তার মন খারাপ হয়ে গেল। আজ দিনটাই তার জন্যে খারাপ। হোতও পুরোপুরি খালি। যে সামান্য কিছু টাকা ছিল তার সবটাই রিকশা ভাড়ায় চলে গেছে। শখানেক টাকা সঙ্গে না থাকলে কেমন অস্থির লাগে। কোথায় পাওয়া যায় টাকা? হীরু দ্রুত চিন্তা করতে লাগল–ঢাকায় ধার চাওয়ার মত আত্মীয়স্বজন কে কে আছে যাদের কাছ থেকে এখনো ধার চাওয়া হয়নি। তেমন কারোর নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। উত্তর শাহজাহানপুরে দূর-সম্পর্কের এক মামা আছেন। তার কাছে যাওয়া যায়। তবে ঐ ভদ্রলোকের নিজেরই দিনে আনি দিনে খাই অবস্থা। ধার চাইতে গিয়ে কোনো বিপদে পড়তে হয় কে জানে।
হীরু জমা করে রাখা বিদেশী সিগারেটটা বের করল। জমা করে রাখার কোন অর্থ হয় না।
সে সিগারেট ধরিয়ে দু’টা টান দিয়েছে তখন দেখা গেল এ্যানা আবার আসছে। এবং তার কাছেই যে আসছে এটাও নিশ্চিত। হীরু ঠিক করে রাখল কোনো কথা বলবে না। যে মেয়ে তাকে অপমান করে, দেখতে পেয়েও না দেখার ভান করে চলে যায় তার সঙ্গে কথা বলার কোনো মানে হয় না।
এ্যানা এসে হীরুর সামনে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটাকে হীরুর সত্যি সত্যি সুন্দর লাগছে। যত দিন যাচ্ছে মেয়েটা কি ততই সুন্দর হচ্ছে? তা কেমন করে হয়?
এ্যানা বলল, এরকম বিশ্ৰী করে শিল দিচ্ছিলেন কেন? কতবার না বললাম। এ রকম করবেন। না। আর ছাদে ঢিল মারলেন কেন? এইসব কি?
কথা না বলার প্রতিজ্ঞা টিকল না। হীরু বলল, মন-মেজাজ খুব খারাপ মাথার ঠিক নাই। কি করতে কি করি।
মাথার ঠিক নাই কেন?
আর বলে না, ছোট ভাই মিসিং হয়ে গেছে। দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি সব তো আমার ঘাড়ে। বড় ছেলে হবার বিরাট যন্ত্রণা।
আপনার ছোট ভাই হারিয়ে গেছে নাকি?
হুঁ, পালিয়ে গেছে। যাকে বলে….
হীরু থেমে গেল। সে পালিয়ে গেছের একটা ইংরেজি বলতে চেয়েছিল–বলতে পারছে না। কারণ পালিয়ে গেছের ইংরেজি তার জানা নেই।
এ্যানা বলল, পুলিশকে খবর দিয়েছেন?
না, পুলিশ-ফুলিশে হবে না। পীর সাহেবের কাছে যেতে হবে। কলতা বাজারের পীর। জ্বীন সাধনা আছে। আমার সঙ্গে খুবই খাতির। অত্যন্ত স্নেহ করেন।
এ্যানা বলল, আপনাকে স্নেহ করেন? আপনাকে স্নেহ করার কি আছে?
হীরুর বিস্ময়ের সীমা রইল না। এই মেয়ে বলে কি? কষে একটা চড় দিতে ইচ্ছা করছে। যে সব চমৎকার কথা বলবে বলে হীরু এসেছিল তার সবই এলোমেলো হয়ে গেল। হীরু বলল, যাই তাহলে?
আচ্ছা।
দিন পনের দেখা হবে না। ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। বিজনেসের ব্যাপার।
যান, বিজনেস করে আসুন।
তোমার ঠিকানাটা লিখে দাও তো, সময় যদি পাই একটা চিঠি-ফিটি ছেড়ে দেব।
চিঠি দিতে হবে না। বাবা জানলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।
হীরুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
মন খুব বেশি খারাপ হলে সে সাধারণত পীর সাহেবের কাছে যায়। আজ তাও যাওয়া যাবে না, হাত একদম খালি। পীর সাহেব টাকা-পয়সা কিছুই নেন না। তবে বিদেশী সিগারেট দিলে খুশি হন। এক প্যাকেট বেনসনের দাম কম হলেও পাঁচ পঞ্চাশ টাকা … এই টাকাটা সে পাবে কোথায়?
হীরু ভেবে পেল না তার এবং এ্যানার ব্যাপারটা সে পীর সাহেবকে বলবে কি বলবে না। লজ্জা লজ্জা করে তবে একবার বলে ফেললে চির জীবনের জন্যে নিশ্চিন্ত।
তাছাড়া টুকুর জন্যেও যাওয়া দরকার। হারানো মানুষ বাড়ি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে এই পীর হচ্ছে এক নাম্বার। পীর সাহেবের এগারটা জ্বীন আছে। জ্বীনের মারফত খবর পান।
হীরু খালি হাতেই পীর সাহেবের সন্ধানে রওনা হল।
টুকু পার্কের একটা বেঞ্চিতে শুয়ে আছে
টুকু পার্কের একটা বেঞ্চিতে শুয়ে আছে।
তার সমস্ত শরীরে এক ধরনের আরামদায়ক আলস্য। শুধু মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এসব হচ্ছে প্রবল জ্বরের লক্ষণ। সে বুঝতে পারছে তার গায়ে জ্বর। অনেকখানি জ্বর। জ্বরের জন্যেই শ্রাবণ মাসের পড়ন্ত দিনের রোদ তার কাছে এত আরামদায়ক মনে হচ্ছে। রোদটা আরেকটু কড়া হলে ভাল হত। শীত শীত ভাবটা দূর হত।
টুকু চোখ মেলল। আকাশ অনেকখানি নিচে নেমে এসেছে। সকালে প্রথম যখন জ্বরের ভাবটা টের পেল। তখন থেকেই সে লক্ষ্য করছে আকাশ ক্রমশ নেমে আসছে। বাসায় যখন জ্বর আসত তখনো এমন হত। মনে হত ছাদটা নিচে নেমে এসেছে। এখন মাথার উপর ছাদ নেই। চকচকে আকাশ। সে আকাশ এত দ্রুত নিচে নামছে যে তার ভয় ভয় করছে। টুকু চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আজ নিয়ে দু’দিন সে পানি ছাড়া কিছু খায়নি। ইচ্ছা করলে খেতে পারত। তার পকেটে সতের টাকা। এই জীবনের পুরো সঞ্চয়। এই টাকার সবটাই সে পেয়েছে তিথির কাছ থেকে। যতবার সে তিথিকে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেছে ততবার বাসে উঠবার আগে হাত ব্যাগ খুলে তিথি তাকে একটা টাকা দিয়ে বলেছে নে রেখে দে। টুকু প্রতিবার বলেছে লাগবে না। তিথি বলেছে, না লাগলেও রেখে দে। টুকুর একচল্লিশ টাকার মত জন্মেছিল। বাকি টাকাটা খরচ হয়েছে গ্রিন বয়েজ ক্লাবের চাঁদায়। এই ক্লাবটা নতুন হয়েছে। ক্লাবের সেক্রেটারি বজলু ভাই। উকিল সাহেবের বাড়ির গ্যারেজে ক্লাবের অফিস ঘর এবং লাইব্রেরি। লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা একশ আটান্ন। লাইব্রেরিতে ভর্তি হবার নিয়ম হল–একটা বই দিতে হবে এবং ভর্তি ফি দশ টাকা দিয়ে মেম্বার হতে হবে। মেম্বারা হয়ে গেলে প্রতি মাসে চান্দা তিন টাকা।
টুকু এই লাইব্রেরির প্রথম সদস্য। শুধু তাই না–গ্রিন বয়েজ ক্লাবের মাসিক মুখপাত্র নতুন দেশ-এর সে একজন চিত্রকর। এই খবর টুকুদের বাসায় কেউ জানে না। কেউ জানে না টুকু শুধু যে একজন চিত্রকর। তাই না সে গল্পও লেখে; একটি গল্প ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে ছাপা হয়েছে। গল্পের নাম রাজকন্যা চম্পাবতী। রূপকথা; রূপকথা লিখতেই টুকুর ভাল লাগে। তার মাথায় এই জিনিসই ঘুরে বেড়ায়।
