তুমি ভাল থেকো। পরিবারের সবাইকে শ্ৰেণীমত সালাম এবং দোয়া দেবে।
অনেক দিন একটা জায়গায় বাস করছিলে হঠাৎ সেটা ছেড়ে দিতে গিয়ে তোমাদের হয়ত সাময়িক কিছু সমস্যা হবে। তার জন্যে আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। বিদেশে বাস করলেও আমার আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। তোমরা ভাল থেকো। রুথের জন্যে দোয়া করো, সে এখনো পুরোপুরি সারে নি।
আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেছি। রুথ বেবী এক্সপেট করছিল। দু মাস চলছিল। এতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবার পরেও বেবীর কোন ক্ষতি হয় নি। এটা আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কিছুই না।
ইতি–
রহমত উল্লাহ
পুনশ্চ : দেশের বাইরে এসে ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলে জানিও সাধ্যমত চেষ্টা করব।
রেভিন্যু স্ট্যাম্প চলে এসেছে। সই করে ফরহাদ উঠে দাঁড়াল। সিদ্দিক সাহেবকে ধন্যবাদ জাতীয় কিছু বলা দরকার। না বললেও হয় ইনি যন্ত্রমানব। ধন্যবাদের ধার ধারেন না। সিদ্দিক সাহেব টাকা গুণছেন এমন সময় যদি খবর আসে তাঁর ছোট ছেলেটি পানিতে ড়ুবে মারা গেছে। তিনি টাকা গোণা বন্ধ করবেন না, কাজটা শেষ করবেন। শেষ করার পর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করবেন—কখন মারা গেছে?
ফরহাদ সাহেব!
জ্বি।
বাসায় চলে যাচ্ছেন?
জ্বি।
সিদ্দিক সাহেব কাজ বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—চলুন আপনাকে একটু এগিয়ে দেই।
ফরহাদ বিস্মিত হয়ে বলল, কেন?
শরীরটা ভাল না। বমি বমি আসছে—একটা পান খাব।
সিদ্দিক সাহেবের এই ব্যাপারটা আছে। তিনি কাউকে দিয়ে কোন কাজ করান না। চা খেতে ইচ্ছা করলে নিজে গিয়ে চা নিয়ে আসেন। পান খেতে ইচ্ছা করলে নিজেই অফিসের সামনের পানের দোকানে পান কিনতে যান।
সিদ্দিক সাহেব দুটা পান কিনলেন। একটা মুখে দিয়ে অন্যটা পকেটে রাখতে রাখতে বললেন–ফরহাদ সাহেব। আপনার খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। এই খারাপ সময় সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আমার বড় মেয়ের জন্মের পর পর আমার চাকরি চলে গিয়েছিল। দুবছর আমি বেকার ছিলাম। যে কষ্ট করেছি তার সীমা নাই। পৃথিবীতে নানান ধরনের কষ্ট আছে—মানসিক কষ্ট, প্রিয়জন হারানোর কষ্ট, অসুখ বিসুখের কষ্ট। সবচে বড় কষ্ট হল ক্ষিধের কষ্ট। এই কষ্টও করেছি। একবার ঠিক করেছিলাম বিষ খেয়ে মরে যাব। ঘুমের অষুধ জোগাঢ়ও করেছিলাম। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মরতে পারি নাই। ভাই শুনুন আপনি ভরসা হারাবেন না। এই কাগজটা একটু রাখুন।
সিদ্দিক সাহেব মানিব্যাগ খুলে একটা কাগজ বের করলেন। কাগজে কার যেন ঠিকানা লেখা। ফরহাদ বলল, কি কাগজ?
সিদ্দিক সাহেব বললেন, দুটা বাচ্চাকে পড়াতে হবে প্রাইভেট টিউটর চায়। আমি আপনার কথা বলে রেখেছি। যাই পাওয়া যায় এখন তাই লাভ।
ফরহাদ কাগজটা নিল। সিদ্দিক সাহেব পানের পিক ফেলতে ফেলতে বললেন, যে চিঠিটা একটু আগে পড়ছিলেন সেখানেও একটা খারাপ সংবাদ আছে তাই না?
ফরহাদ কিছু বলল না। সিদ্দিক সাহেব বললেন—আমি লক্ষ্য করেছি চিঠিটা পড়তে পড়তে আপনার মুখ ছাই বর্ণ হয়ে গেছে। আমার নিজের বুকের মধ্যে তখন একটা ধাক্কার মত লেগেছে। সুখ যখন আসে তখন একদিক থেকে আসে না, নানান দিক থেকে আসে। বিপদ যখন আসে তখনও একদিক থেকে আসে না। নানান দিক থেকে আসে। এই ব্যাপারটা আমার চেয়ে ভাল কেউ জানে না। আমি বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি ইনশাল্লাহ আপনিও পাবেন। আমার বড় মেয়েটা ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করেছে। কমনওয়েলথ স্কলারশীপ পেয়েছে পিএইচডি করতে যাচ্ছে কানাডায়। তার জন্মের পর আমার স্ত্রীর বুকে দুধ ছিল না। টিনের দুধ কিনব এই টাকা ছিল না। বাজার থেকে চিড়া কিনে আনতাম—চিড়া কচলে তার পানিটা খাওয়াতাম। মেয়েটা সেই পানি খেতে পারে না। উগলে ফেলে দেয়। তখন আমি স্ত্রীকে বললাম,….. থাক বাদ দেন।
ফরহাদ তাকিয়ে আছে। সিদ্দিক সাহেব রুমাল বের করে চোখ মুছছেন।
সিদ্দিক সাহেব ধরা গলায় বললেন, একটা সময় ছিল রোজ কাঁদতাম। আজ অনেক দিন পরে কাঁদলাম। মেয়েটা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে মনটা দুর্বল এই জন্যে কেঁদে ফেলেছি। কিছু মনে করবেন না।
সিদ্দিক সাহেব উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলেন। একবারো পেছনে ফিরলেন না।
ফরহাদ লক্ষ্য করল প্রচন্ড মন খারাপ ভাবটা এখন আর তার নেই। সে বেশ ভাল বোধ করছে। তাকে বাড়িঘর ছেড়ে দিতে হবে। সে কোথায় গিয়ে উঠবে এই চিন্তাটাও এই মুহূর্তে তার মাথায় নেই। শুক্রবারে তার বিয়ে। দুমাসের বেতনের টাকা তার পকেটে। খারাপ কি? তার কোন দুধের শিশু নেই যাকে চিড়ার পানি গুলে খাওয়াতে হবে। তাকে কি সুখী মানুষ বলা যায় না? তার ইচ্ছা করছে আসমানীকে নিয়ে বের হতে। টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনবে। সংসারের জিনিস দুজনে মিলে কেনার অনেক আনন্দ। প্রথমে কিনতে হবে একটা মশারি। ধবধবে শাদারঙের নেটের মশারি। পাশে বড় এবং বেশ উঁচু। মশারির ভেতর বসে থাকলে যেন মশারির ছাদ মাথা স্পর্শ না করে। দুজনে চা খাবার জন্যে সুন্দর দুটা কাপ পিরিচ। বিছানার চাদর। ঘরে কোন ড্রেসিং টেবিল নেই। ড্রেসিং টেবিল কিনতে পারলে ভাল হত। সম্ভব হবে না। ভাল বড় আয়না কিনে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিতে হবে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যায় এমন বড় আয়না। কত দাম পড়বে কে জানে। আসল জিনিশের কথাই মনেছিল না—বালিশ। নরম বালিশ কিনতে হবে। ফ্লাক্স কিনতে হবে। ফ্লাক্স ভর্তি থাকবে গরম পানি। টি ব্যাগ, চায়ের, দুধ, চিনি থাকবে। গভীর রাতে চা খেতে ইচ্ছা করলে গরম পানি দিয়ে চা বানানো। একটা টিভি কিনতে পারলে খুব ভাল হবে। ঢাকা শহরে তাদের বাড়িটি সম্ভবত একমাত্র বাড়ি যেখানে টিভি নেই। এক সময় টিভি ছিল। ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশনের কি ঝামেলায় পিকচার টিউব নষ্ট হয়ে যাবার পর আর সারানো হয় নি। টিভিটা সারাতে দিলে হয়।
