তিথি বলল, রুচি হচ্ছে না। বাবা। তোমরা খাও।
দু’এক গাল মুখে দে। তাহলেই দেখবি রুচি হচ্ছে। ডাল কাঁচামরিচ দিয়ে ডলা দে দেখবি কি রকম টেস্ট হয়। মিনু ওকে একটা পেয়াজ দাও। ঘরে পেয়াজ আছে না?
তিথি বলল, না-খাওয়া অভ্যাস করি বাবা। সামনের দিনগুলিতে তো না খেয়েই থাকতে হবে। সে থালা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। মিনু একবারও তাকে খেতে ডাকলেন না।
আজ সকাল থেকে টুকুর মাথায় এসব ঘটনা ছবির মত আসছে। পাশাপাশি আসছে রূপকথার গল্পটা। টুকুর পায়ের কাছে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে কে-একজন এসে বসল। টুকুর মনে হল এ করুবেকের গুপ্তচর। তার সাধনা ভাঙাতে এসেছে। ঝালমুড়ির লোভ দেখাচ্ছে। যাতে সে লোভে পড়ে ঝালমুড়িওয়ালাকে ডেকে দুটাকার মুড়ি কিনে ফেলে। একবার কিনে ফেললেই সব শেষ। করুণবেককে হত্যা করা তখন আর সম্ভব হবে না।
লোকটি একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, কি হইছে?
টুকু জবাব দিল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল। লোকটি দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল না। এই দুঃসময় কেউ বেশি প্রশ্ন করে না। বেশি প্রশ্ন করলেই যদি কাধে দায়িত্ব এসে পড়ে। দায়িত্ব খুব খারাপ জিনিস। এর থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভাল।
টুকু একবার ভাবল, কেউ কি তাকে খুঁজতে বের হবে? সেই সম্ভাবনা কতটুকু? খুব বেশি না। খোঁজাখুঁজির যন্ত্রণায় কেউ যাবে না। একজন মানুষ কমে গেলেই সংসারের জন্যে ভাল। তবে বজলু ভাই খবর পেলে নিশ্চয়ই বের হবেন। এবং খুঁজে বের করতে পারলে খুশি খুশি গলায় বলবেন। তুই যে ঘর থেকে পালাতে পারলি এটা খুবই শুভ লক্ষণ। সব গ্রেটম্যানরাই কোনো না কোনো সময়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম রবি ঠাকুর। বাড়ি থেকে পালাননি বলে তার লেখায় পুতপুত ভাবটা বেশি। বাড়ি থেকে পালালে অভিজ্ঞতা হয়। নানান ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশা যায়। গুড ম্যান, ব্যাড ম্যান সব ধরনের মানুষ। পরবর্তী সময়ে এইসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। তোর জন্যে এটা তো খুবই দরকার। লেখালেখি লাইনে যখন আছিস। আমাদের দেশের লেখকরা বড় হতে পারল না কেন? অভিজ্ঞতার অভাবে। ম্যাক্সিম গোর্কির অভিজ্ঞতা কজনের আছে তুই বলা? একজনেরও নেই। আমাদের দেশের লেখকরা কি করে? খায় দায় ঘুমায় আর আডিডা দেয়। এদের একবিন্দু অভিজ্ঞতা নেই। আমি খুব খুশি যে তোর অনেক অভিজ্ঞতা হয়ে গেল।
মজার ব্যাপার হচ্ছে টুকুর তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই হয়নি। সে নিজের মনে সময় কাটিয়েছে। বেশির ভাগ সময় কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়েছে, কেউ তাকে বিরক্ত করেনি। শুধু একবার একটা বুড়ি তাকে বলেছে–এই ছ্যামড়া তোর হইছে কি? শইলে কি জ্বর?
বুড়ির গলায় স্নেহ-মমতার লেশমাত্র নেই। টুকু সেই প্রশ্নের জবাব দেয়নি। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। বুড়ি আবার বলেছে, এই ছ্যামড়া উইঠ্যা ব দেহি। তোর বাড়ি কই?
টুকু বিরক্ত হয়ে উঠে গেছে। নিজের পরিবারের মানুষদের বাইরের গত দু’দিন এই বুড়ি এবং ঝালমুড়ির ঠোঙা হাতে লোক–এদের দুজনের সঙ্গেই কথা হয়েছ। বিরাট কোন অভিজ্ঞতা নয়।
সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে টুকু উঠে বসল। আকাশটা অনেকখানি নেমে আছে। আকাশের রঙ ঘন লাল। সন্ধ্যাবেলা আকাশ খানিকটা লাল হয়। এতটা লাল হয় নাকি? তার ধারণা হল জ্বর খুব বেড়েছে। এতটা বাড়তে দেয়া ঠিক হয় নি। সে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ঘুরে নিচে পড়ে গেল। মুড়ির ঠোঙা হাতের লোকটি তাকিয়ে দেখল। কিছুই বলল না। তার খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল সে ঠোঙা ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল। অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে সে হাঁটছে। একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না। দিনকাল ঘদলে যাচ্ছে। কেউ এখন আর বাড়তি ঝামেলায় যেতে চায় না।
টুকুর খোঁজ নেই
দেখতে দেখতে ছ’দিন হয়ে গেল— টুকুর খোঁজ নেই। মিনু প্রায় দুপুরবেলা নিজেই ছেলেকে খুঁজতে বের হন। কাউকে তা বলেন না। টুকুর প্রসঙ্গে কোনো রকম কথাবার্তায় তিনি অংশগ্রহণ করেন না। যেন টুকু নামে তার কেউ ছিল না।
এই ক’দিন তিথি টুকুর প্রসঙ্গ তুলেনি। আজ তুলল। হীরুকে বলল, থানায় খবর দিয়েছিস?
হীরু অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলল, না।
না কেন?
আরে থানায় খবর দিয়ে হবেটা কি? কিছুই হবে না। উল্টা শালদের টাকা খাওয়াতে হবে।
টাকা খাওয়াতে হবে কেন?
পুলিশের কাছে যাবি আর টাকা খাওয়াবি না। এটা একটা কথা হল নাকি। পুলিশ সম্পর্কে তুই কিছুই জানিস না। থানায় খবর দেওয়ার ব্যাপারটা তুই ফরগেট করে ফেল।
আমরা কিছুই করব না? হাত গুটিয়ে বসে থাকব?
তোকে এই নিয়ে চিন্তা করতে হবে না ব্যবস্থা নেযা হয়েছে।
কি ব্যবস্থা?
ঐসব জেনে তুই কী করবি? আমার ওপর ছেড়ে দে।
তোর ওপর ছেড়ে দিয়ে তো এই অবস্থা…
হীরু কোনো উত্তর না দিয়ে খাওয়া শেষ কবে উঠে গেল। হাত-মুখ ধুয়ে তাকে এখন সিগারেট কিনতে যেতে হবে। টুকু না থাকায় এই একটা সমস্যা হয়েছে ছোট ছোট কাজে নিজেকেই যেতে হচ্ছে। ভরা পেটে হাঁটতে ভাল লাগে না।
টুকুকে নিয়ে যে তিথি চিন্তা করছে এতেও সে বেশ মজা পাচ্ছে। পীর সাহেবের কথামত দশ দিনের দিন টুকুর ফিরে আসার কথা। আসবে সেটা তো প্ৰায নিশ্চিত। কাজেই ছোটাছুটি হৈচৈ এর কোনো দরকার নেই। সিগারেট কিনতে কিনতে হীরুর মনে হল আজ কী একবার যাবে পীর সাহেবের কাছে? এমনি গিযে একটু কদমবুসি করে আসা আর কি?
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পরপরই মিনু বের হয়ে গেলেন। একটা ভবঘুরে কেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছেন। পুলিশ ট্রাক ভর্তি ভিখিরি নিয়ে ঐখানে আটকে রাখে বলে শুনেছেন। কে জানে টুকুকেও বেখেছে কি-না!
