মারতে–সেই একজন হচ্ছে সে নিজে। তবে তার জন্যে তাকে সাধনা করতে হবে। সাতদিন উপবাস। উপবাসের অষ্টম দিনে তার কাছে আসবেন একজন দেবদূত। তিনি নরম গলায় বলবেন–হে বালক! তোমার সাধনায় তুষ্ট হয়েছি। তুমি কি চাও বৎস? তিনটি বির তুমি প্রার্থনা কর। সে তখন চাইবে করুণাবেককে হত্যার অস্ত্র।
টুকুর উপবাসের আজ দ্বিতীয় দিন।
প্রথম দিন সে কষ্টটা হচ্ছিল আজ তা হচ্ছে না। টুকুর ধারণা আগামী দিন আরো কম হবে। বাসায় থাকলে কষ্ট হত। ক্ষিধের এই ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। বাসায় থাকলেই ক্ষিধে বেশি লাগে এবং যখন জানা যায় ঘরে খাবার নেই তখন হঠাৎ করে ক্ষিধের কষ্ট লক্ষগুণ বেড়ে যায়। জগৎসংসার অন্ধকার মনে হয়।
এরকম কষ্ট অবশ্যি টুকুকে খুব বেশি করতে হয়নি। এই জীবনে মাত্র তিনবার। প্রথমবার যখন ব্যাপারটা হল তখন কষ্টের চেয়েও বিস্ময় প্রধান হয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ এক’দিন দুপুরকেলা রান্না হল না। টুকুর বাবা বারান্দায় বসে বারবার বলতে লাগলেন–ভেরি ব্যাড টাইম। যাকে বলে দুঃসময়। কি করা যায়? না খেয়ে তো থাকা সম্ভব না। ও মিনু, করা যায় কি বল তো?
টুকুর মা রান্নাঘরের বারান্দায় মোড়াতে বসা ছিলেন। সেখান থেকে তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন–তুমি কথা বলবে না।
জালালুদ্দিন বিস্মিত গলায় বললেন–কথা না বললে হবে কি করে? একটা বুদ্ধি বের করতে হবে না? চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে হবে?
খবরদার একটা কথা না।
তোমাকে নিয়ে বড় যন্ত্রণা হল তো? সমস্যা বুঝতে পারছি না। মানব জীবনে সমস্যা আসবেই। সেই সমস্যার সমাধান ঠাণ্ডা মাথায় বের করতে হবে। কুল ব্ৰেইনে ভাবতে হবে।
সমস্যার সমাধান বের করা আছে। তোমাকে ভাবতে হবে না।
জালালুদ্দিন উৎসাহী গলায় বললেন, কি সমাধান?
ঘরে ইদুর মারার বিষ আছে। ঐ খানিকটা করে খেয়ে শুয়ে থাক।
পাগল হয়ে গেলে নাকি মিনু?
পাগল হইনি, পাগল হব কেন?
আত্মহননের চিন্তা যে মাথায় এসেছে এটাই হচ্ছে পাগলামির সবচেয়ে বড় লক্ষণ। বড় বড় মনীষীদের কাছ থেকে আমাদের শিখতে হবে। বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
আর একটা কথা যদি তুমি বল জোর করে তোমাকে বিষ খাইয়ে দেব। সব সময় ফাজলামি।
জামালুদ্দিন চুপ করে গেলেন।
টুকুরও ভয় ভয় করতে লাগল। মার চেহারা কেমন অন্য রকম হয়ে গেছে। রূপকথার ডাইনীদের মত লাগছে।
হীরু বাড়ি এল সন্ধ্যার আগে আগে। মুখ ভর্তি পান। হাতে সিগারেট। দুপুরে বাড়িতে খাওয়া হয়নি। শুনে সে চোখ কপালে তুলে বলল বিগ প্রবলেম মনে হচ্ছে।
জালালুদ্দিন বললেন, তোর কাছে টাকা-পয়সা কিছু আছে নাকি রে হীরু?
আমার কাছে টাকা-পয়সা থাকবে কেন? কিছুই নেই। বিশ্বাস না হয় পকেটে হাত দিয়ে চেক করতে পার। পাঁচটা টাকা ছিল এক প্যাকেট সিগারেট কিনে ফেললাম।
জালালুদ্দিন ক্লান্ত গলায় বললেন–দেখি একটা সিগারেট দে। সিগারেটেরা ক্ষিধে নষ্ট হবার ক্ষমতা আছে।
জালালুদ্দিন বসে বসে সিগারেট টানতে লাগলেন। তার সামনেই বসল হীরু। কিছুক্ষণ পরপর সে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। কপালের রাগ টিপে ধরছে। তার ভাব-ভঙ্গি দেখে জালালুদ্দিন বলতে বাধ্য হলেন এত চিন্তা করিস কেন? এত চিন্তার কি আছে? রিজেকের মালিক হচ্ছেন আল্লা স্বয়ং। সেই রিজিক নিয়ে বেশি চিন্তা করার মানেই হচ্ছে আল্লাহকে বিশ্বাস না করা। মহোপাপের সামিল।
আল্লাহর ওপর প্রবল বিশ্বাস রেখে তিনি হীরুর কাছ থেকে নিয়ে পরপর তিনটি সিগারেট খেয়ে ফেললেন। আশ্চর্যের ব্যাপার–দেখা গেল স্বয়ং আল্লাহ জালালুদিনের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলেন। মিনু কোনো-এক গভীর গোপন থেকে গলার একটা হার বের করলেন। কি করে এটা অবশিষ্ট রয়ে গেল কে জানে। দুভরি থেকে আড়াই ভরির মত ওজন।
জালালুদ্দিন একগাল হাসলেন। হষ্টচিত্তে বললেন–কি বলেছিলাম না। সব সমস্যার সমাধান আছে। বিশ্বাস তো কর না।
হীরু, গয়না নিয়ে বেরুলি। আগেরগুলিও তার হাতেই বিক্রি হয়েছে। তার নাকি কোন-এক চেনা দোকান আছে। ভাল দাম দেয়। খাদের জন্য কিছুই কাটে না।
জালালুদ্দিন বললেন, ঐ সঙ্গে সপ্তাহের বাজার করে আনবি, বুঝলি। চাল, ডাল, চা চিনি। নোনা ইলিশ পাস কি-না দেখবি। কচুর লতি দিয়ে নোনা ইলিশের কোনো তুলনা হয় না। একেবারে বেহেশতী খানা–বুঝলি। হীরু গয়না নিয়ে বেরুল আর ফিরল না।
বেঞ্চে শুয়ে শুয়ে টুকু পুরনো কথা ভাবছে। ভাবতে বেশ মজা লাগছে। হীরু ভাইয়া না যে চরায় বাবা ঐ রাতে কি অবাকই না হয়েছিলেন। রাত এগারটার দিকে ভয় পাওয়া গলায় বললে, ন, ও মিনু গয়না নিয়ে পালিয়ে গেল নাকি?
মিনু সহজ গলায় বললেন–হ্যাঁ।
এখন কি করব?
ঘুমিয়ে পড়। আর কি করবে?
বল কি তুমি!
মিনু সত্যি সত্যি ঘুমুবার আয়োজন করলেন। মশারি ফেলতে ফেলতে বললেন–ঘুমুতে না। চাও জেগে থােক। রিজিকের জন্যে আল্লাহকে ডাক। তিনি ব্যবস্থা করবেন।
ক্ষুধার্তমানুষ ঘুমুতে পারে না বলে প্রচলিত যে ধারণা আছে তা ঠিক না। ক্ষুধা পেলে ঘুম ভাল হয়। ঐ রাতে শোয়ামাত্র টুকু ঘুমিয়ে পড়ল। রাত তিনটার দিকে তার ঘুম ভাঙানো হল। ডাল-ভাত রান্না হয়েছে। আগুন গরম ভাত ফুঁ দিয়ে তার বাবা খাচ্ছেন। তাঁর মুখে মিবলানন্দ। জানা গেল দুবেলার মত খাবার ঘরে ছিল। সামনের দিন কেমন যাবে তা বোঝার জন্যে মিনু এই ব্যবস্থা করেছে। সবাই আকণ্ঠ খেল। শুথু তিথি ভাতের থালা সামনে নিয়ে বসে রইল। কিছু মুখে দিল না। জালালুদ্দিন বললেন, খাচ্ছিস না কেন?
