কারণটা জানতে পারি?
জানতে পার। নতুন মশারি কিনলে গভীর রাতে মশার কামড়ে ঘুম ভাঙ্গবে। এবং আমরা রাত জেগে গল্প করতে পারব না। আমারতো আর এ্যালার্ম ঘড়ি নেই যে রাত তিনটা এ্যালার্ম দিয়ে রাখব। ঘুম ভাঙ্গবে এবং আমরা গুটুর গুটুর করে গল্প করব। মশারাই হচ্ছে আমার জীবন্ত এ্যালার্ম ঘড়ি।
আমি তোমাকে একটা এ্যালার্ম ঘড়ি প্রেজেন্ট করব। তবু দয়া করে একটা মশারি কিনবে।
আচ্ছা।
আর নরম দেখে একটা বালিশ কিনবে।
এই বালিশটা কি শক্ত?
শক্ততো বটেই মনে হচ্ছে তুলার বদলে সীসার টুকরা ভরা। এই শোন আমার পানির পিপাসা পেয়েছে।
আমারও পানির পিপাসা পেয়েছে। ভালই হয়েছে পিপাসায় পিপাসায় কাটাকাটি।
ফাজলামী ধরনের কথা বলবেনাতো যাও দয়া করে আমার জন্যে এক গ্লাস পানি এনে দাও।
স্বামীকে এইভাবে হুকুম দিচ্ছ। তোমার কিন্তু পাপ হচ্ছে।
হোক পাপ। পানি নিয়ে এসো। জগ ভর্তি পানি আনবে।
এত পানি দিয়ে কি হবে?
হাতে মশার রক্ত লেগে গেছে হাত ধোব।
ইশ তোমার হাত ভর্তি স্বামীর রক্ত। তুমিতো ডেনজারাস মেয়ে।
উফ চুপ করবে?
না চুপ করব না।
তোমার কোন ব্যাপারটা আমার কাছে অসহ্য লাগে তাকি তুমি জান?
জানি—এই যে কথার পিঠে কথা বলে তোমাকে রাগাচ্ছি এটাই তোমার কাছে অসহ্য লাগছে।
জান যখন তখন রাগাচ্ছ কেন?
কারণটা খুব স্পষ্ট।
আমার কাছে কারণ মোটেই স্পষ্ট না।
কারণ হল—আমার সোনার বাংলা গানের দ্বিতীয় লাইন।
এই ধরনের ছেলেমানুষী কথা কার কাছ থেকে শিখেছ?
তোমার কাছ থেকে।
ফরহাদের মাথা দপদপ করছে। মনে হচ্ছে আজ রাতে তার এক ফোটা ঘুম হবে না। সারারাত বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে কাটাব। অবশ্যি খুব খারাপ কাটবে না। সারারাতই আসমানীর সঙ্গে গল্প করা যাবে।
যখন আসমানী সত্যি তার সঙ্গে থাকতে আসবে তখন কি এ রকম করে তারা রাত জেগে গল্প করবে? আগে ভাগে বলার কোন উপায়ে নেই। বিয়ের পর হয়ত দেখা যাবে আসমানী খুবই ঘুম কাতুরে। নটা বাজতেই শুয়ে পড়ছে ঘুম ভাঙ্গছে ভোরবেলায়। সারারাত সে ঘুমুচ্ছে কাঠের টুকরার মত।
পানির পিপাসা হচ্ছে। ফরহাদ সাবধানে বিছানা থেকে নামলনান্টু ভাইয়ের ঘুম যেন না ভাঙ্গে। টেবিলের উপর পিরিচে ঢাকা পানির জগ। উল্টো করে রাখা পানির গ্লাস। নান্টু ভাইয়ের সব কিছুই খুব গোছানো। পাশে হরলিক্সের কৌটা ভর্তি বিসকিটও আছে। রাতে খিদে লাগলে খাবার জন্যে। এ ধরনের ব্যবস্থা তাকেও করতে হবে। রাতে পানি খাবার জন্যে জগ কিনতে হবে। আসমানীর মনে হয় ঠাণ্ডা পানি খাবার একটা ব্যাপার আছে। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে সে সব সময় বলবে—ভাই ফ্রীজের পানি আছে না? ফ্রীজের ঠাণ্ডা পানি দিন।
ছোট্ট একটা ফ্রীজ কিনতে পারলে ভাল হত। লাল টুকটুক ছোট্ট একটা ফ্রীজ। তাদের বড় সাহেবের খাস কামরায় আছে।
ফরহাদ খুব সাবধানে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। আশ্চর্য বৃষ্টি হচ্ছে। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল। টিনের ছাদ হলে ভাল হত বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শোনা যেত। আসমানী খুব বৃষ্টি পছন্দ করে প্রায়ই তার চিঠিতে থাকবে—এই শোন কাল রাত সাড়ে তিনটার দিকে অনেকক্ষণ ঝমঝম বৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজী টাইপ বৃষ্টি। এখন বল দেখি ইংরেজী টাইপ বৃষ্টি কাকে বলে? বলতে পারলে না। জানি পারবে না। ইংরেজী টাইপ বৃষ্টি মানে Cats and dogs বৃষ্টি। আচ্ছা ঝমঝম বৃষ্টিকে Cats and dogs বৃষ্টি বলে কেন? কুকুর এবং বেড়ালরা এ জাতীয় বৃষ্টিতে ভিজে ন্যাতা ন্যাতা হয়ে যায় এই জন্যে? খুব ভাল ইংরেজী জানে এমন কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করতাম—স্যার ঝমঝম বৃষ্টিকে Cats and dogs . বৃষ্টি বলে কেন? তোমার মাথায় এটা দিয়ে দিলাম। কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করে জেনে আমাকে জানিও। বৃষ্টির সময় আমার সবচে বেশী যে কাজটা করতে ইচ্ছা করে তা হল টেলিফোনে কথা বলতে ইচ্ছা করে। তোমার বাসায় টেলিফোন থাকলে আমি অবশ্যই টেলিফোন করে তোমার ঘুম ভাঙ্গাতাম। ইশ তোমার টেলিফোন নেই কেন? টেলিফোনে তোমার গলা খুব সুন্দর শোনায় তাকি তুমি জান? কী তোমাকে বলে নি? আমি বললাম। তোমার গলার স্বরে বৃষ্টি আসবে, বৃষ্টি আসবে এ রকম একটা ভাব আছে। কি বাবু সাহেব, আপনার কি মনে হচ্ছে আমি পাগলী টাইপ কথা বলছি? একটা পাগল মেয়ে নিয়ে তুমি যে কি বিপদে পড়বে—আমি দিব্যচোখে তোমার বিপদ দেখতে পাচ্ছি। দশ নম্বর মহা বিপদ সংকেত। না দশের চেয়েও বেশী—১০০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত।
ফরহাদের চায়ের পিপাসা পেয়ে গেল। নান্টু ভাইকে না জাগিয়ে চুপিচুপি এককাপ চা বানাতে পারলে ভাল হত। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে আসমানীর সঙ্গে কথা বলা। আচ্ছা এ রকম কথা কি সব ছেলেরাই বলে না সে একা বলে? মনে হয় তার মত করে বলে না। কারণ তার কথায় শুধু ভালবাসাবাসি থাকে না। অনেক জরুরী ব্যাপারও থাকে। এই মুহূর্তে সে আসমানীর সঙ্গে যে সব কথা বলবে সবই খুব জরুরী কথা। তবে শুরুটা হবে খুব নাটকীয়ভাবে।
একি তুমি আমাকে ফেলে একা একা চা খাচ্ছ। আবার মজা করে বৃষ্টিও দেখছ?
তুমি ঘুমুচ্ছিলে তাই জাগাই নি।
আমি ভয়ংকর ভয়ংকর ভয়ংকর রাগ করেছি।
একটু দাঁড়াও আমি তোমার জন্যে চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।
তোমাকে কিছু করতে হবে না। আমি চলে যাচ্ছি।
কোথায় যাচ্ছ?
যেখানেই যাই তোমার কি?
আসমানী চলে গেছে। ফরহাদ আর কিছুতেই তাকে আনতে পারছে না। পুরো ব্যাপারটাই তার কল্পনা, কিন্তু এই কল্পনায় তার হাত নেই। সে নিজের ইচ্ছায় কিছু করতে পারে না। খুবই বিস্ময়কর একটা ব্যাপার। ফরহাদ হঠাৎ লক্ষ্য করল সে এমনভাবে হাত উঁচু করে আছে যেন তার হাতে সত্যি সত্যি একটা চায়ের কাপ। সে অদৃশ্য চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চা খাচ্ছে। আচ্ছা তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে নাতো?
নান্টু ভাই-এর কথা
নান্টু ভাই-এর কথা অনুযায়ী আজ অফিসে চূড়ান্ত রকমের ঝামেলা হবার কথা। চাকরী নেই পাঁচজন তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে অফিসের সামনে বসে থাকবে। তারা সারাক্ষণ কঁাও মাও করবে। পত্রিকার ফটোগ্রাফররা আসরে। মজা দেখতে জড় হবে পাবলিক। অফিসের সামনের রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম শুরু হবে। ঝামেলা আরো জোড়দার করার জন্যে নির্দোষ ধরনের কয়েকটা পটকাও ফুটানো হবে। পুলিশ চলে আসবে। এইসব কর্মকান্ড শুরু হবার কথা সকাল দশটা থেকে কারণ বড় সাহেব অফিসে আসেন ঠিক সাড়ে নটায়। এখন বাজছে সাড়ে এগারোটা। আর দশটা দিন অফিসের কাজকর্ম যেমন চলে আজো তাই চলছে। কোন রকম ঝামেলা নেই।
